kalerkantho

শুক্রবার । ৩ বৈশাখ ১৪২৮। ১৬ এপ্রিল ২০২১। ৩ রমজান ১৪৪২

সীমান্ত নিয়ে জানালেন জয়শঙ্কর

নো ক্রাইম, নো ডেথ

► মোদির বাংলাদেশ সফর হবে খুবই স্মরণীয়
► তিস্তা নিয়ে ভারতের অবস্থান বদলায়নি
► আরো বড় পরিসরে কানেক্টিভিটিতে আগ্রহ

কূটনৈতিক প্রতিবেদক   

৫ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



নো ক্রাইম, নো ডেথ

যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রামানিয়াম জয়শঙ্কর ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন। ছবি : কালের কণ্ঠ

‘নো ক্রাইম, নো ডেথ’। অর্থাৎ সীমান্তে অপরাধ না হলে মৃত্যুও হবে না। সীমান্তে হত্যা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে এমনই ইঙ্গিত দিয়েছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. সুব্রামানিয়াম জয়শঙ্কর। গতকাল বৃহস্পতিবার ঝটিকা সফরে ঢাকায় এসে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেনের সঙ্গে বৈঠকের পর যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তিনি ওই ইঙ্গিত দেন।

সীমান্ত হত্যা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘প্রতিটি মৃত্যুই দুঃখজনক।’ তিনি বলেন, “আমাদের অভিন্ন লক্ষ্য হওয়া উচিত—‘নো ক্রাইম, নো ডেথ’। আমি নিশ্চিত, যদি ‘নো ক্রাইম, নো ডেথ’কে সঠিকভাবে এগিয়ে নিতে পারি আমরা একসঙ্গে সমস্যাটি কার্যকরভাবে সমাধান করতে পারব।”

তিনি আরো বলেন, সমস্যাটি কোথায় তা বাংলাদেশ, ভারত—দুই দেশই জানে। সমস্যাটি সৃষ্টি হয়েছে অপরাধের কারণেই। দুই দেশই এ নিয়ে আলোচনা করেছে।

তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি ইস্যুতে এক প্রশ্নের জবাবে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ওই চুক্তি নিয়ে ভারত সরকারের অবস্থান বদলায়নি। ভবিষ্যতে দুই দেশের পানিসম্পদসচিবরা বৈঠক করবেন। সেখানে অভিন্ন নদ-নদীগুলোর বিষয়ে আরো আলোচনা হবে বলে তিনি আশা করেন।

আগামী বছরগুলোতে বঙ্গোপসাগরসহ পুরো অঞ্চলের ভূ-অর্থনীতির জন্য আরো বড় পরিসরে কানেকটিভিটির ওপর জোর দেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মোমেনের সঙ্গে আলোচনায় এ বিষয়ে অনেক কথা হয়েছে। তাঁরা মনে করেন, আরো বড় পরিসরে কানেকটিভিটি সম্ভব।

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘কানেকটিভিটি’ প্রক্রিয়ায় তাঁরা তৃতীয় দেশকেও যুক্ত করতে চান। এ ক্ষেত্রে তিনি জাপানের উদাহরণ দিয়ে বলেন, ওই দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশ, ভারত—দুই দেশেরই খুব ভালো সম্পর্ক আছে। জাপান বঙ্গোপসাগরে কানেকটিভিটি প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত আছে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দুই দেশের মধ্যে এবং জনগণ পর্যায়ে সম্পর্কের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক আসলে দুই দেশের জনগণের মধ্যে সম্পর্ক।

এর আগে ড. জয়শঙ্কর বলেন, প্রায় দেড় বছর পর বাংলাদেশ সফরে এসে তিনি অত্যন্ত আনন্দিত। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মোমেনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা খুব আনন্দের বিষয়, যাঁর আমন্ত্রণ আমার জন্য সবচেয়ে সময়োচিত ছিল।

জয়শঙ্কর সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা আমাদের প্রধানমন্ত্রীর পরিকল্পিত সফরের প্রস্তুতি নিয়ে কাজ করছি। এই সফর খুবই স্মরণীয় হবে, কারণ এটি করোনাভাইরাস মহামারির পরে ভারতের বাইরে তাঁর প্রথম এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বাংলাদেশে দ্বিতীয় সফর। আমরা জানি, এটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ একটি বছর। কারণ, উভয় দেশ মুজিববর্ষ এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও আমাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ৫০ বছর পালন করছে।’

‘ওই তিনটি বার্ষিকীর প্রতি আমরা যে গুরুত্বারোপ করেছি এবং সেই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বাংলাদেশের প্রতি আমাদের যে অপরিসীম সম্মান তা এতে প্রতিফলিত হয়’—জানান ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আমাদের সম্পর্ক গত্বাঁধা অংশীদারির ঊর্ধ্বে এবং আমি বিশ্বাস করি, আমাদের বন্ধন শান্তিপূর্ণ, সমৃদ্ধ এবং প্রগতিশীল দক্ষিণ এশিয়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নের কেন্দ্রবিন্দু। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে উভয় পক্ষই এই সম্পর্কের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন করেছে, বিশেষত ২০১৪ সালের মে মাসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে।’

‘প্রতিবেশীই প্রথম’ এবং ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতির আওতায় বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের গুরুত্ব তুলে ধরে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশকে কেবল দক্ষিণ এশিয়ায়ই নয়, বিস্তৃত ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলেও একটি মূল প্রতিবেশী এবং গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করি। আমাদের সম্পর্কের প্রতিটি অর্জন সমগ্র অঞ্চলকে প্রভাবিত করে। আমরা অন্যদের কাছে এই সম্পর্ককে একটি অনুকরণীয় উদাহরণ হিসেবে উদ্ধৃত করি।’

নিরাপত্তা, বাণিজ্য, পরিবহন ও সংযোগ, সংস্কৃতি, মানুষে-মানুষে সম্পর্ক থেকে শুরু করে জ্বালানি ও অভিন্ন সম্পদ এবং প্রতিরক্ষা সম্পর্কের যৌথ বিকাশসহ সব ক্ষেত্রে অংশীদারি বাড়ানোর লক্ষ্যে দুই দেশ কাজ করছে বলে জানান ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আমাদের স্বাচ্ছন্দ্যের মাত্রা এখন এত বেশি যে, আমরা দেখিয়েছি—এমন কোনো সমস্যা নেই যা আমরা আলোচনা করতে পারি না বা বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে পারি না।’

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দুই দেশের মধ্যে শীর্ষ থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ে বৈঠকের কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘এমনকি এই মহামারি আমাদের বন্ধুত্বকে আরো দৃঢ় করার সুযোগ দিয়েছে। বাংলাদেশ ভারতে উৎপাদিত কভিড ভ্যাকসিনের সবচেয়ে বড় গ্রহীতা। এ ছাড়া বন্ধুদের মধ্যে আমাদের ভ্যাকসিনের সবচেয়ে বড় উপহারটিও (২০ লাখ ডোজ) এ দেশের জন্য ছিল।’

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘নিকটতম প্রতিবেশী এবং বন্ধু হিসেবে স্বল্পোন্নত দেশের মর্যাদা থেকে বাংলাদেশের প্রত্যাশিত উত্তরণের জন্য আমরা প্রশংসা ও গর্ব প্রকাশ করি। আমরা আপনাদের অভাবনীয় আর্থ-সামাজিক অগ্রগতি এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল।’

গুরুত্বপূর্ণ বার্ষিকীগুলো উপলক্ষে বাংলাদেশের বন্ধুদের শুভেচ্ছা জানিয়ে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আপনাদের সকল স্বপ্ন সত্যি হোক এবং আমি আপনাদের আশ্বস্ত করছি যে, ভারত সব সময় নির্ভরযোগ্য বন্ধু হিসেবে আপনাদের পাশে থাকবে। এ বছরের ২৬ জানুয়ারি আমাদের প্রজাতন্ত্র দিবসের কুচকাওয়াজে আপনাদের অংশগ্রহণ আমাদের অভিন্ন ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করে। এটি আমাদের গভীর সংহতিরও একটি অভিব্যক্তি, যা আমাদের সম্পর্ককে সব সময় দিকনির্দেশনা দেবে।’

এদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠককে ফলপ্রসূ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, সব বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। আলোচনার বড় অংশ জুড়ে ছিল এ মাসের শেষে মোদির বাংলাদেশ সফরের প্রস্তুতি। তিনি ফলপ্রসূ সফর প্রত্যাশা করেন।

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গতকাল সকাল ১০টার দিকে বিশেষ ফ্লাইটে ঢাকায় আসেন। বিকেলে গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা শেষে গত রাতেই তিনি ভারতে ফিরে যান।

 

 

মন্তব্য