kalerkantho

শুক্রবার । ৩ বৈশাখ ১৪২৮। ১৬ এপ্রিল ২০২১। ৩ রমজান ১৪৪২

হুটহাট সিদ্ধান্তেই শিক্ষায় তালগোল

► স্কুল-কলেজ খোলা নিয়ে নানা মত
► দানা বেঁধেছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন
► মাঠে রয়েছেন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও
► শনিবার আন্ত মন্ত্রণালয় বৈঠকে সিদ্ধান্ত আসতে পারে

শরীফুল আলম সুমন   

২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



হুটহাট সিদ্ধান্তেই শিক্ষায় তালগোল

পরীক্ষার স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার এবং হল ও ক্যাম্পাস খুলে দেওয়ার দাবিতে গতকাল শিক্ষার্থীরা শাহবাগে মিছিল বের করলে পুলিশ কয়েকজনকে ধরে নিয়ে যায়। পরে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়। ছবি : কালের কণ্ঠ

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে প্রায় এক বছর ধরে বন্ধ রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এই সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা, পরীক্ষা নেওয়াসহ নানা বিষয়ে শিক্ষা প্রশাসন থেকেই একেক সময় একেক রকম কথাবার্তা শোনা গেছে। এমনকি সিদ্ধান্ত জানানোর পরও তা পরিবর্তন করা হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরাও সমস্যায় পড়ছেন। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা।

সম্প্রতি শিক্ষার্থীদের হল খোলার আন্দোলনের মধ্যে ২৪ মে থেকে সব বিশ্ববিদ্যালয় এবং ১৭ মে থেকে হল খোলার ঘোষণা দেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। ১৭ মের আগে কোনো পরীক্ষাও নেওয়া যাবে না বলে জানানো হয়। এই কারণে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ শুরু করলে দুই দিন পরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত রাজধানীর সাত কলেজে পরীক্ষা গ্রহণের অনুমতি মিলেছে। এখন পরীক্ষা নেওয়ার দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজের শিক্ষার্থীরা।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর শাহবাগে ও গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজের সামনে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামেন। তাঁরা আগামী রবিবার পর্যন্ত তিন দিনের আলটিমেটাম দিয়েছেন। এ ছাড়া মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও পরীক্ষা গ্রহণের দাবিতে আন্দোলনের মাঠে রয়েছেন। জাহাঙ্গীরনগর, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, ইসলামীসহ একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা হল খোলা ও পরীক্ষা গ্রহণের দাবিতে আন্দোলন করছেন।

এর আগে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলতে গত ৪ ফেব্রুয়ারির মধ্যে স্কুল-কলেজকে প্রস্তুতি নিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। তখন অনেকেই ধারণা করেছিলেন, হয়তো ফেব্রুয়ারি মাস থেকেই সীমিত পরিসরে স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হতে পারে। অথচ এরপর দুই দফা ছুটি বাড়ানো হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, যদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলাই না হয়, তাহলে কেন প্রস্তুতি নিতে বলা হলো? কত দিন এই প্রস্তুতি ধরে রাখা যায়? আসলে শিক্ষা প্রশাসনের মধ্যে আলাপ-আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে ঘাটতি রয়েছে। 

তবে গতকাল রাজধানীতে এক অনুষ্ঠান শেষে শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা এসএসসি ও এইচএসসির জন্য সংক্ষিপ্ত সিলেবাস প্রকাশ করেছি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলারও সমস্ত প্রস্তুতি নিয়েছি। আমাদের জাতীয় পরামর্শক কমিটি রয়েছে, তাদের পরামর্শ আমরা নিচ্ছি। শনিবার আমাদের আন্ত মন্ত্রণালয় সভা রয়েছে। সেদিন আমরা সিদ্ধান্ত নেব, আমরা কি ১ মার্চ থেকেই মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিতে পারব, নাকি আমাদের আরো কয়েক দিন সময় নিতে হবে। আমাদের এখানে করোনা পরিস্থিতি বর্তমানে ভালো অবস্থায় রয়েছে। সেটা যেন আমাদের কারণে খারাপ পরিস্থিতিতে না যায়, সেটাও আমাদের খেয়াল রাখতে হবে।’

জানা যায়, করোনা পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসার পর মন্ত্রণালয় গত বছরের শেষ দিক থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থীদের আটকে থাকা পরীক্ষাগুলো নেওয়ার পরামর্শ দেয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে। আবাসিক হলগুলো বন্ধ রাখায় শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে মেসে এবং ভাড়া বাড়িতে থেকে পরীক্ষায় অংশ নিতে থাকেন। কিন্তু গত সোমবার হঠাৎ করে আবার পরীক্ষা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের পর গত মে মাস থেকেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পরীক্ষা চলছিল। সম্প্রতি সেটাও বন্ধ ঘোষণা করা হয়।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজের শিক্ষার্থীরা বলছেন, রাজধানীর সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা যদি হোস্টেলে না থেকে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেন, তাহলে আমাদের পরীক্ষা নিতে সমস্যা কোথায়? আর পরীক্ষা যদি বন্ধই করবে, তাহলে ১০ মাস পর পরীক্ষা শুরুই বা করা হলো কেন? সাত কলেজকে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ দিলে অন্যদেরও দিতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এ কে আজাদ চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শিক্ষাঙ্গনে অস্থিরতা বিরাজ করছে। এক বছর ধরে ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া বন্ধ। হলে যেতে পারছে না। আবার সরকারেরও বা কী করার আছে? তারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলবে কি খুলবে না তা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছে। সব মিলিয়ে মন্ত্রণালয়ের মধ্যেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। কভিডে সামাজিক, অর্থনৈতিক ক্ষতি হলেও শিক্ষাজীবনই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমি আশা করি, আলাপ-আলোচনা ও যথাযথ পরিকল্পনার মাধ্যমে শিক্ষাঙ্গনের এই অস্থিরতা কেটে যাবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. ছিদ্দিকুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে আমরা সম্প্রতি যেসব সিদ্ধান্ত পাচ্ছি, তা অপরিকল্পিত। হল বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীরা আশপাশের মেসে বা আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে থাকছে। এর চেয়ে হলেই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা সম্ভব। প্রথমত, আমি হল বন্ধ রেখে পরীক্ষা নেওয়াটা সমর্থন করি না। এ ছাড়া এত দিন যে পরীক্ষা নিল, তাতে যদি কোনো সমস্যা না হয়, তাহলে হঠাৎ করে পরীক্ষা বন্ধের কোনো কারণ দেখি না। এতে ছাত্রদের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচিত ছিল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেহেতু স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, তাই কোনো সিদ্ধান্ত তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ঠিক নয়।’

জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির এই সদস্য আরো বলেন, ‘এখন কবে দেশ করোনামুক্ত হবে আর তখন স্কুল-কলেজ খুলবে, এটা একটা অনিশ্চিত যাত্রা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাড়া সব কিছু চলছে। সবচেয়ে বেশি ভিড় বাজারে, সেখান মানুষ ধাক্কাধাক্কি করে যাচ্ছে। এর চেয়ে স্কুল-কলেজে অনেকটাই স্বাস্থ্যবিধি মানা সম্ভব। শিক্ষার্থীরাও তো ঘরে বসে নেই, তারা নানা জায়গায় যাচ্ছে। তবে এটা ঠিক, সবার আগে আমাদের শিক্ষার্থীদের জীবনের নিরাপত্তা। এর পরও স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত পরিসরে হলেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার পরিকল্পনা করতে হবে।’

সাবেক শিক্ষাসচিব নজরুল ইসলাম খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই যে একসঙ্গে খুলতে হবে এটা ঠিক নয়। করোনা যেখানে কম সেখানে আগে খোলা যেতে পারে। আসলে আমাদের আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে কাজ করার অভাব রয়েছে। ডিসিশন মেকিং কিন্তু একটা আর্ট। অনেক দেশেই ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউট আছে। কিন্তু আমাদের দেশে তা নেই। আমাদের শিক্ষাঙ্গনে ম্যানেজমেন্টের দিকটা আমাদের দুর্বল। এ ছাড়া যোগাযোগেরও অভাব রয়েছে।’

গত বছরের ১৭ মার্চ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের ঘোষণার পর এপ্রিল থেকেই অনলাইনে ক্লাস শুরু করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। আর মে মাস থেকে অনলাইনে পরীক্ষা গ্রহণেরও অনুমতি দেয় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। এমনকি আরো কিছুদিন পর থেকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সরাসরি ব্যাবহারিক পরীক্ষা গ্রহণেরও অনুমতি দেওয়া হয়। কিন্তু এখন তাদের আর কোনো ধরনের পরীক্ষা নেওয়ার সুযোগ থাকল না।

গত বছররের জুন মাস থেকে অনলাইনে ক্লাস শুরু করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। চলতি বছরের শুরু থেকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজে পরীক্ষা গ্রহণ শুরু হয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরীক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে সেশনজট কমিয়ে আনার একটা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল। তবে হল খোলার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ফের পরীক্ষা বন্ধের ঘোষণা আসায় বড় সংকটে পড়তে হবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে।

মন্তব্য