kalerkantho

বুধবার । ৯ আষাঢ় ১৪২৮। ২৩ জুন ২০২১। ১১ জিলকদ ১৪৪২

শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় ভাষাশহীদদের স্মরণ

করোনার ভয় জয় করে শহীদ মিনারে জনস্রোত

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



করোনার ভয় জয় করে শহীদ মিনারে জনস্রোত

ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গতকাল কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নেমেছিল জনস্রোত। স্বজনদের হাত ধরে এসেছিল এই শিশুটিও। ছবি : লুৎফর রহমান

হাতে হাতে নানা রঙের ফুল। কণ্ঠে বিষাদমাখা গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি...।’ করোনার ভয় জয় করে মানুষের স্রোত ধীরে ধীরে এগিয়ে চলে শহীদ মিনারের দিকে। ফুল দেওয়াসহ নানা আয়োজনে গতকাল রবিবার একুশের প্রথম প্রহর থেকে গভীর শোক, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় জাতি স্মরণ করল ভাষাশহীদদের।

রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাঙালির রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল রাজপথ; ওই রক্তের দামে এসেছিল বাংলার স্বীকৃতি আর তার সিঁড়ি বেয়ে অর্জিত হয় স্বাধীনতা। অমর একুশে ফেব্রুয়ারি কেবল ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আত্মত্যাগের দিন নয়, বাঙালির জাতিসত্তা, স্বকীয়তা আর সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষার আন্দোলনের রক্তে লেখা স্মারক। বাঙালির ইতিহাসের অবিস্মরণীয় এই দিনটি এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হয় সারা বিশ্বে।

করোনার কারণে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের আয়োজনটি এবার সীমিত রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। কিন্তু ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে রাজধানী ঢাকা ছাড়াও আশপাশের এলাকা থেকে আসা মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায়। বুয়েটের পলাশী এলাকা থেকে শহীদ মিনার চত্বর পর্যন্ত ঢল নামে মানুষের। শ্রদ্ধাবনত মানুষের ভালোবাসার ফুলে ফুলে ভরে ওঠে বাঙালির শোক ও অহংকারের শহীদ মিনার। শুধু রাজধানী ঢাকায়ই নয়, সারা দেশসহ বিশ্বজুড়ে শ্রদ্ধা-ভালোবাসা জানানো হয়েছে ভাষাশহীদদের স্মৃতির প্রতি।

প্রতিবছর একুশের প্রথম প্রহরে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় বাঙালির শ্রদ্ধা জানানোর পর্ব। এবার করোনা মহামারির কারণে তাঁরা সশরীরে শহীদ মিনারে যাননি। তাঁদের পক্ষে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন তাঁদের সামরিক সচিবরা। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের পক্ষে তাঁর সামরিক সচিব মেজর জেনারেল এস এম সালাহ উদ্দিন ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে তাঁর সামরিক সচিব মেজর জেনারেল নকিব আহমদ চৌধুরী কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। এরপর আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার পক্ষে সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ও দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পরে স্পিকারের পক্ষে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। শ্রদ্ধা নিবেদন করেন তিন বাহিনীর প্রধানরা; পুলিশপ্রধান ও র‌্যাবের মহাপরিচালকও শ্রদ্ধা জানাতে আসেন। পরাষ্ট্র, স্বরাষ্ট্র ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও শ্রদ্ধা জানান শহীদ মিনারে এসে। সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টির পক্ষে চেয়ারম্যান জি এম কাদের এবং জ্যেষ্ঠ নেতারা ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের শ্রদ্ধা নিবেদনের পর শহীদ মিনার সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।

একে একে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা, ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ, সিপিবি, জেএসডি, ন্যাপ-ভাসানী, জেপি, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, যুবলীগ, কৃষক লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, গণসংহতি আন্দোলনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, বাংলা একাডেমি, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, শিল্পকলা একাডেমিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় প্রেস ক্লাবসহ সাংবাদিকদের বিভিন্ন সংগঠন, একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতিসহ বিভিন্ন পেশাজীবী, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়।

শ্রদ্ধা নিবেদন করতে গিয়ে ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর অনেক বড় ভূমিকার কথা উল্লেখ করে তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেন, ‘ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর অনেক বড় ভূমিকা আছে। ভাষা আন্দোলন থেকেই স্বাধীনতার সংগ্রাম শুরু। ভাষা আন্দোলনের এত বছর পর যারা স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে আস্ফাালন করছে, তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে।’

সকাল পৌনে ৮টার দিকে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করতে গিয়ে ভাষা আন্দোলন বিএনপির বর্তমান সংগ্রামকে শাণিত করছে বলে মন্তব্য করেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে মাফিয়াচক্রের মাধ্যমে দেশ পরিচালিত হচ্ছে। আমাদের নামে মিথ্যা মামলা দেওয়াসহ হামলা করা হচ্ছে। গণতন্ত্র আজ ভূলুণ্ঠিত। সরকার একদলীয় শাসনব্যবস্থা কায়েম করেছে। তার পরও বিএনপি আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। বিএনপি গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করছে।’

শ্রদ্ধা নিবেদনে আসা মানুষদের অনেকের মুখেই মাস্ক থাকলেও শারীরিক দূরত্ব মানা হয়নি। তবে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ছিলেন বেশ তৎপর। বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির যুব ও স্বেচ্ছাসেবক বিভাগের উদ্যোগে শহীদ মিনারে আসা মানুষের মধ্যে বিনা মূল্যে মাস্ক বিতরণ ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে জীবাণুমুক্তকরণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। এ ছাড়া জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় স্বেচ্ছায় রক্তদান কার্যক্রম পরিচালনা করে রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি। বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসেও (বিইউপি) যথাযথ মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করা হয়।

গতকাল নগরবাসীর পোশাকেও ছিল একুশের চেতনার ছাপ। পোশাকে সাদা ও কালো রঙের ব্যবহার ছিল বেশি। এতে খচিত ছিল বর্ণমালা, কবিতার চরণ কিংবা ভাষার গানের কলি। অনেকের কপাল ও গালে আঁকা ছিল শহীদ মিনার, জাতীয় পতাকা ও বর্ণমালা। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার শহীদ মিনারেও ছিল শ্রদ্ধা জানানোর আয়োজন। বিভিন্ন স্থানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয়।

একুশে ফেব্রুয়ারিতে সরকারি ছুটির দিনে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত ছিল। জাতীয় অনুষ্ঠানের সঙ্গে সংগতি রেখে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনগুলোও বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে।

কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে কথা হয় মাদারীপুর জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মাওলার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের পর থেকেই আমি নিয়মিত শুধু আজকের দিনটার জন্য ঢাকায় আসি। কারণ একটাই, পৃথিবীর কোনো দেশে ভাষার জন্য মানুষের প্রাণ দেওয়ার নজির নেই। আমার বিশ্বাস, যত ভাষায় এ দেশের কিছু মানুষ কথা বলুক, বাংলা ভাষার কদর কখনো শেষ হবে না। নিজ মহিমায় বাংলা ভাষা শতাব্দী থেকে শতাব্দী এগিয়ে যাবে। এ ভাষার মাধ্যমে আমরা পৃথিবীতে শ্রেষ্ঠ জাতি হিসেবে পরিচিত হব।’ 

সকাল ১০টার দিকে শনির আখড়া থেকে রাশেদুল ইাসলাম নামের একজন তাঁর ছয় বছরের ছেলেকে নিয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আসেন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। তিনি বলেন, ‘বই-পুস্তকের অনেক কিছু শেখার চেয়ে বাস্তবে দেখলে দেশ ও জাতির ঐতিহ্যের বিষয়গুলো বেশি শিখবে ও বুঝবে। তাই ছেলেকে ভাষার ইতিহাস জানাতে নিয়ে এসেছি।’

 



সাতদিনের সেরা