kalerkantho

রবিবার। ২৮ চৈত্র ১৪২৭। ১১ এপ্রিল ২০২১। ২৭ শাবান ১৪৪২

৭ই মার্চের ভাষণের সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৮ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে




৭ই মার্চের ভাষণের সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন

ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ উপলক্ষে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সময় পাশে ছিলেন বোন শেখ রেহানা। ছবি : পিএমও

‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেওয়া ঐতিহাসিক ভাষণের ৫০ বছর অর্থাৎ সুবর্ণ জয়ন্তী গতকাল রবিবার উদযাপন করল জাতি। নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো জাতীয়ভাবে দিবসটি উদযাপিত হয়েছে। এ উপলক্ষে সকালে রাজধানীর ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু ভবনের সামনে রক্ষিত বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছোট বোন শেখ রেহানাও ছিলেন।

গত বছর মার্চে দেশে করোনা মহামারির প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে গণভবন ছেড়ে বাইরের কর্মসূচিতে যাওয়া বন্ধ করে দেন প্রধানমন্ত্রী। শুধু ১৫ই আগস্ট জাতীয় শোক দিবসে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে ও ১৫ই আগস্টের অন্য শহীদদের কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে বেরিয়েছিলেন তিনি। এ ছাড়া হাজির হয়েছিলেন সংসদ অধিবেশনে। চলতি বছর সংসদ ছাড়া গণভবনের বাইরে কোনো কর্মসূচিতে প্রধানমন্ত্রীর সশরীরে উপস্থিত হওয়া গতকালই প্রথম ছিল। এক বছর ধরে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমেই বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে আসছিলেন। তিনি সম্প্রতি করোনার টিকা নিয়েছেন।

দিবসটি উপলক্ষে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠন জাতীয় পতাকা উত্তোলন, বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন, দোয়া ও মিলাদ মাহফিল, আলোচনাসভাসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। ভোরে বঙ্গবন্ধু ভবনসহ দেশব্যাপী দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে দিবসটির কর্মসূচি শুরু হয়।

সকাল ৭টার দিকে শেখ হাসিনা তাঁর ছোট বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে অবস্থিত জাতির পিতার স্মৃতি জাদুঘরের সামনে তাঁর প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন। করোনা পরিস্থিতির কারণে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা পৃথক সময়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। জাতির পিতার প্রতিকৃতির বেদিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের পর প্রধানমন্ত্রী সেখানে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শাহাদাতবরণকারীদের স্মরণে তাঁদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে এ সময় বিশেষ মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়।

প্রধানমন্ত্রী শ্রদ্ধা নিবেদন করে ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর থেকে চলে যাওয়ার পর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এ সময় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ড. আব্দুর রাজ্জাক, জাহাঙ্গীর কবির নানক, শাজাহান খান, আবদুল মতিন খসরু ও আব্দুর রহমান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ, ডা. দীপু মনি, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ড. হাছান মাহ্মুদ ও আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন, বি এম মোজাম্মেল হক ও এস এম কামাল হোসেন, ডা. মুরাদ হাসান, আওয়ামী লীগের সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক অসীম কুমার উকিল, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক মৃণাল কান্তি দাস, শ্রমবিষয়ক সম্পাদক হাবিবুর রহমান সিরাজ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে অপশক্তি মোকাবেলার শপথ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘সকল অপশক্তিকে প্রতিহত করে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তোলাই হবে ৭ই মার্চের শপথ। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে সাথে নিয়ে সকল অপশক্তিকে প্রতিহত করাই হবে আজকের দিনের শপথ।’

বিএনপির সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘যে বিএনপি একসময় ৭ই মার্চ পালন নিষিদ্ধ করে রেখেছিল, সেই বিএনপি এখন রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে এই দিবস পালন করছে। স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠকারী আর ঘোষক এক নয়। বিএনপি একজন পাঠককে স্বাধীনতার ঘোষক বানাতে চায়।’

ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ উপলক্ষে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য বিভিন্ন শ্রেণি, পেশা, বয়সের মানুষের ঢল নামে। রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তি এবং বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। কৃষক লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীরা ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান।

সকালে জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী ধানমণ্ডিতে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে কিছুক্ষণ নীরবতা পালন করেন। এ সময় স্পিকারের সঙ্গে সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানার বিষয়ে নতুন প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করতে ‘ভ্রাম্যমাণ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর’ চালু করছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। গতকাল সকালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের শিখা চিরন্তনে জাদুঘরসংবলিত দুটি বাস উদ্বোধন করেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক। এ সময় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সচিব তপন কান্তি ঘোষসহ মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

অন্যদিকে দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ : বাঙালির মুক্তির সড়ক’ শীর্ষক সেমিনারের আয়োজন করা হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন তথ্যমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ড. হাছান মাহ্মুদ। তিনি বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ভাষণ ঘুমন্ত বাঙালিকে জাগিয়েছিল। আজকের এই দিনে কাউকে ইতিহাস বিকৃতি না করার জন্য আহ্বান জানাচ্ছি।

জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি ফরিদা ইয়াসমিনের সভাপতিত্বে সেমিনারে বাসসের (বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা) চেয়ারম্যান অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, প্রধানমন্ত্রীর সাবেক তথ্য উপদেষ্টা ও সাংবাদিক ইকবাল সোবহান চৌধুরী, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি সাইফুল আলম, সাংবাদিক মনজুরুল আহসান বুলবুল, স্বপন সাহা প্রমুখ বক্তব্য দেন। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাসসের সাবেক সিটি এডিটর অজিত কুমার সরকার। স্বাগত বক্তব্য দেন জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ইলিয়াস খান।

ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর প্রাঙ্গণে বাংলাদেশ কৃষক লীগ কৃষক সমাবেশ ও আলোচনাসভার আয়োজন করে। সংগঠনের সভাপতি সমীর চন্দের সভাপতিত্বে সভায় আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক আফজালুর রহমান বাবু প্রমুখ বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন কৃষক লীগের সাধারণ সম্পাদক উম্মে কুলসুম স্মৃতি এমপি।

দিবসটি উপলক্ষে শেরেবাংলানগরে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে দিনব্যাপী কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে দিনের কর্মসূচি শুরু করা হয়। পতাকা উত্তোলন শেষে মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে অতিরিক্ত সচিব মো. আবু বকর ছিদ্দিকের সভাপতিত্বে ‘ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ’ শীর্ষক আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হয়। প্রধান অতিথি ছিলেন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. মো. আবু হেনা মোস্তফা কামাল এনডিসি।

এদিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপচার্য অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান বলেছেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বাঙালির ত্রাণকর্তা হিসেবে এদেশে জন্ম নিয়েছিলেন। সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবে বঙ্গবন্ধু পরিষদের উদ্যোগে আয়োজিত ‘বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ বিশ্লেষণ ও দিকনির্দেশনা’ শীর্ষক আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন। সভাপতিত্ব করেন মাহবুব উদ্দিন আহমেদ।

অন্যদিকে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদনসহ নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ উদযাপিত হয়েছে। সকাল ১১টায় বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে গভীর শ্রদ্ধা জানান জেলা প্রশাসক সাহিদা সুলতানা ও পুলিশ সুপার আয়েশা সিদ্দিকা। পরে বঙ্গবন্ধু ও ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর পরিবারের শহীদ সদস্যদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে ফাতেহা পাঠ ও বিশেষ মোনাজাতে অংশ নেন তাঁরা।

এরপর গোপালগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগ, টুঙ্গিপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগ, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, বঙ্গবন্ধু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, উপজেলা পরিষদ, উপজেলা প্রশাসন, টুঙ্গিপাড়া পৌরসভা, উপজেলা যুবলীগ, ছাত্রলীগ, কৃষক লীগ, মহিলা আওয়ামী লীগ, মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করে।

মন্তব্য