kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১২ ফাল্গুন ১৪২৭। ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১। ১২ রজব ১৪৪২

বাবার প্রতিক্রিয়া

জঙ্গিবাদ নির্মূলে সব মামলারই নিষ্পত্তি জরুরি

আবুল কাসেম ফজলুল হক

১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



জঙ্গিবাদ নির্মূলে সব মামলারই নিষ্পত্তি জরুরি

যারা দীপনকে হত্যা করেছে, তারা একটি গুপ্তঘাতক চক্র। শুধু দীপনকেই না, এই চক্র আরো অনেককে হত্যা করেছে। আমরা শুধু জানতে পেরেছি যে একটি জঙ্গি সংগঠন, যার নাম আনসার আল ইসলাম। এই সংগঠনের কোনো পরিচয় আমরা জানি না। কারা এই সংগঠনে আছে, তা-ও জানি না। কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের গোয়েন্দা শাখা ঘটনা উদঘাটন করেছে। তারাই বের করেছে কারা এর পেছনে আছে। এটি বের করা অত্যন্ত কঠিন কাজ ছিল। কারণ এরা সংগঠনের নাম বদলায়, নিজেদের নামও বদলায়, যাতে তারা ধরা না পড়ে। এ কারণে কৌশল অবলম্বন করে। এই সমস্ত কৌশল উদঘাটন করে ডিবি (পুলিশের গোয়েন্দা শাখা) থেকে চার্জশিট দেওয়া হয়েছিল। সেটি কোর্টে যায়। কোর্টে অনেক দিন ধরে শুনানি হয়েছে। এখানে সরকারপক্ষের উকিল ছিলেন। আসামিদেরও প্রত্যেকের একজন করে উকিল ছিলেন। শুনানি শেষে আসামিপক্ষের উকিলরা আসামিদের নির্দোষ দাবি করলেন। আর সরকারপক্ষের উকিল বললেন, এই আসামিরা প্রত্যেকে দীপন হত্যার জন্য দায়ী। এরা সুযোগ পেলে আরো হত্যা করবে। এদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করলেন তাঁরা। 

বিচারক দুই পক্ষের বক্তব্য শুনে, নিজেরা আরো প্রশ্ন করে শেষ পর্যন্ত রায় দিলেন। এতে আট আসামির ফাঁসির সাজা হয়েছে। ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানাও করা হয়েছে।

দীপনের হত্যার ঘটনাটি বাংলাদেশে তো বটেই, বাইরের দুনিয়ায়ও বিরাট আলোড়ন সৃষ্টি করে। বই প্রকাশের জন্য একজন প্রকাশককে হত্যা করা হয়েছে, এই রকম দৃষ্টান্ত দুনিয়ায় আর নেই। জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল বিবৃতি দিয়েছেন, দাবি করেছেন অবশ্যই এই হত্যাকাণ্ডের বিচার হতে হবে, আইনের শাসন রাখতে হলে। একইভাবে কোনো কোনো রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী, কোনো রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিচার দাবি করেছেন। বাংলাদেশ সরকারও তখন উদ্যোগী হয় এই গুপ্ত সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে। বিচারহীনতার যে অভিযোগ তখন প্রখরভাবে ছিল। দীপন হত্যার পর দেখা গেল কিছু মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি হচ্ছে, দ্রুত বিচার হচ্ছে।

বিচারের সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেই এই রায় ঘোষণা করা হয়েছে। সন্দেহাতীতভাবেই প্রমাণিত হয়েছে আসামিরা এই হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী। এই রায়ে আমরা সন্তুষ্টি প্রকাশ করছি।

তবে গুপ্তহত্যা বন্ধ করার জন্য দায়িত্বটা এখানেই শেষ হয়ে যায় না। জঙ্গিবাদী তৎপরতা নির্মূল করার জন্য আমেরিকা-ব্রিটেন যুদ্ধ চালিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে; আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া প্রভৃতি দেশে। ন্যাটো বাহিনীও যুদ্ধ চালিয়েছে। এতেও জঙ্গিবাদ নির্মূল হয়নি। আমাদের উপমহাদেশে বাংলাদেশ সরকার, ভারত সরকার চুক্তিবদ্ধ আছে আমেরিকার সঙ্গে জঙ্গিবাদ নির্মূলের কাজে সহযোগিতা করবে।

আমার ধারণা, জঙ্গিবাদীদের মোকাবেলা করার জন্য এই যুদ্ধের আয়োজন কিংবা শাস্তি দিয়ে জঙ্গিবাদ বন্ধ হবে না। জঙ্গিবাদ বন্ধ করতে হলে অবশ্যই মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে আমেরিকা-ব্রিটেন-ন্যাটো বাহিনীর সেনাদের ফেরত নিতে হবে। এটি বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য অপরিহার্য। বাংলাদেশে আমরা যে জঙ্গিবাদের অপসারণ চাইছি, সেই জঙ্গিবাদ বিলুপ্ত হতে পারে কেবল রাজনীতি ও সংস্কৃতির একটি উন্নততর বাস্তবতার মধ্য দিয়ে। রাজনীতির মান উন্নত হওয়া উচিত। রাজনৈতিক দলগুলোর নিজেদের ভেতর থেকেই উন্নত হতে হবে। দেশে এবং সব দেশেই সত্যিকার গণতন্ত্র, জনগণের গণতন্ত্র, সর্বজনীন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তাহলে অপরাধ কমবে, জঙ্গিবাদও বিলুপ্ত হবে। শুধু জঙ্গিবাদীদের শাস্তি দিয়ে এই অপরাধপ্রবণতা শেষ করা যাবে না।

জঙ্গিবাদীরা ইসলামের যে ব্যাখ্যা দিচ্ছে, তা প্রকৃত ইসলাম নয়। ইসলাম শান্তির শিক্ষা দিয়েছে। নানা মতের, নানা ধারার, নানা ধরনের লোকদের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে থাকার কথা বলেছে। সেই জায়গায় জিহাদের যে ধারণা সেটি অবলম্বন করে এরা এই গুপ্তহত্যার দিকে যাচ্ছে। আমি যতটা জানি, এই গুপ্তহত্যার প্রক্রিয়া ইসলাম সমর্থন করে না। এটি ইসলামের একরকম বিকৃত ব্যাখ্যা।

দীপন হত্যা শুধুই একটি হত্যাকাণ্ড ছিল না; চিন্তার স্বাধীনতার ওপর একটি বড় আঘাত। চিন্তার স্বাধীনতাকে বড় ধরনের ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, করছে। এ কারণে একটি মামলা শেষ করলেই হবে না। এ রকম সব কটি মামলাই যতটা সম্ভব দ্রুত নিষ্পত্তি করা দরকার। আইনের শাসনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা