kalerkantho

বুধবার । ১ বৈশাখ ১৪২৮। ১৪ এপ্রিল ২০২১। ১ রমজান ১৪৪২

ভাবমূর্তি ক্ষুণ্নের অপরাধ কোনো দেশেই নেই

ড. শাহদীন মালিক

২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



ভাবমূর্তি ক্ষুণ্নের অপরাধ কোনো দেশেই নেই

আমাদের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের দুটি দিক আছে। প্রথমটি হচ্ছে কম্পিউটার ডিভাইসের মাধ্যমে, যাকে বড় দাগে হ্যাকিং বলা চলে। এসংক্রান্ত অপরাধের ব্যাপারে আমাদের আইন ছিল না। কম্পিউটারের মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধ দমনে এই আইনের যে ধারাগুলো, তার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। দ্বিতীয়তটি হচ্ছে, কম্পিউটারের মাধ্যমে অপরাধের বাইরে বিভিন্ন ধরনের ভাবমূর্তি বিনষ্ট, অনুভূতি বা অন্যান্য আনুষঙ্গিক মানসিক আঘাত সংক্রান্ত যে ধারাগুলো, বিশেষত ৮, ২১, ২৫, ২৮, ২৯, ৩১ ইত্যাদি ধারায় যে কাজগুলোকে অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে এবং যার জন্য কঠিন শাস্তির বিধান আছে, সেগুলো বর্তমান গণতান্ত্রিক বিশ্বে অন্য কোনো দেশের ফৌজদারি আইনে আমি খুঁজে পাই নাই। অন্য কোনো দেশে ভাবমূর্তি এবং আনুষঙ্গিক বিষয়গুলোতে ফৌজদারি আইনে অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে শাস্তির বিধান করা হয়নি।

ফৌজদারি আইনের ইতিহাসে আমরা দেখি যে বড় দাগে ১৮৫০ সালের আগে বিভিন্ন দেশে রাজা-বাদশাহ ও নবাব-সম্রাটদের অসম্মান করা, সমালোচনা করা তথা তাঁদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা ছিল ভীষণ অপরাধ। রাজা-বাদশাহদের ভাবমূর্তির বিরুদ্ধে এই সব অপরাধের অকাতরে শাস্তি ছিল কল্লা কাটা, অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ড। এর প্রধান কারণ, রাজা-বাদশাহদের প্রতি জনসমর্থন নিরূপণের কোনো উপায় অর্থাৎ নির্বাচনের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। তখন রাজা-বাদশাহরা জনসমালোচনাকে ভীষণ ভয় পেতেন। তাই এই সব অপরাধ সৃষ্টি করে নিজেদের রক্ষার ব্যবস্থা করতেন।

সাধারণভাবে ১৮৫০ সালের পর ক্রমান্বয়ে গণতন্ত্রের প্রচলনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এই সব অপরাধ ফৌজদারি আইন থেকে বিলুপ্ত করা হয়। ব্রিটিশ আমলে প্রণীত এবং এখন প্রচলিত আমাদের ফৌজদারি আইন, অর্থাৎ পেনাল কোড-১৮৬০-এ ভাবমূর্তিসংক্রান্ত কোনো অপরাধ ছিল না। মানহানি নামে একটা অপরাধ ছিল। কিন্তু চার লাইনের সেই অপরাধের সাথে গোটা দশেক ব্যতিক্রম ছিল। সেইগুলো পাশ কাটিয়ে গত দেড় শ বছরে মানহানির মামলা হয়েছে হাতে গোনা কয়েকটি। ব্যতিক্রমের মূলকথা ছিল, যেকোনো জনগুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির দায়িত্ব পালন সংক্রান্ত কোনো সমালোচনায় মানহানি হবে না। কিন্তু এখন সব কিছু উল্টে গেছে।

আমার কাছে এই আইনের (ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন) ভাবমূর্তিসংক্রান্ত ধারাগুলোর উদ্দেশ্য একটা এবং তা স্পষ্ট—সমালোচনা করা যাবে না। যেকোনো সমালোচনায়ই সমালোচিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে, এই অজুহাতে এই আইনের বদৌলতে সমালোচনাকারীকে জেলে পাঠিয়ে দেওয়া যায়। দোষী অথবা নির্দোষ প্রমাণের বহু আগেই অনেক মাস কারাবাস হবে। এমনকি কারাগারে মৃত্যুও হতে পারে, যেটা হয়েছে মুশতাক আহমেদের বেলায়। কারাগারে থাকলে জীবিকা রসাতলে যায়, কারাগার থেকে বেরিয়ে চাকরি পাওয়া দুষ্কর, পরিবার-পরিজনের অকল্পনীয় দুঃখ-কষ্ট ও নির্যাতন হয়। অন্য অনেকেও তাঁদের সমালোচনার রাশ টেনে ধরতে বাধ্য হন। অর্থাৎ বাকস্বাধীনতা খর্ব ও সীমিত করার সরকারের উদ্দেশ্য এই আইনে সফল হয়েছে।

এই ধারাগুলো যত দিন থাকবে আমরা তত দিন সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত বাকস্বাধীনতার দেশে বাস করব। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের এই ধারাগুলো অবিলম্বে বাতিল করতে হবে।

(লেখক : সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের আইনের শিক্ষক)

মন্তব্য