kalerkantho

বুধবার । ৮ বৈশাখ ১৪২৮। ২১ এপ্রিল ২০২১। ৮ রমজান ১৪৪২

এ সপ্তাহের সাক্ষাৎকার

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনটি বাতিল হওয়াই শ্রেয়

ড. মিজানুর রহমান, সাবেক চেয়ারম্যান, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন

৫ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনটি বাতিল হওয়াই শ্রেয়

কারাগারে লেখক মুশতাক আহমেদের মৃত্যুর পর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে নতুন করে শুরু হয়েছে নানামুখী বিতর্ক। আইনটি নিয়ে কালের কণ্ঠ’র সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেছেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কালের কণ্ঠ’র বিশেষ প্রতিনিধি এম বদি-উজ-জামান।

 

কালের কণ্ঠ : কারাগারে লেখক মুশতাক আহমেদের মৃত্যুর পর জাতিসংঘ থেকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পর্যালোচনার পক্ষে বিবৃতি দেওয়া হয়েছে, যা বাংলাদেশ সরকার ভালো চোখে দেখছে না। আপনি কি জাতিসংঘের বিবৃতি যুক্তিসংগত মনে করেন?

ড. মিজান : দেখুন, মানবাধিকার বিষয়ে যখন কোনো প্রশ্ন ওঠে, তখন যদি কোনো বিদেশি সংস্থা এ বিষয়ে বক্তব্য দেয়, তখন সেটিকে অভ্যন্তরীণ কোনো বিষয় বিবেচনা করে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কারণ মানবাধিকার এখন আর কোনো দেশের একক বা অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়। এটা আন্তর্জাতিক একটি বিষয়। তা পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তেই হোক না কেন। মানবাধিকার শুধু রাষ্ট্রীয় গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। আমাদের সরকার ওই বিবৃতিকে শিষ্টাচার পরিপন্থী বলতেই পারে। সরকার সমালোচনা করতেই পারে। তবে আমি মনে করি, ওই বিবৃতি কোনোভাবেই শিষ্টাচার পরিপন্থী হিসেবে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। দেখুন, রাশিয়ার বিরোধীদলীয় নেতা অ্যালেক্সি নাভালনির ওপর যখন বিষ প্রয়োগ করা হয়, তখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়ার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়। বিষয়টি মানবাধিকারের পরিপন্থী বলেই ইউরোপীয় ইউনিয়ন পদক্ষেপ নিয়েছে। 

 

কালের কণ্ঠ : ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল করা প্রয়োজন কি না?

ড. মিজান : একটি রাষ্ট্রে ভয়ংকর কোনো আইন থাকতেই পারে। তবে ওই কালো আইনটির কতটা প্রয়োগ হচ্ছে সেটা দেখতে হবে। এটা যদি প্রয়োগ না হয়, তাহলে সেটা মৃত আইনের সমপর্যায়ে চলে যায়। বিশ্বের অনেক দেশেই এ রকম অনেক আইন রয়েছে, যার প্রয়োগ নেই। আপনি দেখবেন, ওই সব দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তা সহজে প্রয়োগ করে না বা প্রয়োগ করলেও আদালত সে ক্ষেত্রে এমন একটি ব্যবস্থা নেয় সে সময় প্রয়োগ বা অপপ্রয়োগের কোনো কার্যকারিতা থাকে না। বরং আদালতের নেওয়া ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দাঁড়ালে উল্টো তাদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে থাকে। সেই হিসেবে এই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনটা যে একটি খারাপ আইন তা কিন্তু প্রশ্নাতীত। যেহেতু আমাদের বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ব্যর্থ হয়েছে। তাই এ রকম একটি বিষয় তাদের হাতে তুলে দেওয়ার চেয়ে এই আইন বাতিল হওয়াই শ্রেয়।

 

কালের কণ্ঠ : কেউ কেউ বলার চেষ্টা করছেন, ডিজিটাল যুগের এই সময়ে রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য এমন আইনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তবে মানবাধিকারের ক্ষেত্রে এই আইনের যে অপপ্রয়োগ হচ্ছে, সে কারণে সংশ্লিষ্ট ধারা সংশোধন বা বাতিল এবং জামিনযোগ্য করা প্রয়োজন। এই প্রস্তাব কতটা যুক্তিসংগত বলে মনে করেন?

ড. মিজান : বর্তমানে ডিজিটাল যুগে আসার ফলে এমন কিছু অপরাধ হচ্ছে যেগুলো কোনোভাবেই দণ্ডবিধি দিয়ে বিচার করা সম্ভব নয়। আর এই বিষয়টি আমার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। তবে এই আইনের কিছু ধারা রয়েছে, যা অবশ্যই পর্যালোচনা করা দরকার। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটা জিনিস কিন্তু আমাদের দেখতে হবে। দেখুন, আমরা কিন্তু সব সময় সঠিক আইন মেনে চলি না, মানার ক্ষেত্রে লুকোচুরি করি। দেখুন, একটা মানুষকে আটক করে নেওয়া হয়েছে ৪৮ কিংবা ৭২ ঘণ্টা আগে। কিন্তু কাগজে-কলমে দেখানো হয় যে তাকে আইনে নির্ধারিত ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই আদালতে উপস্থাপন করা হচ্ছে। কারণ আইনে আছে, আইন রক্ষাকারী বাহিনী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতকে জানাবে কী কারণে তাঁকে আটক করেছে এবং পরবর্তী সময়ে তা আদালতের বিবেচনাতেই জামিন দেওয়া হবে। এই ক্ষেত্রে আইনের সঠিক ব্যবহার ও প্রয়োগ যদি সঠিকভাবে হতো, তাহলে কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটের মতো এত সব ঝামেলার সম্মুখীন হতে হতো না। এসব প্রতারণা থেকে রাষ্ট্রকে বেরিয়ে আসতে হবে। রাষ্ট্রকে আগে সভ্য হতে হবে। আর এটা হলেই রাষ্ট্রকে এত সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয় না। মানবাধিকারের দিক থেকেও বিষয়টি সঠিক থাকে এবং সুপ্রতিষ্ঠিত থাকে। মনে রাখতে হবে, কোনো সভ্য ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূল বিষয়ের মধ্যে অন্যতম হলো সেই রাষ্ট্রের নাগরিকের স্বাধীনতা। মানব উন্নয়নের ক্ষেত্রে ব্যক্তির স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হয়। আর এই স্বাধীনতা না থাকলে অন্য সব কিছু অর্থহীন হয়ে যায়।

 

কালের কণ্ঠ : জাতিসংঘের বিবৃতি ও দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষের পক্ষ থেকে আইনটি বাতিলের দাবির পর আইনমন্ত্রী বলেছেন, এই আইনের অপব্যবহার বা অপ্রপয়োগের বিষয়টি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। আর যাতে অপপ্রয়োগ না হয় সেটাই পর্যালোচনা করা হচ্ছে। সরকারের এই উদ্যোগের সঙ্গে আপনি কি সহমত?

ড. মিজান : একটি কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে গণমানুষের কথা ও তাদের দাবি শুনতে হয়। তা না হলে কিন্তু কোনো সরকারই জনগণের বন্ধু হিসেবে নিজেকে দাবি করতে পারে না। সেই ক্ষেত্রে অবশ্যই সরকারকে জনগণের দাবি মেনে নিতে হবে, বিবেচনা করে দেখতে হবে। এ ছাড়া আইনের অপপ্রয়োগ বা অপব্যবহার কখনোই যেন হতে না পারে সে ব্যাপারে একটি সিদ্ধান্ত বা ব্যবস্থা নিয়ে আইনিব্যবস্থার সংশোধন করাটাও জরুরি।

 

মন্তব্য