kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১২ ফাল্গুন ১৪২৭। ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১। ১২ রজব ১৪৪২

এ সপ্তাহের সাক্ষাৎকার

উগ্রবাদ থাকলে মুক্তচিন্তার মানুষ নিরাপদ থাকে না

শাহরিয়ার কবির লেখক ও সাংবাদিক

১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে




উগ্রবাদ থাকলে মুক্তচিন্তার মানুষ নিরাপদ থাকে না

একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির। তিনি ১৯৭২ সাল থেকে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে সোচ্চার আছেন। জঙ্গিবাদ, মৌলবাদ নির্মূলে সক্রিয় থেকে হামলার শিকার হয়েছেন, জেল খেটেছেন এই লেখক ও সাংবাদিক। তিনি কালের কণ্ঠ’র সঙ্গে কথা বলেছেন মুক্তমনা ব্লগার হত্যার রায়, জঙ্গিবাদ, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, রাষ্ট্রের ভূমিকাসহ নানা বিষয়ে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কালের কণ্ঠ’র প্রতিবেদক তৈমুর ফারুক তুষার

 

কালের কণ্ঠ : মুক্তমনা ব্লগার-লেখকদের হত্যার রায় হচ্ছে। আদালত অভিযুক্তদের সর্বোচ্চ শাস্তি দিচ্ছেন। বিভিন্ন মহল থেকে সন্তোষ জানানো হচ্ছে বিচারিক এই প্রক্রিয়ায়। কোনো অপরাধ বন্ধে বিচার করা একটি দিক। কিন্তু ব্লগার-লেখকদের জন্য একটি সন্তোষজনক নিরাপদ পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রে আর যে বিষয়গুলো যুক্ত, সেখানে রাষ্ট্র কতটুকু উন্নতি করেছে মনে করেন?

শাহরিয়ার কবির : জঙ্গি আর জঙ্গিবাদ, এই দুটির মধ্যে পার্থক্য আছে। মাঠ পর্যায়ের জঙ্গিরা হত্যা করছে। তাদের দমনে সরকার উল্লেখযোগ্য সাফল্য প্রদর্শন করেছে। কাউকে বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, কাউকে ক্রসফায়ার দেওয়া হয়েছে, অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে মাঠ পর্যায়ে জঙ্গি দমনে সরকার সফল হয়েছে। ২০১৬ সালে হলি আর্টিজানের ঘটনার পর সে ধরনের তেমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু আমি বলতে চাই, এসব হত্যাকাণ্ড কোনো সাধারণ হত্যা নয়। যারা হত্যা করেছে, তাদের সঙ্গে নিহতদের কোনো রকম ব্যক্তিগত শত্রুতা নেই। এটা করেছে একটা রাজনৈতিক ও আদর্শিক প্ররোচনা থেকে। এই রাজনৈতিক আদর্শটা হচ্ছে—উপমহাদেশে আমরা একে মওদুদীবাদ বলি আর পুরো বিশ্বে এটা সালাফি বা ওয়াহাবি ইসলাম। এরা ইসলামের কট্টরপন্থী ব্যাখ্যা দিয়ে ভিন্নমতের মানুষদের হত্যা করতে বলে। এটাই তাদের ইসলামী রাজনীতি। এই রাজনীতি বাংলাদেশে থাকবে আর এখানে মুক্তচিন্তার মানুষ নিরাপদ থাকবে, ভিন্ন ধর্মের মানুষ নিরাপদ থাকবে, এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। এই কারণে বঙ্গবন্ধু বাহাত্তরের সংবিধানে ধর্মের নামে রাজনীতি নিষিদ্ধ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, একাত্তরে ধর্মের নামে আমরা লাখো মানুষ হত্যা করতে দেখেছি। ধর্ম অত্যন্ত পবিত্র একটি বিষয়। এটিকে রাজনীতি থেকে আলাদা রাখতে হবে।

বাংলাদেশে এখন ওয়াহাবি কট্টরপন্থী রাজনৈতিক দর্শনের রাজনীতি আছে। তারা মুক্তিযুদ্ধের সময়ে ইসলামের দুশমনদের হত্যার নামে মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যাকে জায়েজ করার চেষ্টা করেছে, ধর্ষণকে জায়েজ করেছে, যাবতীয় মানবতাবিরোধী অপরাধকে জায়েজ করেছে ইসলামের নামে। আপনি এখনো দেখবেন, ওয়াজের নামে, ইসলামী জলসার নামে উগ্র মৌলবাদী যারা অভিজিৎকে হত্যার ফতোয়া দিয়েছিল, হুমায়ুন আজাদকে হত্যার ফতোয়া দিয়েছিল, আমাদের অনেককে হত্যার হুমকি দিয়েছে, আমাকে আহত করেছে, সেই মানুষগুলো তো এখনো বহাল তবিয়তে আছে।

অভিজিৎ হত্যার পর হেফাজতে ইসলাম বলেছিল, এই হত্যাকাণ্ডটি যথাযথ ছিল, প্রয়োজন ছিল। সেই হেফাজতের সঙ্গে এখন যখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বৈঠক করেন, তখন আমরা দেশের মানুষ কী বার্তা পাই? মুক্তচিন্তকরা কী বার্তা পাচ্ছেন? এই দেশ আমাদের জন্য নিরাপদ নয়। অনেকেই দেশ ছেড়ে চলে গেছেন। বাকিরা ভয়ের একটা সংস্কৃতির মধ্যে আছেন। মুক্তচিন্তার কথা ছেড়ে দিয়েছেন। এখন আর কেউ ওইভাবে লেখেন না। অভিজিৎ কী লিখেছিল? অভিজিতের বিশ্বাসের ভাইরাস বইয়ের ভূমিকাটা পড়ে দেখুন। সে লিখেছে, আমি তো কোনো দিন বিশেষ কোনো ধর্মের বিরুদ্ধে বলিনি। বিশেষ কোনো নবীর বিরুদ্ধে বলিনি। আমি সাধারণভাবে বিজ্ঞানের কথা বলেছি, যুক্তিবাদের কথা বলেছি। কিন্তু ওদের কাছে বিজ্ঞান, যুক্তিবাদিতা মানেই তো আল্লাহর দ্রোহ। সেটাই সমস্যা।

ব্লগার ওয়াসিকুর বাবুকে যে হত্যা করল, তাকে গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে সে জানিয়েছিল, বাবুর লেখা সে পড়েনি বা তাকে চেনেও না। ওপরের সিদ্ধান্তে তাকে হত্যা করেছে। বাস্তবতা হলো, ওয়াজে, খুতবায় উগ্রবাদী বক্তব্য রাখা হচ্ছে। সেগুলো ফেসবুক, ইউটিউবে ভাইরাল হচ্ছে। সেগুলো দেখে তরুণরা ভাবছে, নাস্তিকদের হত্যা করলেই তো তারা বেহেশতে চলে যাবে। এই উন্মাদনা তৈরির পরিবেশ দিন দিন বাড়ছে।

 

কালের কণ্ঠ : অভিজিৎ হত্যার রায়ে আদালত তাঁর পর্যবেক্ষণে বলেছেন, স্বাধীন মত প্রকাশের কারণেই তাঁকে হত্যা করা হয়।  বাংলাদেশে কি এখন নির্ভয়ে স্বাধীন মত প্রকাশের মতো পরিবেশ আছে মনে করেন?

শাহরিয়ার কবির : এ দেশে স্বাধীন মত প্রকাশের সুযোগটা কোথায়? এখনো তো বাংলা একাডেমির বইমেলায় অভিজিতের লেখা বই নিষিদ্ধ। তাহলে স্বাধীন মত প্রকাশের সুযোগটা কোথায়? জঙ্গিরা অভিজিতের বই পড়তে নিষেধ করেছে, সরকার ওটা বন্ধ করে দিয়েছে।

 

কালের কণ্ঠ : গত চার-পাঁচ বছরে মুক্তমনা ব্লগারদের হত্যার ঘটনা দেখা যায়নি। এতে কি জঙ্গিদের তৎপরতা কমেছে মনে করছেন? নাকি জঙ্গিরা খেপে যাবে বলে ব্লগাররা এখন তেমন লেখা থেকে বিরত থাকছেন?

শাহরিয়ার কবির : আমি শুরুতেই বলেছি, জঙ্গি দমন করা হয়েছে কিন্তু জঙ্গিবাদের বিস্তার ঘটছে। গত কয়েক বছরে ব্লগার হত্যা হয়নি বলে আহ্লাদিত হওয়ার কিছু নেই। ওয়াজে, মাহফিলে কদাকার, অশ্লীল বক্তব্য দেওয়া আগের চেয়ে বেড়েছে। আর অনেকে ভয়ে বিদেশে চলে গেছেন। সেখানে বসে লিখছেন। দেশে অনেকে চুপ করে গেছেন। আবার যাঁরা লিখছেন না তাঁদেরও অনেক সময় নানাভাবে ফাঁসানো হচ্ছে।

 

কালের কণ্ঠ : অনেকে বলেন, জঙ্গিদের এখন আর হামলার দরকার পড়ে না। কথায় কথায় ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে গ্রেপ্তার ও জেলখানায় পাঠানো হয়। এ প্রসঙ্গে আপনি কী বলবেন?

শাহরিয়ার কবির : সেটাই। আমিও বলেছি, প্রত্যেক সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করতে হবে। অথচ ৫৭ ধারায় আজ পর্যন্ত একজন ওয়াজকারীকে কি গ্রেপ্তার করা হয়েছে? সব তো মুক্তচিন্তকদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ৫৭ ধারাটা কেন করা হয়েছে? কোনোভাবে যেন ভিন্নমতাবলম্বীদের, ভিন্ন ধর্মে বিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে হিংসা-বিদ্বেষ ছড়ানো না হয়। এখানে সব ধর্মের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে কী হচ্ছে? বিটিআরসি নামের একটা সাদা হাতি পোষা হচ্ছে। বিটিআরসিকে আপনি কখনো দেখেছেন একজন সাইবার জিহাদির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে? বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ, শেখ হাসিনা, সংবিধান নিয়ে যে বিষোদগার করা হচ্ছে তা নিয়ে মাথাব্যথা নেই কোটি কোটি টাকা খরচ করা সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলোর।

 

কালের কণ্ঠ : যারা এমন ঘৃণা ছড়াচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র কেন ব্যবস্থা নিচ্ছে না?

শাহরিয়ার কবির : এদের সঙ্গে তো সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নেতারা বৈঠক করেন। এদের বিষয়ে হাত দেওয়ার ক্ষমতা আমাদের নাই।

 

কালের কণ্ঠ : স্বাধীনতাপূর্ব বাংলাদেশ থেকে শুরু করে আশির দশক পর্যন্তও এ দেশে অনেক লেখক, বুদ্ধিজীবী নাস্তিকতার চর্চা করেছেন, লেখালেখি করেছেন। কিন্তু তাঁদের ওপর তেমন হামলা, মামলার নজির নেই। এরপর বাংলাদেশে অনেক আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন হয়েছে। এখন এমন পরিবেশ কেন সৃষ্টি হলো?

শাহরিয়ার কবির : ওয়াহাবি দর্শন আমাদের সমাজে ভাইরাসের মতো বিস্তার করা হচ্ছে। ১৯৭৫-এর পর থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আমরা পাকিস্তানীকরণ দেখেছি। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতাকে তুলে দেওয়া হয়েছে, ধর্মীয় রাজনীতির ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে দেওয়া হয়েছে। সেই সময় থেকে আমরা মধ্যপ্রাচ্যে মানবশক্তি রপ্তানি শুরু করেছি। এই যে জনশক্তি রপ্তানি করছি, তারা শুধু পেট্রো ডলারই নিয়ে আসে না, সঙ্গে করে ওয়াহাবি সংস্কৃতিও নিয়ে আসে। ভাষা বদল হয়ে যাচ্ছে। খোদা হাফেজ হয়ে যাচ্ছে আল্লাহ হাফেজ। এগুলো পাকিস্তান আমলেও ছিল না। পাকিস্তান আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়টা হিজাব ছিল? এখন দেখেন কতগুলো আছে? শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা বিশ্বেই দক্ষিণপন্থার একটা উত্থান ঘটছে। বাংলাদেশে একভাবে হচ্ছে, মিয়ানমারে একভাবে হচ্ছে, ভারতে একভাবে হচ্ছে, ইউরোপে-আমেরিকায় আরেকভাবে হচ্ছে। আসলে এখন ষাটের দশকের মতো বিশ্বে শক্তির ভারসাম্য নেই। তখন একদিকে ধনতন্ত্র, আরেকদিকে সমাজতন্ত্র ছিল। এখন তা নেই। ধনতন্ত্রের প্রভাবে এসবের উত্থান হচ্ছে। জঙ্গিবাদের সবচেয়ে বড় মদদদাতা তো আমেরিকা। আল-কায়েদা, আইএস তো আমেরিকাই বানিয়েছে। বাংলাদেশ তো এর বাইরে না। আমরা এখন গ্লোবাল ভিলেজে বাস করি। ফলে আমাদের দেশেও উগ্রবাদের প্রকোপ বাড়ছে।

 

কালের কণ্ঠ : হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে সরকারের সখ্যের অভিযোগ উঠছে বিভিন্ন মহলে। তারা বলছে, এই সখ্য মুক্তচিন্তার পরিবেশকে আরো সংকুচিত করবে। আপনি কী মনে করেন?

শাহরিয়ার কবির : মুক্তচিন্তার পরিবেশ সংকুচিত করবে, এটা তো অনেক সহজ ও সাধারণ বিষয়। এই সখ্য বাংলাদেশের জন্য, আওয়ামী লীগের জন্য একটি আত্মঘাতী উদ্যোগ বলে মনে করি। জামায়াত ও হেফাজতকে আলাদা করে দেখার কিছু নাই। তারাই একসময়ে শেখ হাসিনাকে নাস্তিকদের জননী আখ্যা দিয়েছিল। এখন টাকা পেয়ে তাদের কাছে নাস্তিকদের জননী হয়ে গেছেন কওমি জননী। কথা হলো, টাকা-পয়সা দিয়ে আপনি কতক্ষণ তাদের পক্ষে রাখবেন? দুধ-কলা দিয়ে কি কেউটে সাপকে পোষ মানানো যায়? সময়মতো ঠিকই ছোবল দেবে।

 

কালের কণ্ঠ : এতক্ষণ দেশে যে পরিস্থিতির কথা বললেন, তা থেকে উত্তরণে আপনার পরামর্শ জানতে চাই।

শাহরিয়ার কবির : এ থেকে উত্তরণের পথ বঙ্গবন্ধু দিয়ে গেছেন। তিনি ১৯৭২ সালে যে সংবিধান দিয়ে গেছেন, সেটা বাস্তবায়ন করতে হবে। আমাদের নতুন করে কোনো কিছু করতে হবে না। আমাদের শিক্ষানীতি, নারীনীতি, সংস্কৃতিনীতি, প্রশাসনের ক্ষেত্রে, পররাষ্ট্র থেকে শুরু করে সর্বক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির দর্শন বাস্তবায়ন করুন। তাহলেই জঙ্গিবাদ নির্মূল হবে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা