kalerkantho

শনিবার । ১৪ ফাল্গুন ১৪২৭। ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১। ১৪ রজব ১৪৪২

‘আল্লাহ রিজিকে রাখলে খাই’

জিয়াদুল ইসলাম   

২৭ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



‘আল্লাহ রিজিকে রাখলে খাই’

যাঁদের প্রবল শ্রমে অর্জিত রেমিট্যান্সে দেশের অর্থনীতি সচল, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে, তাঁদের একজন কবির আহমেদ। টানা ১৮ বছর ইতালিতে কঠোর পরিশ্রম করে পরিবারের ভরণ-পোষণের পাশাপাশি ভবিষ্যতের কথা ভেবে ৪০ লাখ টাকা সঞ্চয় করেছিলেন। স্বপ্ন দেখেছিলেন আরো কিছু টাকা সঞ্চয় করে রাজধানীতে মাথা গোঁজার একটু ঠাঁই গড়বেন। কিন্তু ২০১৭ সালে এক নিকটাত্মীয়ের পরামর্শে সঞ্চয় করা টাকা সরল বিশ্বাসে নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসে (পিএলএফএস) আমানত হিসেবে জমা রাখেন।

কিন্তু নানা ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ায় ধুঁকতে থাকা পিপলস লিজিংকে ২০১৯ সালের জুলাইয়ে অবসায়নের সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। সে অনুযায়ী ওই বছরের ১৪ জুলাই আদালতে মামলা দায়ের করা হয়। ওই দিনই মামলার শুনানি

শেষে প্রতিষ্ঠানটি অবসায়নে পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দেন আদালত। বাংলাদেশে কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়নের সিদ্ধান্ত এটাই প্রথম। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, পিপলস লিজিংয়ে আমানতকারীদের পাওনা রয়েছে দুই হাজার ৩৬ কোটি ২২ লাখ টাকা। এর মধ্যে ব্যক্তিপর্যায়ের আমানতকারীদের পাওনা ৭৫০ কোটি টাকা।

আদালতের নির্দেশে অবসায়ন প্রক্রিয়ায় থাকা পিপলস লিজিংয়ের অন্য আমানতকারীর মতো কবির আহমেদ তাঁর ৪০ লাখ টাকা ফেরত পাচ্ছেন না। করোনার আগে তিনি ছুটিতে দেশে আসেন। করোনার কারণে এখন বিদেশেও আর যেতে পারছেন না।

কালের কণ্ঠকে কবির আহমেদ বলেন, ‘সঞ্চয় যা ছিল সবই ওখানে রেখেছিলাম। ভেবেছিলাম দেশে ফিরে ওই টাকা দিয়ে ছোটখাটো বাড়ি কিংবা একটা ফ্ল্যাট কিনব। ছেলে-মেয়েদের ভালো স্কুলে পড়াব। সেই স্বপ্ন ধুলোয় মিশে গেছে। আমি শুধু ক্ষতিগ্রস্ত নই, থালা নিয়ে এখন রাস্তায় নামার দশা। দেশে ফিরে আটকা পড়ায় আমার চাকরিও শেষ। নিজের কাছে যেটুকু টাকা ছিল তাও শেষ। কোন পর্যায়ে যে আছি একমাত্র আল্লাহ জানেন। আল্লাহ রিজিকে রাখলে খাই, না রাখলে খাই না।’

পিপলস লিজিংয়ে ১৩ লাখ টাকা গচ্ছিত রেখেছিলেন যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা শওকতুর রহমান। ভালোভাবে বেঁচে থাকার আশায় সেখানে টাকাটা রেখেছিলেন। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘গচ্ছিত টাকা না পেয়ে এখন দুর্বিষহ জীবন পার করছি। নিজের পায়ের চিকিত্সা করাতে পারছি না, মায়ের চিকিত্সা করাতে পারছি না। এখন যদি না খেয়ে থাকি কিংবা চিকিত্সাই করাতে না পারি, তাহলে মুক্তিযোদ্ধার খেতাব, মরোণোত্তর সংবর্ধনা দিয়ে কী হবে?’

কবির আহমেদ এবং শওকতুর রহমানের মতো পিপলস লিজিংয়ে ব্যক্তি আমানতকারীদের অনেকে বর্তমানে নিদারুণ কষ্টে জীবন পার করছেন। কেউ চিকিত্সা করাতে পারছেন না, কেউ সন্তানদের ভালো স্কুলে ভর্তি করাতে পারছেন না। কারণ পিপলস লিজিংয়ে যাঁরা টাকা রেখেছিলেন, তাঁদের বেশির ভাগ মুনাফার ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। করোনাকালীন সংকটের সময়েও তাঁদের খোঁজ কেউ নেয়নি। টাকা ফেরত পেতে প্রধানমন্ত্রী বরাবর এ পর্যন্ত চার দফা চিঠি পাঠিয়েছেন আমানতকারীরা। আর চারটি জাতীয় পত্রিকায় ছয়বার বিজ্ঞপ্তি দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গেও কয়েক দফা সাক্ষাত্ করে দ্রুত অর্থ ফেরতের দাবি জানিয়েছেন। গত দেড় বছর ধরে আমানতকারীরা দ্বারে দ্বারে ঘুরেও পাননি তাঁদের টাকা ফেরতের কোনো আশ্বাস। সম্প্রতি মতিঝিল সিটি সেন্টারের সামনে মানববন্ধনও করেছেন তাঁরা। মানববন্ধন থেকে রাজপথে নামার আলটিমেটামও দেওয়া হয়েছে।

পিপলস লিজিংয়ের ব্যক্তি আমানতকারীর সংখ্যা প্রায় আড়াই হাজার। এর মধ্যে ৮০ শতাংশ আমানতকারী তাঁদের জীবনের সব সঞ্চয়, স্থাবর সম্পদ বিক্রি করে পিপলসে টাকা গচ্ছিত রেখেছিলেন। এই টাকা থেকে অনেক অবসরপ্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের সংসারের ব্যয় নির্বাহ হতো, ছেলে- মেয়েদের লেখাপড়া চলত, চিকিত্সা ব্যয় হতো। এখন সব কিছু হারিয়ে তাঁরা অসহায় অবস্থায় মানবেতন জীবন যাপন করছেন। 

চাকরি জীবনের সব সঞ্চয় পিপলস লিজিংয়ে রেখেছিলেন পঞ্চাশোর্ধ্ব ওয়াহিদ। সম্প্রতি স্ত্রীসহ তিনি করোনায় আক্রান্ত হয়ে ১০ দিন হাসপাতালে চিকিত্সাধীন ছিলেন। এ সময় কেউ  তাঁদের খোঁজ কিংবা সামান্য অর্থ সহায়তা করেনি। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, নিজের ভাই-বোন, ভায়রা, নিকটাত্মীয়ের কাছ থেকে টাকা ধার করে চিকিত্সা করিয়েছি। এখনো হাসপাতালের পুরো বিল পরিশোধ করতে পারিনি। ভাড়া বাসায় থাকি। চলতে খুব কষ্ট হচ্ছে। এত বড় একটা কম্পানিতে টাকা রাখলাম, অথচ সেই টাকাটা এখন ফেরত পাচ্ছি না। বাংলাদেশ ব্যাংক বা সরকার কেউ বলল না এদের টাকাটা ফেরত দেওয়া উচিত।’ 

আরেক আমানতকারী সামিয়া বিনতে মাহবুব বিয়ের গয়না থেকে শুরু করে জীবনের সব সঞ্চয় পিপলসে বিনিয়োগ করেন। স্বামীর সব সঞ্চয়ও সেখানে বিনিয়োগ করেন। তাঁদের বিনিয়োগ প্রায় এক কোটি টাকা। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘আমার স্বামী গেমিং অ্যানিমেশন ফার্মে ১৫-১৬ বছর চাকরি করেছেন। আমি নিজেও মাল্টিন্যাশনাল কম্পানিতে চাকরি করেছি। আমাদের দুজনের সব সঞ্চয় পিপলসে রেখেছিলাম ছয় মাসের জন্য। মেয়াদপূর্তিতে যখন টাকা তুলতে গেছি আর তুলতে পারিনি।’

সামিয়া বিনতে মাহবুব আরো বলেন, ‘করোনার কারণে স্বামীর চাকরি চলে গেছে। অসুস্থ হওয়ায় আমি নিজেও দুই বছর আগে চাকরি ছেড়েছি। এ অবস্থায় টাকা ফেরত না পেয়ে ভীষণ দুর্বিপাকের জীবন পার করছি। বাচ্চাকে স্কুলে ভর্তি করাতে পারিনি। ধারদেনা করে কোনো মতে বেঁচে আছি।’ 

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আদালতের আদেশে প্রতিষ্ঠানটি অবসায়নের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এখন সব কিছুই হবে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী। ব্যক্তি আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে হলেও আদালতের নির্দেশনা লাগবে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা