kalerkantho

মঙ্গলবার । ১ আষাঢ় ১৪২৮। ১৫ জুন ২০২১। ৩ জিলকদ ১৪৪২

সংসদ নির্বাচন বর্জনেরও পথ ধরেছে বিএনপি

এনাম আবেদীন   

১৩ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে




সংসদ নির্বাচন বর্জনেরও পথ ধরেছে বিএনপি

নির্বাচনী ব্যবস্থা সংস্কার বা অন্য কোনো ‘রাজনৈতিক ছাড়’ না পাওয়া গেলে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জনের পথেই হাঁটবে বিএনপি। সম্প্রতি স্থানীয় সরকারের সব পর্যায়ের নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে দলটি সরকারকে এমন ‘বার্তা’ই দিয়েছে বলে জানা গেছে।

কালের কণ্ঠকে বিএনপি নেতারা জানিয়েছেন, ‘বিএনপি স্থানীয় সরকারের সব নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। তাহলে বর্তমান সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে অসুবিধা কী’—সরকারের এমন যুক্তি সমর্থনযোগ্য না হওয়ায় আগাম উপায় হিসেবে সব নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কারণ নির্বাচন কমিশন সংস্কার ও নির্বাচনকালীন সরকারের দাবি নিয়ে বিএনপি আবারও মাঠে নামবে।

দলটির নীতিনির্ধারক নেতারা মনে করেন, বিদ্যমান সরকার ব্যবস্থা এবং নির্বাচন কমিশনের আমূল সংস্কারসহ ন্যূনতম দাবিদাওয়া আদায় করে নির্বাচনে না যেতে পারলে ফলাফল বিগত দিনের স্থানীয় সরকারগুলোর নির্বাচনের মতোই হবে। 

জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকার নির্বাচনী ব্যবস্থা পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছে। জনগণের ভোটের অধিকার হরণ করা হয়েছে। এ কারণে বিএনপি স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো বর্জন করতে বাধ্য হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচন সামনে এলে পরিবেশ-পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে আমরা সিদ্ধান্ত নেব।’

দলটির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় মনে করেন, ‘বর্তমান নির্বাচনী ব্যবস্থা পরিবর্তন না হলে বিএনপি চাইলেও ভোটে যেতে পারবে না। কারণ জনগণই ভোট দিতে যাবে না।’ তিনি বলেন, ‘সুষ্ঠু ভোট হলে বিএনপি হারতেও রাজি আছে। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের কাছে প্রতারিত হওয়া তো মানুষ মেনে নিতে পারবে না।’

স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বর্তমান সরকারের অধীনে বিএনপি আর কোনো নির্বাচনে যাবে না।’ তিনি বলেন, ‘বিগত দিনে সব নির্বাচনে অংশ নিয়ে জনগণের সামনে বিএনপি স্পষ্ট করেছে যে এই সরকারের অধীনে নির্বাচনে গেলে কী হতে পারে। এখন মানুষই বলছে কেন আমরা নির্বাচনে যাচ্ছি।’

এক প্রশ্নের জবাবে টুকু বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচনের বিষয়ে এখনই মন্তব্য করা কঠিন। তবে বর্তমান সরকার ও বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থায় নির্বাচনে যাওয়া না যাওয়া সমান কথা। আমরা আমাদের দাবিদাওয়া যথাসময়ে তুলে ধরব।’

দলটির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘স্থানীয় সরকারের সব নির্বাচন বর্জনের মধ্য দিয়ে আমরা সরকারকে বার্তা দিয়েছি যে একতরফা ওই ধারার জাতীয় নির্বাচন হলে বিএনপি তাতে নেই।’ তিনি বলেন, ‘নির্বাচনকালীন সরকার ও নির্বাচন কমিশন সংস্কারের দাবি শক্তিশালী ও সমর্থনযোগ্য করার জন্য অনেক চিন্তা-ভাবনা করে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কারণ যাতে তারা বলতে না পারে যে বর্তমান সরকারের অধীনেই বিএনপি স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে অংশ নিয়েছে।’   

গত ১০ বছরে স্থানীয় সরকারের প্রায় সব নির্বাচনে অংশ নিলেও সম্প্রতি ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও উপজেলা নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি। বর্তমান সরকারের অধীনে আর কোনো নির্বাচনে অংশ নেবে না দলটি। এমনকি লক্ষ্মীপুর-২ আসনের উপনির্বাচন বর্জনেরও সিদ্ধান্ত নিতে পারে বিএনপি।

দলটি মনে করে, দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থেকে স্থানীয় প্রশাসন এখন এমনভাবে সেটআপ করা হয়েছে, যেন ধানের শীষ মার্কাকে পরাজিত করা তাদের কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে, যদিও আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রশ্নে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এখনো আসেনি। তবে ‘পরিস্থিতির বদল না হলে’ বর্তমান সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীনে নির্বাচনের যে ধারা চলছে, সেটি ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে মনে করে বিএনপি। তাই বিদ্যমান নির্বাচনী ধারার পরিবর্তনের জন্য সরকারকে চাপে ফেলার চেষ্টা করবে দলটি।

সূত্র মতে, এ লক্ষ্যে নির্বাচনকালীন সরকার ও নির্বাচন কমিশন সংস্কারের প্রস্তাব উত্থাপন ছাড়াও সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর আন্দোলনে যাওয়ার চেষ্টা চালাবে বিএনপি। দলটির নেতাদের মূল্যায়ন হলো, বর্তমান সরকার যে নির্বাচনী ব্যবস্থা ধ্বংস করে দিয়েছে, এটি সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচন এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোর মধ্য দিয়ে জনমনে স্পষ্ট হয়ে গেছে। ফলে পরিস্থিতির ন্যূনতম উন্নতি না হলে দেশের বেশির ভাগ রাজনৈতিক দলও আগামী নির্বাচনে অংশ নেবে না। তাই সরকারের বাইরে থাকা ওই দলগুলোকে কাছে টানতে ন্যূনতম কর্মসূচির ভিত্তিতে বৃহত্তর ঐক্য গঠনের চেষ্টা করা হচ্ছে। 

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন করে নির্বাচন প্রতিহত করার জন্য বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট কঠোর আন্দোলন করেছে। তবে ওই সময় রাজনীতিতে আলোচনা উঠে আসে যে নির্বাচনে অংশ নিলে বিএনপির ফল ভালো হতো। আবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দুই দফা বৈঠক ও দাবিদাওয়া উত্থাপন করে ২০১৮ সালে ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে অংশ নিয়েছে বিএনপি। কিন্তু এতেও ফসল ঘরে তোলা যায়নি। দলটির কোনো দাবিও সরকার মানেনি। কিন্তু এর পরও দলের কর্মী-সমর্থকদের চাঙ্গা রাখার জন্য কৌশলগত কারণে সিটি করপোরেশনসহ সব কটি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিয়েছে। তবে ফলাফল একই ধরনের হয়েছে।

দলটির মূল্যায়ন হলো, বর্তমান সরকারকে ব্যতিব্যস্ত করে এবং চাপে ফেলে ন্যূনতম দাবি আদায় না করতে পারলে বিদ্যমান প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে আর কোনো নির্বাচনে অংশ নিয়ে লাভ নেই। তাদের মতে, দলীয় মার্কার ওই নির্বাচনে স্থানীয় প্রশাসনই ‘নিজেদের রক্ষায়’ সরকারি দলের প্রার্থীকে জিতিয়ে আনার জন্য কাজ করছে। কারণ এটি না করলে তাদের চাকরিই হুমকির মধ্যে পড়ছে।

সূত্র মতে, এ কারণেই দলীয় ধানের শীষ মার্কায় তারা আর নির্বাচনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন নেতারা। তবে প্রশাসনের মনোযোগ এড়াতে এবং ভোট ব্যাংক ঠিক রাখার পাশাপাশি নেতাকর্মীদের সক্রিয় রাখতে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করলে বিএনপি তাতে আপত্তি করবে না বলে জানা গেছে।