kalerkantho

শুক্রবার । ১৩ ফাল্গুন ১৪২৭। ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১। ১৩ রজব ১৪৪২

কোন দিকে তাকিয়ে ‘তৃতীয় শক্তি’

এনাম আবেদীন   

২৫ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



কোন দিকে তাকিয়ে ‘তৃতীয় শক্তি’

আওয়ামী লীগ ও বিএনপি; দেশে বিদ্যমান দ্বিদলীয় এই রাজনীতির বাইরে গিয়ে বিকল্প ‘তৃতীয় শক্তি’র কথা ভাবা হচ্ছে। সাম্প্রতিককালে তৎপর ও আলোচনায় থাকা ওই ‘শক্তির’ ঐক্যবদ্ধ হওয়ার রূপরেখা বা ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কর্মসূচি এখনো আলোচনার টেবিলেই। তবে প্রাথমিকভাবে তারা বৃহত্তর প্ল্যাটফর্ম বা তৃতীয় ধারার একটি বলয় গড়ার কথা ভাবছে। রাজনৈতিক সচেতন যেকোনো ব্যক্তি বা সংগঠনকে তারা গ্রহণ করবে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পিতা এবং জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে এই মতের মহামিলন ঘটানোর কথাও তারা বলছে।

তবে বিষয়টি নির্ভর করছে তাদের ওই তৎপরতা কী গতি পায় বা কোন দিকে মোড় নেয় তার ওপর।  আগামী নির্বাচনের আগে বা সুযোগ তৈরি হলে তারা বড় কর্মসূচিও সামনে আনতে চায়।

এ ছাড়া ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্মূল্যায়ন (রিভিউ), স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ নামে জাতিকে বিভক্ত না করা, ‘বয়সে তরুণ এমন অন্তত এক শ রাজনীতিককে নির্বাচিত করে সংসদে আনা এবং সামরিক ও বেসমারিক সাবেক আমলা ও পেশাজীবীদের মধ্য থেকে সংসদের এক-তৃতীয়াংশ সদস্য নির্বাচিত করার কর্মসূচি রয়েছে সংশ্লিষ্টদের পরিকল্পনায়। যদিও বিষয়টি প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে বলে তাদের সূত্রে জানা গেছে।

তৎপরতার ব্যাপারে প্রধান উদ্যোগী নেতা কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে বিভিন্ন সময় সভা-সেমিনার ও টক শোতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পাশাপাশি স্বাধীনতাযুদ্ধে জিয়াউর রহমানকেও স্বীকৃতি দেওয়া উচিত বলে তিনি মত প্রকাশ করেছেন। তাঁর নেতৃত্বাধীন দলটির ঘোষণাপত্রে উল্লেখ রয়েছে, মুক্তিযুদ্ধকে জাতির বিভক্তকারী হিসেবে বিবেচনা করা হবে না।

অবসরপ্রাপ্ত আরেক সামরিক কর্মকর্তা মেজর আখতারুজ্জামান গত ৬ জানুয়ারি একটি জাতীয় দৈনিকে এক নিবন্ধে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বাংলাদেশের স্থপতি হিসেবে এবং শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখার জন্য সম্মাননা দেওয়ার জন্য বিএনপির প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। নিবন্ধে বিএনপির এই নেতা লেখেন, ‘স্বাধীনতাযুদ্ধের পটভূমিকায় ২৭ মার্চ, ১৯৭১ সালে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের উপ-অধিনায়ক মেজর জিয়াউর রহমান ঘোষণা দিয়ে মৃত্যুকে বাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন।’

অবশ্য কালের কণ্ঠ’র সঙ্গে আলাপকালে বিএনপির সাবেক এমপি মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান দাবি করেন, ‘তৃতীয় শক্তির পক্ষে তিনি নেই।’ তবে তিনি মনে করেন, ‘তৃতীয় শক্তি সুযোগ পেলে জনপ্রিয় কিছু কর্মসূচি ঘোষণা করবে। যদিও রাজনীতিতে দুই দলের বাইরে কিছু করা কঠিন।’

প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে হলে স্বাধীনতা অর্জনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং জিয়াউর রহমানের অবদানকে অস্বীকার করা যাবে না। বঙ্গবন্ধু জিয়ার প্রতিপক্ষ নন। কারণ জিয়ার শুরুই হয়েছে বঙ্গবন্ধুর পরে। একজন ইমামতি করেছেন, আরেকজন আজান দিয়েছেন।’

গত ১৭ জানুয়ারি শনিবার রাজধানীর একটি হোটেলে দোয়া মাহফিলের ব্যানারে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের পাশাপাশি সামরিক ও বেসামরিক সাবেক আমলা ও সুধীসমাজের বেশ কিছু প্রতিনিধিকে জড়ো করে আলোচিত হন মেজর জেনারেল (অব.) ইবরাহিম। ওই অনুষ্ঠানের পর তৃতীয় শক্তির আলোচনা ও গুঞ্জন নতুন মাত্রা পায়। অনুষ্ঠানস্থলে টানানো ব্যানারে ওই দিন লেখা হয়, ‘গঠনমূলক পরিবর্তনে সময় লাগে পরিশ্রম লাগে ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা লাগে।’

ওই দিনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত বেশির ভাগ বক্তা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের মাঠে নামার আহ্বান জানান। তাঁরা ‘পরিবর্তনের’ কথা বলেন। বর্তমান সরকার জাতিকে বিভক্ত করার কৌশল নিয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তাঁরা।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী মনে করেন, ‘সেদিনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ব্যক্তিরা দুই দলের বাইরে গিয়ে রাজনীতিতে নতুন কিছু করতে চান। কিন্তু বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে?’ তিনি বলেন, ‘বিএনপির সাহায্য তাঁরা চাইলেও বিএনপি নীরব। অথচ পরিস্থিতি তৈরি হলে ফল কিন্তু তারাই ভোগ করবে।’

এক প্রশ্নের জবাবে সুধীসমাজের এই প্রতিনিধি বলেন, ‘জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে তাঁরা হয়তো নতুন ও দুই দলের মধ্যে ভারসাম্য সৃষ্টির মতো কিছু কর্মসূচি নিয়ে ভাবছেন। তবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে জাতির পিতা এবং জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে স্বীকৃতি দিলে এই সমস্যার সমাধান হয়ে যায়।’

ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তাবিষয়ক প্রধান সমন্বয়কারী মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘দল-মত নির্বিশেষে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে আমরা দেশের সংবিধান, স্বাধীনতা  ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে চাই। কারণ স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তিতে দেশের সার্বভৌমত্ব আজ হুমকির মুখে পড়েছে বলে আমরা মনে করি।’

তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতাযুদ্ধে যার যেখানে অবদান আমরা সবাইকে স্বীকৃতি দিতে চাই। আর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অবদান স্বীকার করে নেওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।’

এই দুই জেনারেল ছাড়াও মেজর জেনারেল (অব.) এহতেশামুল হক, বিমানবাহিনীর সাবেক প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল ফখরুল আজম, রিয়ার অ্যাডমিরাল (অব.) মুস্তাফিজুর রহমান এবং অবসরপ্রাপ্ত দুইজন ব্রিগেডিয়ারসহ অর্ধশতাধিক সাবেক সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

তাঁদের বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জনগণকে কাছে টানা যাবে—গণমুখী এমন বিষয়গুলোকে সামনে রেখে তাঁরা সমমনাদের কাছে মতামত ও পরামর্শ চেয়েছেন এবং তারই ভিত্তিতে আপাতত খসড়া কিছু কর্মসূচি প্রণয়ন করা হয়েছে। কিন্তু এটি চূড়ান্ত হয়নি। তবে ওই কর্মসূচি দেখিয়ে পরিবর্তন বা তৃতীয় শক্তির পক্ষে বিভিন্ন দলের নেতা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের রাজি করানোর চেষ্টা চলছে বলে নির্ভরযোগ্য কয়েকটি সূত্র কালের কণ্ঠকে নিশ্চিত করেছে।

জানা গেছে, খসড়া কর্মসূচিতে উপজেলা প্রশাসন থেকে এমপিদের হস্তক্ষেপ পুরোপুরি বন্ধ করে উপজেলা কাউন্সিলের মাধ্যমে পরিচালনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে ভারসাম্য আনার ব্যাপারও উল্লেখ আছে এতে। বর্তমানে আমলাদের কাজে রাজনীতিকরা, আবার রাজনীতিকদের কাজে আমলারা হস্তক্ষেপ করছেন বলে মনে করেন পরিবর্তনে আগ্রহীরা। তাঁদের মতে, এখনকার ব্যবস্থায় রাজনীতিকদের কেউ কেউ ভোগ-বিলাস ও অর্থমুখী হয়েছেন। অন্যদিকে, এ ব্যবস্থা আমলাদের ক্ষমতামুখী করেছে। এ অবস্থা দূর করতে না পারলে দেশে সব প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে যাবে।

গত ১৭ জানুয়ারির ওই বৈঠকের পর এ উদ্যোগের সঙ্গে যাঁরা আছেন তাঁরা ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে আবারও বৈঠকে বসবেন বলে জানা গেছে। বাংলাদেশে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও কূটনৈতিক মিশনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ওই বৈঠকে তাঁরা তাঁদের অবস্থান তুলে ধরবেন।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা