kalerkantho

শুক্রবার । ৩ বৈশাখ ১৪২৮। ১৬ এপ্রিল ২০২১। ৩ রমজান ১৪৪২

পিলখানা হত্যাকাণ্ড

বনানী কবরস্থানে স্মরণ শ্রদ্ধা দোয়া

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বনানী কবরস্থানে স্মরণ শ্রদ্ধা দোয়া

পিলখানা হত্যাকাণ্ডের বার্ষিকীতে গতকাল সেনা কর্মকর্তাদের কবরে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন পরিবারের সদস্যরা। ছবি : কালের কণ্ঠ

‘আমি তখন ছোট। বয়স সাড়ে ছয় বছর। আব্বুর স্মৃতি তবু মনে আছে। পিলখানায় একটা ভয়ংকর শৈশব স্মৃতি আমার। এখন চাওয়া, সেই খুনিদের বিচার কার্যকর হওয়া যেন দেখতে পারি। আমার বাবার মতো শহীদদের আত্মত্যাগের দিনটিকে শহীদ সেনা দিবস হিসেবে ঘোষণা করার দাবিও জানাচ্ছি।’

বাবার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে এ কথা বলছিল তৌফিক ইশফাক। আদমজী ক্যান্টনমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র ইশফাক পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহ ও নির্মম হত্যাকাণ্ডে নিহত সেনা কর্মকর্তা লে. কর্নেল সাজ্জাদুর রহমানের ছেলে। গতকাল বৃহস্পতিবার বাবার মৃত্যুবার্ষিকীতে স্বজনদের সঙ্গে রাজধানীর বনানী সামরিক কবরস্থানে কবর জিয়ারতে আসে ইশফাক। এক যুগ পরে শৈশবে বাবা হারানোর কষ্টের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসে তার, “২৪ ফেব্রুয়ারি রাতে আব্বুর সঙ্গে আমার শেষ দেখা। তাঁর এক বন্ধুর বিবাহবার্ষিকী অনুষ্ঠান থেকে আমরা ফিরি। সকালে গোলাগুলির শব্দ। আব্বু বাসায় ফোন করে আম্মুকে বলেছিলেন, ‘তোমরা সাবধানে থেকো...।’”

পিলখানায় সেই হত্যাযজ্ঞে প্রাণ হারানো সেনা কর্মকর্তাদের স্বজনরা গতকাল কবর জিয়ারতে গিয়ে ইশফাকের মতোই প্রিয়জন হারানোর কষ্টের যুগ পূর্ণ করল। তারাও দিনটিকে ‘শহীদ সেনা দিবস’ হিসেবে ঘোষণার দাবি জানায়। স্বজনদের সঙ্গে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরাও সেনা কর্মকর্তাদের কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। রাষ্ট্রপতির পক্ষে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন তাঁর সামরিক সচিব মেজর জেনারেল এস এম সালাহ উদ্দিন ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে তাঁর সামরিক সচিব মেজর জেনারেল নকিব আহমেদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ, নৌবাহিনীর ভারপ্রাপ্ত প্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম আবু আশরাফ, বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল মাসিহুজ্জামান সেরনিয়াবাত, জননিরাপত্তা বিভাগ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব মোস্তাফা কামাল উদ্দীন ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. সাফিনুল ইসলাম।

পুষ্পস্তবক অর্পণ শেষে শহীদদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এ সময় সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা শহীদ সেনা সদস্যদের সম্মানে স্যালুট প্রদান করেন। পরে শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে দোয়া করা হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের পক্ষ থেকে নিহত সেনা কর্মকর্তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়। এদিকে সব সেনানিবাসের কেন্দ্রীয় মসজিদে শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে সব স্তরের সেনা সদস্যদের উপস্থিতিতে মিলাদ মাহফিল ও বিশেষ মোনাজাতের আয়োজন করা হয়।

২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় হত্যাকাণ্ডে প্রাণ হারান ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন। এই ঘটনায় নিহতদের স্বজনরা বিচারের রায় কার্যকরের অপেক্ষায় আছে এখন। স্বামীর কবরের কাছে গিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে মুনমুন আক্তার বলেন, ‘আমার স্বামী লে. কর্নেল শামসুল আজম ছিলেন দেশের নিবেদিত সেনা। তাঁকে যারা হত্যা করেছে তাদের বিচার দেখতে চাই। বিচারের তো রায় হয়েছে। এই বিচার দ্রুত হোক, তা-ই চাই আমরা।’

ওই সময় র‌্যাবে কর্মরত ছিলেন মেজর কাজী মোসাদ্দেক। তাঁর মেয়ে নাজিয়া তাবাসসুম বলেন, ‘আমরা রাষ্ট্রের কাছে সম্মান চাই। এমনভাবে যাঁরা নিহত হলেন তাঁদের জন্য এই দিনটিকে শহীদ সেনা দিবস ঘোষণা করা হোক। রাষ্ট্রীয় দিবসের মতো পালিত হোক দিনটি।’ সেদিন নিহত হওয়া কর্নেল কুদরাত এলাহী রহমান শফিকের ছেলে অ্যাডভোকেট সাকিব রহমান বলেন, ‘তদন্তে যে ১১ দফা নির্দেশনা তার বাস্তবায়ন দেখতে চাই আমরা। আমরা জানতে চাই এদের পেছনে কারা আছে। আমার দাবি, একটি জুডিশিয়াল ইনকোয়ারি কমিশন গঠন করা হোক।  হাইকোর্টের রায়ের পর তিন বছর পেরিয়ে গেলেও চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য সর্বোচ্চ আদালতে এ বছরের মধ্যে আপিল শুনানি শুরু করা নিয়ে সংশয় রয়েছে আইনজীবীদের।’

নিহত লে. কর্নেল লুত্ফর রহমানের ভাই আখলাকুর রহমান ও এহতেশাম রহমান বলেন, তাঁরা চান, এই দিনকে রাষ্ট্রীয় শোক ও ছুটি হিসেবে ঘোষণা করা হোক। তাহলে আগামী প্রজন্ম এই দিন সম্পর্কে জানতে পারবে। মেজর মোস্তফা আসাদুজ্জামানের ভায়রা আসলাম সেরনিয়াবাত বলেন, রায় দ্রুত বাস্তবায়ন করা হোক। তাহলেই নিহত সেনা কর্মকর্তাদের আত্মা শান্তি পাবে।

কবরস্থানে শ্রদ্ধা জানাতে আসেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের নেতারাও। শ্রদ্ধা জানাতে এসে বিএনপি নেতা মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহম্মদ বলেন, ১২ বছর পরও এই হত্যাকাণ্ডের বিচারের চূড়ান্ত ফায়সালা হয়নি। দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে। ষড়যন্ত্রকারীদের বিচার দাবি করেন তিনি।

এক যুগ আগে, ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি বিডিআর (বর্তমান নাম বিজিবি) সদর দপ্তর পিলখানাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিদ্রোহ করেন সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কিছু সদস্য। তাঁরা পিলখানায় নারকীয় হত্যাকাণ্ড চালান। নিষ্ঠুর আচরণ ও পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয় সামরিক কর্মকর্তাদের অনেকের পরিবারের সদস্যরাও। দুই দিনব্যাপী ওই বিদ্রোহ শেষে ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের মামলাটি এখন আইনি লড়াইয়ে চূড়ান্ত ধাপে রয়েছে। তবে এ ঘটনায় বিস্ফোরক আইনে করা মামলাটি এখনো বিচারিক আদালতের গণ্ডি পেরোয়নি।

হত্যা মামলায় নিম্ন আদালতের রায়ের পর আপিল শুনানি শেষে হাইকোর্ট ২০১৭ সালের নভেম্বরে দেওয়া রায়ে ১৩৯ জনকে ফাঁসি, ১৮৫ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ২০০ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেন। এ ছাড়া নিম্ন আদালতের সাজার বিরুদ্ধে ২৮ জন আপিল না করায় তাঁদের সাজা বহাল রাখা হয়। সব মিলিয়ে ৫৫২ জনকে সাজা দেন হাইকোর্ট।

হাইকোর্টের রায়ের পর দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে ২০৪ জন আসামি পৃথক আপিল ও লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন) করেছেন। খালাস পাওয়া ও সাজা কমা ৮৩ জন আসামির ক্ষেত্রে ২০টি লিভ টু আপিল করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। এখন এসব আপিল ও লিভ টু আপিল শুনানির অপেক্ষায়।

মন্তব্য