kalerkantho

বুধবার । ১ বৈশাখ ১৪২৮। ১৪ এপ্রিল ২০২১। ১ রমজান ১৪৪২

বাঙালিকে দাবায়া রাখতে পারবা না

আজিজুল পারভেজ   

৭ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



বাঙালিকে দাবায়া রাখতে পারবা না

৭ই মার্চ, ১৯৭১। শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে,/রবীন্দ্রনাথের মতো দৃপ্ত পায়ে হেঁটে/অতঃপর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন।/তখন পলকে দারুণ ঝলকে তরীতে উঠিল জল,/হৃদয়ে লাগিল দোলা, জনসমুদ্রে জাগিল জোয়ার/সকল দুয়ার খোলা। কে রোধে তাহার বজ্রকণ্ঠ বাণী?/গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শোনালেন তাঁর অমর-কবিতাখানি :/‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম/এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) অমর এক কবিতা শুনিয়েছিলেন বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যা বদলে দিয়েছে উপমহাদেশের ইতিহাস। যা নন্দিত হচ্ছে বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষণ হিসেবে।

পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান ১ মার্চ আকস্মিকভাবে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করলে আওয়ামী লীগপ্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার প্রতিবাদে সর্বাত্মক আন্দোলনের কর্মসূচি হিসেবে ২ মার্চ ঢাকা শহরে এবং ৩ মার্চ পূর্ব পাকিস্তান প্রদেশজুড়ে হরতাল পালন এবং ৭ মার্চ জনসভা অনুষ্ঠানের কথা ঘোষণা করেন। এরপর থেকে লাগাতার অসহযোগ আন্দোলন—হরতাল-বিক্ষোভ চলে পূর্ব পাকিস্তানে। কারফিউ অমান্য করে মুক্তিকামী মানুষ নেমে আসে রাজপথে। সেনাবাহিনীর গুলিতে রাজপথে ঝরেছে শত শত প্রাণ। এরই মধ্যে ছাত্রলীগ উড়িয়েছে স্বাধীনতার পতাকা। ঘোষণা করেছে স্বাধীনতার ইশতেহার। নেতা কী বলেন, সে অপেক্ষায় প্রহর গুনতে থাকে বাঙালি জাতি।

পাকিস্তানে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ফারল্যান্ড সকালে ছুটে আসেন বঙ্গবন্ধুর ধানমণ্ডির বাড়িতে। স্বল্পকালীন একান্ত বৈঠকে বলেন, ‘পূর্ব বাংলায় স্বঘোষিত স্বাধীনতা হলে যুক্তরাষ্ট্র তা সমর্থন করবে না।’

ঢাকার সমস্ত রাজপথ তখন রেসকোর্সে গিয়ে মিশেছে। লাখ লাখ মানুষের আগুনঝরা স্লোগানে মহানগরী উদ্বেলিত। বিকেল ৩টায় বঙ্গবন্ধু ভাষণ দেবেন, কিন্তু দুপুরের মধ্যেই বিশাল রেসকোর্স ময়দান লাখ লাখ মানুষের সমুদ্রে পরিণত হয়। লাল সূর্যের মধ্যে বাংলাদেশের মানচিত্রসংবলিত গাঢ় সবুজ রঙের পতাকা হাতে হাতে উড়ছে হাজার হাজার। বড় পতাকাটি উড়ছে বঙ্গবন্ধু যেখানে ভাষণ দেবেন তার ঠিক ওপরে। নতুন পতাকার নিচে বাংলার অবিসংবাদিত নেতার ভাষণ শোনার জন্য দেশি-বিদেশি সাংবাদিক মঞ্চের গা ঘেঁষে অপেক্ষা করছেন। সবার চোখে-মুখে ‘বাধা দিলে বাধবে লড়াই’ মনোভাব, মুখে আকাশ-বাতাস কাঁপানো স্লোগান : ‘তোমার দেশ আমার দেশ—বাংলাদেশ বাংলাদেশ; তোমার নেতা আমার নেতা—শেখ মুজিব, শেখ মুজিব; বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো—বাংলাদেশ স্বাধীন করো; ভুট্টোর মুখে লাথি মারো—বাংলাদেশ স্বাধীন করো; জয় বাংলা।’

নৌকা আকৃতির সভামঞ্চটি স্থাপন করা হয় বর্তমান শিশু পার্কের দক্ষিণ-পূর্ব অংশে। নির্ধারিত সময়ের কিছুটা পর ৩টা ২০ মিনিটে বঙ্গবন্ধু সভামঞ্চে এসে উপস্থিত হন। ধবধবে সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি, কালো মুজিবকোট গায়ে, হাতে পাইপ। তিনিই ছিলেন একমাত্র বক্তা। কথাসাহিত্যিক রশীদ হায়দারের স্মৃতিচারণায় : ‘দেরি করে আসার জন্যে জনগণ বিশৃঙ্খল হয়নি, ধৈর্য হারায়নি। মঞ্চে তাঁকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে লক্ষ লক্ষ মানুষের গগনবিদারী স্লোগানে কিছুই ভালো শোনা যায় না, কেবল দেখা যাচ্ছে তিনি দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে মানুষের আবেগের জবাব দিচ্ছেন। এতো বড়ো ও এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সভা অথচ কোনো আনুষ্ঠানিকতা নেই, কে সভাপতি, কে অনুষ্ঠান পরিচালনা করছেন কিছুই ঠিক নেই। অথচ সুশৃঙ্খল সভা। বঙ্গবন্ধু কালো মোটা ফ্রেমের চশমাটি খুলে ঢালু টেবিলে রাখলেন, ধীরভাবে, স্বভাবসিদ্ধ গম্ভীর কণ্ঠে শুরু করলেন : ‘ভাইয়েরা আমার...। ...আজ বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়, বাংলার মানুষ মুক্তি চায়, বাংলার মানুষ অধিকার চায়।’ এরপর গত কয়েক দিনের ঘটনাবলি, শাসকশ্রেণির সঙ্গে আলোচনা ফলপ্রসূ না হওয়া এবং মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় বাঙালির দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস তুলে ধরে বঙ্গবন্ধু চার দফা দাবি ঘোষণা করেন। আমার দাবি সামরিক আইন প্রত্যাহার করতে হবে, সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নিতে হবে, হত্যার তদন্ত করতে হবে। তারপর বিবেচনা করে দেখব পরিষদে বসব কি বসব না।’

তিনি কর্মসূচি ঘোষণা করে বলেন, ‘আজ থেকে কোর্ট-কাচারি, হাইকোর্ট, সুপ্রিম কোর্ট, অফিস-আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহ অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে। কোনো কর্মচারী অফিসে যাবেন না। এ আমার নির্দেশ। গরিবের যাতে কষ্ট না হয় তার জন্য রিকশা চলবে, ট্রেন চলবে আর সব চলবে। ...সেক্রেটারিয়েট, সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট, জজকোর্টসহ সরকারি, আধাসরকারি এবং স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলো বন্ধ থাকবে। শুধু পূর্ব বাংলার আদান-প্রদানের ব্যাংকগুলো দুই ঘণ্টার জন্য খোলা থাকবে। পূর্ব বাংলা থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে টাকা যেতে পারবে না। টেলিগ্রাফ, টেলিফোন বাংলাদেশের মধ্যে চালু থাকবে। তবে, সাংবাদিকরা বহির্বিশ্বে সংবাদ পাঠাতে পারবেন।’

তিনি বলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না, মানুষের অধিকার চাই। ...এরপর যদি একটি গুলি চলে, এরপর যদি আমার লোককে হত্যা করা হয়, তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ রইল, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। ...সাত কোটি মানুষকে আর দাবায়ে রাখতে পারবা না। বাঙালি মরতে শিখেছে, তাদের কেউ দাবাতে পারবে না। ...আমি যদি হুকুম দিতে নাও পারি—তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করো। রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেব। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ।’

বঙ্গবন্ধু আধাঘণ্টা ধরে বক্তৃতা করে শেষ প্রান্তে বলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ এ কথার সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিত জনতা লাঠিসোঁটা ঠোকাঠুকি করে বিজয় উল্লাসে বঙ্গবন্ধুর ঘোষণার প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানায়। এরপর বঙ্গবন্ধু ‘জয় বাংলা’ বলে স্লোগান দিলে উপস্থিত জনতা ‘জয় বাংলা’ স্লোগান তুলে প্রত্যুত্তর দেয়। বঙ্গবন্ধু আবার ‘জয় বাংলা’ বললে জনতা ‘জয় বাংলা’ ধ্বনিতে চারদিক মুখরিত করে তোলে।

রশীদ হায়দারের ভাষায়, ‘এই সভায় অসংখ্য মহিলা আসেন বাঁশের লাঠি নিয়ে; বহুলোক আসেন তীর-ধনুক নিয়ে, যেন যুদ্ধ আসন্ন। মানুষ কতটা মরিয়া হয়ে উঠেছে এই দৃষ্টান্ত থেকে বোঝা যাবে—সে সময় প্লান্ট প্রটেকশনের একটি বিমান জনসভার বেশ ওপর দিয়ে উড়ে যায়। ওটাতে শত্রুসৈন্য আছে ভেবে কেউ কেউ লাঠি ছুড়ে মারে।’

কত লোক এসেছিল ঐতিহাসিক সেই সমাবেশে তা আন্দাজ করাও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। কেউ বলেন ১০ লাখ, কেউ বলে ২০ লাখ। শহীদ জননী জাহানারা ইমাম ‘একাত্তরের দিনগুলি’তে লিখেছেন, ‘রেসকোর্স মাঠের জনসভায় লোক হয়েছিল প্রায় ৩০ লাখের মতো। কত দূর-দূরান্ত থেকে যে লোক এসেছিল মিছিল করে, লাঠি আর রড ঘাড়ে করে—তার আর লেখাজোখা নেই। টঙ্গী, জয়দেবপুর, ডেমরা—এসব জায়গা থেকে তো বটেই, ২৪ ঘণ্টা হাঁটা পথ পেরিয়ে ঘোড়াশাল থেকেও বিরাট মিছিল এসেছিল গামছায় চিড়ে-গুড় বেঁধে। অন্ধ ছেলেদের মিছিল করে মিটিংয়ে যাওয়ার কথা শুনে হতবাক হয়ে গেলাম। বহু মহিলা, ছাত্রী মিছিল করে মাঠে গিয়েছিল শেখের বক্তৃতা শুনতে।’

বঙ্গবন্ধু তাঁর জীবনের যে শ্রেষ্ঠ ভাষণটি দিলেন, তা ছিল অলিখিত। সংগ্রাম আর জীবন-দর্শনের আলোকে হৃদয় উৎসারিত কথামালা। আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদ জানান, সামরিক শাসন তুলে নেওয়া এবং সৈন্যদের ব্যারাকে ফেরত নেওয়াসহ পশ্চিম পাকিস্তানের প্রতি চারটি শর্তের ব্যাপারেই শুধু বঙ্গবন্ধু তাঁর সহকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন। ‘ভাষণ দিতে বাসা থেকে বেরোনোর সময় শেখ মুজিবকে তাঁর স্ত্রী শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব বলেছিলেন—তুমি যা বিশ্বাস করো, তাই বলবে। ৭ই মার্চের সেই ভাষণ তিনি নিজের চিন্তা থেকেই দিয়েছিলেন। ভাষণটি লিখিত ছিল না।’

জনসভায় ছিলেন এমন অনেকে বলেছেন, লাঠি, ফেস্টুন হাতে লাখ লাখ মানুষ উত্তপ্ত স্লোগানে মুখরিত থাকলেও শেখ মুজিবের ভাষণের সময় সেখানে ছিল পিনপতন নীরবতা। ভাষণ শেষে আবার স্বাধীনতার পক্ষে স্লোগানে মুখর হয়ে উঠেছিল ঢাকার রাস্তাগুলো।

ঢাকা বেতারে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ রিলে না করার প্রতিবাদে বেতারে কর্মরত বাঙালি কর্মচারীরা কাজ বর্জন করেন এবং বিকেল থেকে ঢাকা বেতার কেন্দ্রের সব অনুষ্ঠান প্রচার বন্ধ হয়ে যায়।

বঙ্গন্ধুর স্বাধিকার আন্দোলন যে স্বাধীনতার দিকে বাঁক নিয়েছে সে নির্দেশনা পেয়ে যায় বাঙালি। সাড়ে সাত কোটি মানুষের আকাঙ্ক্ষারই যেন প্রতিফলন ঘটল সেদিন। এই ভাষণই মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্দীপ্ত করে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে। মাতৃভূমির শৃঙ্খল মোচনে সম্মুখ সমরে প্রাণ দিতে অনুপ্রাণিত করে মুক্তিসংগ্রামীদের।

বঙ্গবন্ধুর জামাতা এম এ ওয়াজেদ মিয়ার স্মৃতিচারণা থেকে জানা যায়, “রাতে বাসায় পরিবারের সদস্যদের নিয়ে খাওয়ার সময় বঙ্গবন্ধু গম্ভীর হয়ে বললেন, ‘আমার যা বলার ছিল আজকের জনসভায় তা প্রকাশ্যে বলে ফেলেছি। সরকার এখন আমাকে যেকোনো মুহূর্তে গ্রেপ্তার বা হত্যা করতে পারে। সে জন্য আজ থেকে তোমরা প্রতিদিন দুই বেলা আমার সঙ্গে একত্রে খাবে।’ সেদিন থেকে এই নিয়ম ২৫ মার্চ দুপুর পর্যন্ত পালন করা হয়। ...ভাষণের পর থেকে শুরু হয় সর্বাত্মক অসহযোগ, কার্যত তিনি পূর্ব পাকিস্তানের শাসনভার গ্রহণ করেন।”

২০১৭ সালে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণকে বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

মন্তব্য