kalerkantho

শুক্রবার । ৩ বৈশাখ ১৪২৮। ১৬ এপ্রিল ২০২১। ৩ রমজান ১৪৪২

আইনি প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ আছে কিশোরের

বিশেষ প্রতিনিধি   

৬ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আইনি প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ আছে কিশোরের

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলার আসামি কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোর বৃহস্পতিবার কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে তাঁর ওপর নির্যাতনের অভিযোগ এনেছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন, তাঁকে গত বছর ২ মে বিকেলে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিরা তাঁর বাসা থেকে ধরে নিয়ে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে নির্যাতন করেছে। তাঁকে ৫ মে র‌্যাবের হাতে তুলে দেওয়ার আগে ৬৯ ঘণ্টা অজ্ঞাত স্থানে আটক রাখা হয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই নির্যাতনের আইনি প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ আছে কিশোরের। তবে এ ক্ষেত্রে তাঁকে আদালতের কাছে লিখিতভাবে তাঁর ওপর নির্যাতনের অভিযোগ জানাতে হবে। আর তাঁকে প্রমাণ করতে হবে যে তাঁর ওপর নির্যাতন করা হয়েছে।

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি মো. নিজামুল হক নাসিম কালের কণ্ঠকে বলেন, যে নির্যাতনের অভিযোগ করা হয়েছে, আইনে তাঁর প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। সরকার প্রতিকার পাওয়ার জন্য আইন করেছে। এ জন্য তাঁকে সংশ্লিষ্ট আদালতে লিখিতভাবে অভিযোগ দিতে হবে। এরপর আদালত আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ নেবেন। তবে তাঁকে সাক্ষ্য দিয়ে প্রমাণ করতে হবে কে বা কারা তাঁকে কখন, কিভাবে আটক করে নিয়ে নির্যাতন করেছে। তিনি বলেন, কিশোরকে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিরা আটকে রেখে নির্যাতনের দীর্ঘ সময় পর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়ার অভিযোগ তো মারাত্মক। এটা সত্য হলে তাঁকে ধরে নেওয়ার প্রত্যক্ষ সাক্ষী পাওয়াই কঠিন হবে। কারণ আমাদের দেশে এভাবে যারা নিয়ে যায় তাদের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষদর্শী থাকার পরও তারা সাক্ষ্য দিতে যায় না। ফলে এ রকম নির্যাতনের অভিযোগ আদালতে প্রমাণ করা যায় না।

সাবেক অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট এম কে রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, এর আগেও এ রকম অভিযোগের প্রতিকার হয়েছে। তাই কিশোরকে তাঁর ওপর নির্যাতনের প্রতিকার চাইতে হলে তাঁকে লিখিতভাবে আদালতে আবেদন দিতে হবে। তথ্য-প্রমাণ দিয়ে তাঁকে আদালতে প্রমাণ দিতে হবে যে তাঁর ওপর নির্যাতন হয়েছে। এরপর আদালত ব্যবস্থা নেবেন।

সুপ্রিম কোর্টের আরেক আইনজীবী খুরশীদ আলম খান বলেন, কিশোর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলার আসামি। তিনি মুক্তি পাওয়ার পর অভিযোগ করেছেন যে তাঁর ওপর নির্যাতন হয়েছে। এ নিয়ে পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। আদালতে অভিযোগ না দিয়ে গণমাধ্যমের কাছে বক্তব্য দিলে হয়তো জনগণের সহানুভূতি তিনি পাবেন, কিন্তু আইনি প্রতিকার তিনি পাবেন না। আইনি প্রতিকার পেতে হলে আইনি কাঠামোর মধ্যে আসতে হবে। তিনি বলেন, এই নির্যাতনের প্রতিকার পেতে হলে তাঁকে সংশ্লিষ্ট আদালতে লিখিতভাবে অভিযোগ দিতে হবে। আদালত অভিযোগ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন।

সুপ্রিম কোর্টের আরেক আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির কালের কণ্ঠকে বলেন, কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোর তাঁর ওপর নির্যাতনের যে অভিযোগ করেছেন তার প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ আছে। এ জন্য নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩-এর অধীনে সংশ্লিষ্ট আদালতের কাছে অভিযোগ জানাতে হবে। তিনি যদি মৌখিক অভিযোগ জানান তবে এই আইনের ৪(১)(ক) ধারা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট আদালত তাত্ক্ষণিভাবে তাঁর অভিযোগ লিপিবদ্ধ করবেন। এরপর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন আদালত। আদালত কী পদক্ষেপ নেবেন, তা আইনেই বলা আছে। প্রতিকার চাইতে হলে তাঁকে বা তাঁর নিকটাত্মীয়দের আদালতের কাছে অভিযোগ দিতে হবে। এ ছাড়া পত্রিকায় বক্তব্য দিয়ে জনগণের সহানুভূতি পাওয়া ছাড়া আইনগত কোনো লাভ হবে না।

কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোর এবং লেখক মুশতাক আহমেদকে গত বছর ৫ মে গ্রেপ্তার করার কথা জানায় র্যাব। এর পরদিন তাঁদের বিরুদ্ধে ‘সরকারবিরোধী প্রচার ও গুজব ছড়ানোর’ অভিযোগে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে রমনা থানায় মামলা করা হয়। পরে রাষ্ট্রচিন্তার সংগঠক দিদারুল আলম ভুইয়া ও ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সাবেক পরিচালক মিনহাজ মান্নানকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ মামলায় গত ১৫ জানুয়ারি প্রয়াত মুশতাক আহমেদ, আহমেদ কবির কিশোর ও দিদারুল আলম—এই তিনজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। আর মিনহাজ মান্নান, জার্মানপ্রবাসী ব্লগার আসিফ মহিউদ্দিন, নেত্র নিউজের সম্পাদক ও সুইডেনপ্রবাসী তাসনিম খলিল, হাঙ্গেরিপ্রবাসী জুলকারনাইন শায়ের খান ওরফে সামি, আশিক ইমরান, স্বপন ওয়াহিদ, যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সাংবাদিক সাহেদ আলম ও ফিলিপ শুমাখারকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়। তবে সাইবার ট্রাইব্যুনাল এই অভিযোগপত্র গ্রহণ করেননি। ট্রাইব্যুনাল গত ১০ ফেব্রুয়ারি অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।

কিশোরের জামিন আবেদনের ওপর শুনানিকালে তাঁর আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া ১ মার্চ হাইকোর্টকে জানান, কিশোরকে কাস্টডিতে শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছে। এ কারণে তাঁর ডান কান প্রায় অকেজো হয়ে পড়েছে। বাঁ পায়ে ক্ষত সৃষ্টি হয়ে তা ঘায়ের পর্যায়ে চলে গেছে। এ অবস্থায় হাইকোর্ট ৩ মার্চ কিশোরের জামিন মঞ্জুর করেন। পরদিন বৃহস্পতিবার কিশোর মুক্তি পেয়েই তাঁর ওপর নির্যাতনের অভিযোগ করেছেন।

মন্তব্য