kalerkantho

শনিবার । ২৭ চৈত্র ১৪২৭। ১০ এপ্রিল ২০২১। ২৬ শাবান ১৪৪২

বিজেপিতে যোগ দিলেন মিঠুন

বাংলায় আসল পরিবর্তন আনবে বিজেপি : মোদি

► ‘বাংলা ভাগ’ ঠেকাতে চায় তৃণমূল
► মমতা সবার দিদি নন, শুধু ভাইপোর পিসি : ব্রিগেডে মোদি
► সারা ভারতে মোদি শাহ সিন্ডিকেট : শিলিগুড়িতে মমতা
► মমতা বাংলাদেশি, রোহিঙ্গাদের ফুফু : শুভেন্দু

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

৮ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বাংলায় আসল পরিবর্তন আনবে বিজেপি : মোদি

কলকাতার ব্রিগেড ময়দানের মঞ্চে মিঠুন চক্রবর্তীকে শুভেচ্ছা জানান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ছবি : ইন্ডিয়া টুডে

কলকাতায় ব্রিগেডে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, অন্যদিকে শিলিগুড়িতে রাজপথে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ব্রিগেডে জনসভায় মোদি সাফ বলে দিলেন, ৩৪ বছরে বামপন্থীরা পশ্চিমবঙ্গের জন্য কিছুই করেনি। রাজ্যের মানুষ মমতার ওপর ভরসা করেছিল, কিন্তু সেই ভরসা ভেঙেছেন তিনি নিজেই। মমতাও খোলাখুলি বললেন, এই নির্বাচন অস্তিত্ব রক্ষা করার লড়াই, এবার অস্তিত্ব রক্ষা করতে না পারলে বাংলা ভাগ করবেন মোদি।

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের আগে গতকাল রবিবার এমন রাজনৈতিক তরজায় পূর্ণ ‘সুপার সানডে’ দেখল রাজ্যবাসী। একই সঙ্গে এদিন বিজেপিতে মিঠুন চক্রবর্তীর যোগদানের সাক্ষীও হলো তারা। তৃণমূলের হয়ে রাজ্যসভায় ২০১৪ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করা এই চলচ্চিত্র তারকা মাঝে রাজনীতিই ছেড়ে দিয়েছিলেন। কারণ সারদার আর্থিক কেলেঙ্কারিতে তাঁর নামও জড়িয়েছিল। চার বছর পর ফের রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তনসহ গেরুয়া শিবিরে তাঁর নাম লেখানোয় জল্পনা তাই তুঙ্গে উঠেছে, নির্বাচনে জয়ী হলে বিজেপি কি তবে তাঁকে মুখ্যমন্ত্রী করবে?

প্রসঙ্গত, গত ১৬ ফেব্রুয়ারি সরস্বতীপূজার দিন মিঠুনের মুম্বাইয়ের বাংলোয় যান আরএসএসের প্রধান মোহন ভাগবত। এরপর তাঁর বিজেপিতে যোগদান অনেকটা অনুমিতই ছিল বলে অনেকের মত।

মমতা সবার দিদি নন, শুধু ভাইপোর পিসি

ব্রিগেডে নরেন্দ্র মোদি বত্তৃদ্ধতা শুরু করেন ব্রিটিশ আমল থেকে, শেষ করলেন ‘পিসি-ভাইপো’তে এসে। সাম্প্রতিককালে যতবার পশ্চিমবঙ্গে এসেছেন প্রধানমন্ত্রী, এতটা চাঁছাছোলা ভাষায় তৃণমূল নেত্রীকে আক্রমণ করেননি তিনি। এদিন মমতার উদ্দেশে তিনি প্রশ্ন তোলেন, “বাংলার মানুষ অনেক স্বপ্ন নিয়ে আপনাকে ‘দিদি’ করেছিল। কিন্তু আপনি একজনের (অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়) ‘পিসি’ হয়ে গেলেন কেন? বাংলার মানুষের বিশ্বাস ভঙ্গ করেছেন মমতা দিদি। মা-বোনদের ওপর অকথ্য অত্যাচার করেছে দিদির সাঙ্গোপাঙ্গরা। বাংলার মানুষ কিন্তু তবু ভেঙে পড়েনি। বরং পরিবর্তন চাইছে তারা।’

বত্তৃদ্ধতায় একাধিকবার ‘আসল পরিবর্তনের’ কথা বলেন মোদি। তিনি এ দাবিও করেন, বিজেপিই আগামি দিনে ‘সোনার বাংলা’ গড়বে। ‘আজ এখানে দাঁড়িয়ে বাংলার মানুষকে কথা দিয়ে যাচ্ছি, যা কিছু আপনাদের থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে, সব ফেরত দেব। স্বাধীনতার ৭৫তম বর্ষে নতুন সংকল্প নিয়ে এগোতে হবে বাংলাকে।’

মূলত প্রতিশ্রুতির বন্যা বইয়ে দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘বাংলার পুনর্নির্মাণ, সংস্কৃতির রক্ষা, শিল্প স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি। বাংলার মানুষের উন্নতির জন্য ২৪ ঘণ্টা কাজ করব। প্রতি মুহূর্তে আপনাদের জন্য বাঁচব, আপনাদের সেবা করব। তাই বাংলায় বিজেপিকে আনুন। উন্নয়নের বন্যা বয়ে যাবে।’ আসল পরিবর্তনের ব্যাখ্যায় মোদি বলেন, “আসল পরিবর্তন মানে, কর্মসংস্থান, গরিব যেখানে উন্নতির দিকে এগিয়ে চলবে, আসল পরিবর্তন মানে নারীদের সুরক্ষা, আদিবাসী-দলিত-মুসলিম-আমাদের শরণার্থী ভাই-বোন—সবার উন্নতি হবে। ‘সবকা বিকাশ’ই আমাদের মন্ত্র হবে।” এ সময় তিনি তৃণমূল সরকারকে কমিশনবাজির সরকার বলে অভিহিত করে নানা দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ধরেন।

বাংলার ঘরের ছেলে মিঠুন বিজেপিতে

‘বাংলা ঘরের মেয়েকেই চায়’—এই স্লোগান সামনে রেখে প্রচার শুরু করেছে তৃণমূল। আর এদিন ব্রিগেডের মঞ্চে অভিনেতা মিঠুন চক্রবর্তীকে ‘বাংলার ঘরের ছেলে’ বলে অভিবাদন করেন মোদি। বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ ও কৈলাস বিজয়বর্গীয়র হাত থেকে গেরুয়া শিবিরের পতাকা তুলে নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিজেপিতে নাম লেখান মিঠুন। এরপর তিনি বলেন, তাঁর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। তিনি বলেন, ‘মারব এখানে লাশ পড়বে শ্মশানে, এ কথা আগেই শুনেছেন। এবার নতুন কথা শুনুন, আমার নাম মিঠুন চক্রবর্তী। আমি যা বলি, তা করে দেখাই। আমি জলঢোঁড়াও নই, বেলোবোড়াও নই। আমি একটা কোবরা। আমি জাত গোখরো। এক ছোবলে ছবি। এবার কিন্তু সেটাই হবে। দাদার প্রতি ভরসা রাখবেন।’

মমতাকে উদ্দেশ করে শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘আপনাকে বাংলার মানুষ ঘরের মেয়ে মনে করেন না। আপনি বাংলাদেশি, রোহিঙ্গাদের ফুফু।’ নন্দীগ্রামে তিনি মমতাকে হারাবেন বলেও দাবি করেন। একদা তৃণমূলের অঘোষিত দ্বিতীয় শীর্ষ ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত মুকুল রায় তাঁর ভাষণে বলেন, গত ১০ বছরে বাংলা ধ্বংস হয়ে গেছে।

ব্রিগেড জনসভায় উপস্থিত ছিলেন লকেট চট্টোপাধ্যায়, দিলীপ ঘোষ; ছিলেন দুই কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয় ও দেবশ্রী চৌধুরী। এ ছাড়া ছিলেন সুবক্তা হিসেবে পরিচিত শমীক ভট্টাচার্য, সংসদ সদস্য অর্জুন সিংহ, বিজেপি নেতা সায়ন্তন বসু প্রমুখ।

‘সারা ভারতে মোদি-শাহ সিন্ডিকেট’

ব্রিগেডের গণজমায়েত থেকে প্রত্যাশামতোই বাংলা দখলের ডাক দেন মোদি। এর বিপরীতে ‘বাংলা ভাগ’ ঠেকাতে শিলিগুড়িতে ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে এদিন ‘সিলিন্ডার মিছিল’ করেন তিনি। এর আগে টুইটে বিজেপিকে তুলাধোনা করে তৃণমূল নেত্রী বলেন, ‘প্রতিদিন রান্নার গ্যাসের দাম বাড়িয়ে সাধারণ মানুষকে লুট করছে বিজেপি।’

শিলিগুড়ির মিছিল ও জনসভা থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য থেকে শুরু করে গ্যাসের দাম বৃদ্ধি, সব কিছুর বিরুদ্ধেই আওয়াজ তোলেন মমতা। দার্জিলিং মোড় থেকে শুরু করে ভেনাস মোড় পর্যন্ত পদযাত্রা শেষে যোগ দেন জনসভায়।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘মোদি ভাষণ দেবেন শুনলেই সকলে ভয়ে ভয়ে থাকে। এক গাড়ি কয়লার কত দাম, একটা ট্রেনের কত দাম? লাখ লাখ কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে। মানুষের সমস্যার কথা বলতে এসেছি। ভোট চাইতে আসিনি। মোদি যখন ফাঁকা ব্রিগেডে বত্তৃদ্ধতা করেন, তখন আমি রাস্তায় থাকি। রাস্তাই আমাকে রাস্তা দেখায়।’

তিনি বলেন, ‘বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভেঙে, স্বামী বিবেকানন্দকে ঠাকুর পদবি দিয়ে বাংলার ঐতিহ্যকে বোঝা যায় না। আমরা সবাইকে নিয়ে চলি। রোজ রোজ প্রধানমন্ত্রীর মিথ্যা কথা মানুষ শুনবে না। আগেরবার নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, ১৫ লাখ টাকা করে দেওয়া হবে। দেননি। এবারেও বলবেন, কিন্তু আপনারা ভোট উল্টে দেবেন। তৃণমূলকে দেবেন।’

তৃণমূল নেত্রী আরো বলেন, ‘লোকসভা ভোটে উত্তরবঙ্গে এত আসন পেয়েছিল বিজেপি, তারপর কী করেছে কেন্দ্রীয় সরকার? হঠাৎ করে বলে—তিস্তার জল দিয়ে দাও; একবার রাজ্যের সঙ্গে কথাও বলার প্রয়োজন মনে করলেন না। প্রধানমন্ত্রী উল্টোপাল্টা মিথ্যা কথা বলছেন। প্রধানমন্ত্রীর আসনটিকেও সম্মান করছেন না উনি।’

বিজেপিকে বড় তোলাবাজ অভিহিত করে মমতা বলেন, ‘রেল, এয়ার ইন্ডিয়া, কোল ইন্ডিয়া বিক্রি করলে কত তোলাবাজি হয়? উজ্জ্বলা যোজনায় দুর্নীতি হয়েছে। সারা ভারত একটি সিন্ডিকেটের কথা জানে, মোদি-শাহ (অমিত) সিন্ডিকেট।’

মমতার মিছিল ও গণজমায়েতে ছিলেন মিমি চক্রবর্তী, দোলা সেন, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য প্রমুখ।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি বাম-কংগ্রেস-আইএসএফ জোট ব্রিগেডে স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে বড় সমাবেশ করে। বিজেপি ঘোষণা দিয়েছিল, ওই সমাবেশকে ছাপিয়ে যাবে তাদের গতকালের সমাবেশ। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে ভোটগ্রহণ শুরু হবে ২৭ মার্চ। আট দফার এ নির্বাচন শেষ হবে ২৯ এপ্রিল। ফল ঘোষণা করা হবে ২ মে।

 

মন্তব্য