kalerkantho

শুক্রবার । ৩ বৈশাখ ১৪২৮। ১৬ এপ্রিল ২০২১। ৩ রমজান ১৪৪২

উল্লাপাড়া ও ঢাকায় জানাজা

চিরনিদ্রায় শায়িত এইচ টি ইমাম

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৫ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



চিরনিদ্রায় শায়িত এইচ টি ইমাম

রাজধানীর বনানী কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রবাসী সরকারের মন্ত্রিপরিষদসচিব এইচ টি ইমাম। তিনি আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্যও ছিলেন। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর দেড়টা থেকে বিকেল সোয়া ৩টা পর্যন্ত ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সর্বস্তরের মানুষ এইচ টি ইমামের মরদেহে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানানো হয়। সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া ও ঢাকায় বনানীর আজাদ মসজিদে দুই দফা এইচ টি ইমামের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় পরিবারের সদস্য, আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী এবং সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা অংশ নেন।

গত বুধবার রাত ১টায় ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) এইচ টি ইমাম শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮২ বছর। খুব কম বয়স থেকেই উচ্চ রক্তচাপজনিত জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি। শেষ বয়সে এসে যুক্ত হয় কিডনি জটিলতা ছাড়াও বার্ধক্যজনিত নানা সমস্যা। তাঁর মৃত্যুতে জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতারা শোক জানিয়েছেন।

রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ শোকবার্তায় বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধে এইচ টি ইমাম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি দেশের স্বাধীনতার চেতনার উন্নয়নে এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের জন্য সারা জীবন কাজ করে গেছেন। তিনি সদ্যঃস্বাধীন দেশের সরকার পরিচালনায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শোকবার্তায় বলেন, বাংলাদেশের জনপ্রশাসনে এইচ টি ইমামের অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে প্রবাসী সরকারের মন্ত্রিপরিষদসচিবের দায়িত্ব পালন করেন। বঙ্গবন্ধু সরকারের পুরো সময় তিনি একই পদে থেকে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন।

এ ছাড়া শোক জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও কৃষি মন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহ্মুদ, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, স্থানীয় সরকার মন্ত্রী তাজুল ইসলাম, শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে এম আব্দুল মোমেন, পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান, শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন, বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম, ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদ, পরিবেশ ও বন মন্ত্রী শাহাব উদ্দিন, বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহেমদ পলক, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন, তথ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসান, ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. মো. এনামুর রহমান, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেন, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ, পানিসম্পদ উপমন্ত্রী এনামুল হক শামীম প্রমুখ।

আরো শোক জানান, আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফরউল্যাহ, জাহাঙ্গীর কবির নানক ও আবদুর রহমান, জাতীয় সংসদের হুইপ ও সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন, মির্জা আজম ও এস এম কামাল হোসেন, ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক সুজিত রায় নন্দী প্রমুখ। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আতিকুল ইসলাম, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. জাহাঙ্গীর আলম প্রমুখ।

কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদন : গতকাল বেলা দেড়টা থেকে বিকেল সোয়া ৩টা পর্যন্ত রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাদদেশে এইচ টি ইমামের প্রতি নাগরিক শ্রদ্ধাঞ্জলি অনুষ্ঠিত হয়। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট এর আয়োজন করে। এ সময় এইচ টি ইমামকে বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় চিরবিদায় জানান রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তি, সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।

শুরুতেই রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের পক্ষে তাঁর সামরিক সচিব এইচ টি ইমামের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে তাঁর সামরিক সচিব শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর আওয়ামী লীগের পক্ষে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন দলের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তাঁর সঙ্গে ছিলেন উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য মুকুল বোস, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক, আবদুর রহমান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ প্রমুখ।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পক্ষে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয় জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমীন চৌধুরী ও ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বী মিয়ার পক্ষ থেকেও। মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের মধ্যে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক, তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহ্মুদ, স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম, শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ান, তথ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসান, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন প্রমুখ। ব্যক্তিপর্যায়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব মো. তোফাজ্জল হোসেন মিয়া, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামান, কবি কামাল চৌধুরী প্রমুখ।

আরো শ্রদ্ধা নিবেদন করেন ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, তাঁতী লীগ, কৃষক লীগ, স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ, আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা উপকমিটি, যুব মহিলা লীগ, পূজা উদযাপন পরিষদ, জাসদ (ইনু), ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল, ঢাকাস্থ সিরাজগঞ্জ সাংবাদিক সমিতি, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, বাংলা একাডেমি, বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর, জাতীয় কবিতা পরিষদ, ঢাকাস্থ সিরাজগঞ্জ সমিতি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের পক্ষে শ্রদ্ধা নিবেদন ও এক মিনিট নীরবতা পালনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় নাগরিক শ্রদ্ধাঞ্জলি।

কাজ থেকে কখনো অবসর নেননি : শ্রদ্ধা নিবেদন করতে আসা বিশিষ্ট ব্যক্তিরা এইচ টি ইমামের কর্মময় জীবনের কথা স্মরণ করেন। তাঁরা বলেন, তিনি ছিলেন একজন আপাদমস্তক দেশপ্রেমিক মানুষ। দেশের সব দুর্যোগে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে পরামর্শ দিয়েছেন। নিজের প্রতিটি কাজে তিনি দক্ষতা ও দেশপ্রেমের স্বাক্ষর রেখেছেন।

কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এইচ টি ইমামের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, এইচ টি ইমাম দেশের জন্য অনেক কাজ করে গেছেন। চাকরি থেকে অবসর নিয়েছিলেন। কিন্তু কাজ থেকে কখনো অবসর নেননি।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, ‘এইচ টি ইমাম অত্যন্ত মেধাবী মানুষ ছিলেন। তিনি আমাদের সবার কাছে সর্বজনশ্রদ্ধেয় ব্যক্তি।’ তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহ্মুদ বলেন, পরিণত বয়স হলেও কর্মক্ষেত্রে তিনি ছিলেন তরুণ। একজন কর্মঠ মানুষ ছিলেন।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রী তাজুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা আন্তরিকভাবে তাঁর কর্মকে স্মরণ করব।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামান বলেন, মুজিবনগর সরকার ও যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ বিনির্মাণে তাঁর ভূমিকা জাতি স্মরণ করবে।

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রবাসী সরকার গঠনে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ভিন্নমত থাকলেও তাঁর ব্যবহার ছিল অত্যন্ত মধুর। 

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ বলেন, এইচ টি ইমাম কর্মক্ষেত্রে মেধার স্বাক্ষর রেখে গেছেন। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস বলেন, নিজের প্রতিটি কাজে তিনি দক্ষতা ও দেশপ্রেমের স্বাক্ষর রেখেছেন।

এইচ টি ইমামের ছেলে সিরাজগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য তানভীর ইমাম বলেন, ‘আমার পরিবারের জন্য আজ ভীষণ শোকের দিন। আমার পিতা মুক্তিযুদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং বঙ্গবন্ধুর আদর্শ  থেকে কখনো বিচ্যুত হননি।’

কালের কণ্ঠ’র উল্লাপাড়া প্রতিনিধি জানান, গতকাল সকাল ১১টায় উল্লাপাড়া সরকারি আকবর আলী কলেজ মাঠে এইচ টি ইমামের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে তাঁর মরদেহ বিমানবাহিনীর একটি হেলিকপ্টারে উল্লাপাড়ায় আনা হয়। এখানে তাঁকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। জানাজার সময় বক্তৃতা করেন এইচ টি ইমামের ছেলে সংসদ সদস্য তানভীর ইমাম, সংসদ সদস্য আবদুল মমিন মণ্ডল, জেলা প্রশাসক ড. ফারুক আহমেদ, আওয়ামী লীগ নেতা আবদুস সামাদ তালুকদার ও গোলাম মোস্তফা। এর আগে এইচ টি ইমামের মরদেহ তাঁর নিজ গ্রাম সোনাতলায় নেওয়া হলে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়।

মন্তব্য