kalerkantho

সোমবার । ৬ বৈশাখ ১৪২৮। ১৯ এপ্রিল ২০২১। ৬ রমজান ১৪৪২

উন্নয়নশীল দেশে যেতে জাতিসংঘের সুপারিশ

সক্ষমতা বাড়ানোর তাগিদ

মাসুদ রুমী   

২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সক্ষমতা বাড়ানোর তাগিদ

স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় উন্নীত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) শুক্রবার রাতে এই সুপারিশ করেছে। জাতিসংঘের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো দেশ পর পর দুটি ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনায় উত্তরণের মানদণ্ড পূরণে সক্ষম হলে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের চূড়ান্ত সুপারিশ পায়। বাংলাদেশ দ্বিতীয়বারের মতো মানদণ্ডগুলো অর্জন করেছে। তবে বাংলাদেশকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে এলডিসি থেকে বের হতে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এর ফলে বিশ্বে বাংলাদেশের মর্যাদা এক ধাপ বাড়ল, যা বৈদেশিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে সহায়ক হবে। অন্যদিকে বিশ্ববাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার, বিভিন্ন পণ্যে আমদানি শুল্ক আরোপসহ আরো কিছু সুযোগ ধীরে ধীরে ছেড়ে দিতে হবে। এ জন্য বাংলাদেশ যে সময় পাচ্ছে, এর মধ্যেই সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর ব্যাপক জোর দিতে হবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির পাশাপাশি রাজস্ব আদায় বাড়াতে আরো কার্যকর কর্মসূচি নিতে হবে। একই সঙ্গে করোনাভাইরাস মহামারিতে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াও জোরদার করতে হবে।

গত ২২-২৬ ফেব্রুয়ারি নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে এলডিসি স্ট্যাটাস পর্যালোচনা করে বাংলাদেশ, নেপাল ও লাওসকে এলডিসি থেকে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় উত্তরণের সুপারিশ করা হয়।

জানা গেছে, এলডিসি থেকে উত্তরণে নিয়ম অনুযায়ী আনুষ্ঠানিক ঘোষণার জন্য তিন থেকে পাঁচ বছর প্রস্তুতিকালীন সময় পাওয়া যায়। বাংলাদেশ এরই মধ্যে পাঁচ বছরের প্রস্তুতিকালীন সময় চেয়ে আবেদন করেছে। তিনটি শর্ত পূরণ হলে এবং পর পর দুটি পর্যালোচনায় মানদণ্ড ধরে রাখতে পারলে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের সুপারিশ করে সিডিপি।

২০১৮ সাল থেকে বাংলাদেশ তিনটি শর্তই পূরণ করে আসছে। আবার মানদণ্ডও ধরে রেখেছে।

এর আগে ২০১৮ সালের সিডিপির মূল্যায়নে তিনটি সূচকেই বাংলাদেশ নির্দিষ্ট মান অর্জন করেছিল। এবার ২০২১ সালের মূল্যায়নেও তিনটি সূচকেই মান অর্জন করেছে বাংলাদেশ। তবে এলডিসি থেকে বের হয়ে পূর্ণ উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার চূড়ান্ত স্বীকৃতি মিলতে বাংলাদেশকে আরো তিন বছর অপেক্ষা করতে হতে পারে। সাধারণত সিডিপির সুপারিশের তিন বছর পর চূড়ান্ত স্বীকৃতি মেলে। ওই হিসাবে আগামী ২০২৪ সালে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে এই চূড়ান্ত স্বীকৃতি আসতে পারে। তবে করোনা পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে আরো দুই বছর সময় চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। সিডিপি আবেদন আমলে নিলে সে ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সুপারিশ পেতে আরো পাঁচ বছর লাগতে পারে। সে ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সুপারিশ আসবে ২০২৬ সালে। তবে বাংলাদেশ চেষ্টা করছে দ্রুত করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলা করে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে শামিল হতে।

এদিকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হয়ে আসার পর অর্থনীতিতে বেশ কিছু ঝুঁকি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার বিষয়টি সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান পাওয়ার ক্ষেত্রে দাতাদের কঠিন শর্তের মুখে পড়ার ঝুঁকি দেখা দিতে পারে। তাঁরা বলছেন, এলডিসি থেকে বের হলে সবচেয়ে সমস্যায় পড়তে হবে রপ্তানি খাতে। কারণ এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডাব্লিউটিও) আওতায় শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা পায়। ইউরোপীয় ইউনিয়নে তো আঞ্চলিক বা দ্বিপক্ষীয় ভিত্তিতেও এ ধরনের শুল্ক সুবিধা পেয়ে থাকে। নিয়ম অনুযায়ী, ২০২৬ সালে এসব সুবিধা বন্ধ হয়ে যাবে; যদিও ইউরোপীয় ইউনিয়নে জিএসপির আওতায় এই শুল্কমুক্ত সুবিধা থাকবে ২০২৭ সাল পর্যন্ত। তবে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায় গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে ভাবমূর্তি উন্নয়নের ফলে বেশি পরিমাণে বৈদেশিক ঋণ পাওয়া সুবিধাজনক হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন গতকাল শনিবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বড় ধরনের কোনো বিপদ-আপদ না ঘটলে বাংলাদেশ ২০২৬ সালে এলডিসি থেকে বের হয়ে যাবে। সুবিধা বলতে এটা একটা বড় ভাবমূর্তির। অনুন্নত কথাটা ভালো শোনায় না। উন্নয়নশীল শব্দটা কিন্তু পজিটিভ শব্দ, তাই শুনতেও ভালো লাগে। এটা বিনিয়োগকারীদের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।’

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সুবিধাটা হলো আমাদের ইমেজ এবং ব্র্যান্ডিংয়ের। আমাদের শক্তিমত্তা এবং ক্যাপাসিটি এ দুটি বিষয়ের ওপর বিশ্বদরবারে আমাদের ভাবমূর্তি তৈরি হবে। বিনিয়োগকারীরা আগ্রহী হবে। তবে শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধাসহ আন্তর্জাতিক কিছু সহযোগিতা বন্ধ হয়ে যাবে। বৈদেশিক সাহায্যগুলোও চলে যাবে। এলডিসিদের জন্য কিছু ফান্ড আছে, যেমন—জলবায়ু মোকাবেলা করার জন্য, এগুলো চলে যাবে। ফার্মাসিউটিক্যালস ওয়েভারের সুবিধা হয়তো থাকবে না। এসব নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সক্ষমতা বাড়াতে হবে। বিভিন্ন আঞ্চলিক উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হতে হবে। দেশের ভেতরে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় বাড়াতে হবে এবং দেশের বাইরেও আঞ্চলিত বাণিজ্য জোট ও ঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত হওয়ার চেষ্টা চালাতে হবে।’

সিপিডির গবেষণা পরিচালক গোলাম মোয়াজ্জেম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমাদের ভাবমূর্তি বাড়বে। তবে অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতাও বাড়বে। বিশেষভাবে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে নতুন প্রতিযোগিতায় পড়তে হবে। আবার রপ্তানীকৃত পণ্যের বাজার পেতেও আগের চেয়ে প্রতিযোগিতার সম্মুখীন  হতে হবে।’

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা