kalerkantho

শনিবার । ১৪ ফাল্গুন ১৪২৭। ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১। ১৪ রজব ১৪৪২

মানুষকে টিকামুখী করাই বড় চ্যালেঞ্জ

তৌফিক মারুফ   

২৩ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



মানুষকে টিকামুখী করাই বড় চ্যালেঞ্জ

অন্যান্য দেশে করোনাভাইরাসের টিকা প্রয়োগ সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে শুরু করার আগে মহড়া বা ড্রাই রান করা হলেও বাংলাদেশ এগোচ্ছে ভিন্ন পথে। এখানে ড্রাই রানের পরিবর্তে করা হবে ‘পাইলট রান’। অর্থাৎ সরাসরি চার থেকে ৫০০ জন স্বাস্থ্যকর্মীর শরীরে সত্যি সত্যি টিকা প্রয়োগ করে তা এক সপ্তাহ পর্যবেক্ষণ করা হবে। এই কর্মসূচিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর পাইলট রান বলে অভিহিত করছে। এর সম্ভাব্য সময়সূচি হিসেবে চলতি মাসের শেষ সপ্তাহকে নির্ধারণ করে রাখা হলেও এখনো তা চূড়ান্ত হয়নি। বরং গত বৃহস্পতিবার দেশে আসা ভারতের উপহারের ২০ লাখ চার হাজার টিকার সঙ্গে আগামী সপ্তাহে সরকারের কেনা আরো ৫০ লাখ টিকা আসার পর এই পাইলট রান শুরু করা হবে বলে এখন পর্যন্ত সিদ্ধান্ত রয়েছে। তবে আজকালের মধ্যে নতুন কোনো সিদ্ধান্ত আসতে পারে। এ ক্ষেত্রে কেনা টিকার অপেক্ষায় না থেকে যেকোনো দিন হাতে থাকা টিকা দিয়েই পাইলট রান শুরু করে দেওয়া হতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর শিডিউল পাওয়া গেলে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান সম্পন্ন করা হতে পারে। টিকা পাওয়ার পর এখন মানুষকে টিকামুখী করাই সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক ও টিকাসংক্রান্ত মিডিয়া সেলের প্রধান অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘টিকা আসার আগে মানুষের মধ্যে যেমন আগ্রহ দেখেছি, অনেকেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে খোঁজখবর নিয়েছিলেন কবে টিকা আসবে, কবে তাঁরা টিকা পাবেন, সে জন্য। কিন্তু এখন দেখছি, টিকা আসার পরে তাঁদের মধ্যে আগ্রহ কমে গেছে। এটা হতে পারে বিভিন্ন ধরনের অপপ্রচার কিংবা

দেশের বাইরে বিভিন্ন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার খবর থেকে মানুষের মধ্যে একধরনের নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হচ্ছে, যা আমাদের জন্য মানুষকে টিকামুখী করা একধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের বড় ভূমিকা থাকলে সরকারের ও মানুষের উপকার হবে। বিশেষ করে অপপ্রচার কিংবা নেতিবাচক বিষয়গুলো শতভাগ নিশ্চিত না হয়ে প্রচার না করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন সভা-সেমিনারেও বিভিন্ন কারণে কিছু সমালোচনা হচ্ছে, সেগুলোর দিকেও সতর্ক নজর রাখা দরকার।’

তিনি বলেন, ‘টিকার কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতেই পারে, এটা সবার জানা। কিন্তু নেতিবাচক ও ভীতিকর তথ্য প্রচার করলে ঢালাওভাবে একধরনের নেতিবাচক মনোভাব মানুষের মধ্যে তৈরি হতে পারে। আমরা চেষ্টা করছি দু-এক দিনের মধ্যেই মানুষকে টিকামুখী করার জন্য ইতিবাচক প্রচার-প্রচারণা শুরু করার। তবে সঙ্গে সঙ্গে এ কথাও বলতে হবে, টিকা নেওয়ার পাশাপাশি মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে।’

ওই অতিরিক্ত মহাপরিচালক বলেন, ‘মানুষের মধ্যে টিকার প্রতি অনীহা তৈরির অন্যতম কারণ হতে পারে দেশের সংক্রমণ দ্রুত কমে যাওয়া। মৃত্যুহারও অন্য দেশের তুলনায় অনেক কম। হাসপাতালে যেতে হচ্ছে না কম আক্রান্ত মানুষদের। সব দিক মিলিয়ে মানুষ হয়তো ভাবতে পারে, টিকা ছাড়াই করোনা থেকে দেশ মুক্ত হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তার পরও সবার ভাবতে হবে টিকা নেওয়া ভালো।’

এদিকে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ইপিআই গোডাউনে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে রাখা হয়েছে ভারত থেকে আসা ২০ লাখ চার হাজার টিকা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিজস্ব নিরাপত্তাকর্মীর পাশাপাশি সেখানে পুলিশ মোতায়েন করা রয়েছে। এ ছাড়া সাদা পোশাকে গোয়েন্দা সংস্থার লোকজনও নজর রাখছে। পরবর্তী নির্দেশ বা সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত এখান থেকে কোনো টিকা অন্য কোথাও পাঠানো হবে না।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (টিকাদান) ডা. শামসুল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অন্য দেশের দেখাদেখি আমরা ড্রাই রান শব্দটি এত দিন বললেও বাস্তবে এটি অন্য দেশের মতো ড্রাই রান হচ্ছে না। আমরা আমাদের মূল কর্মসূচির প্রাথমিক ধাপ হিসেবে পাইলটিং করছি। তাই আমরা এখন থেকে এটিকে পাইলট রান হিসেবে বলতে চাই। এ ক্ষেত্রে চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে অর্থাৎ ২৫ তারিখের পর যেকোনো দিন আমাদের পাইলট রান শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে আজকালের মধ্যেও নতুন কোনো সিদ্ধান্ত আসতে পারে। এমন কিছু ভাবনার কথা আমি শুনেছি, যাতে আমরা পরের চুক্তির ৫০ লাখ টিকার অপেক্ষায় না থেকে হাতে যে টিকা আছে, তা দিয়েই পাইলট রান শুরু করে দেব, যদিও আমরা আশা করছি ২৫-২৬ জানুয়ারি নাগাদ ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে বাংলাদেশের বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের মাধ্যমে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ৫০ লাখ টিকা আমরা হাতে পেয়ে যাব।’

তিনি আরো বলেন, ‘আজ (শুক্রবার) পর্যন্ত সিদ্ধান্ত যা আছে সে অনুসারে ওই ৫০ লাখ টিকা হাতে পাওয়ার পর একসঙ্গে ৭০ লাখ টিকা নিয়েই আমরা প্রয়োগ কার্যক্রম শুরু করব। তার প্রথম ধাপে ঢাকার চারটি হাসপাতালে চার থেকে ৫০০ স্বাস্থ্যকর্মীর মধ্যে পর্যবেক্ষণধর্মী পাইলট রান পরিচালনা হবে। পরবর্তী এক সপ্তাহ তাঁদের পর্যবেক্ষণের ফলাফল পর্যালোচনা করা হবে। সেই ফলাফল দেখে তবেই আমরা সারা দেশে টিকা প্রয়োগ কার্যক্রম শুরু করব। পাইলট রানের সময় যদি প্রত্যাশিত বা পর্যাপ্ত ইতিবাচক ফলাফল না দেখা যায়, তবে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে; যদিও আমাদের বিশ্বাস ও এখন পর্যন্ত আমাদের হাতে থাকা তথ্য-উপাত্ত অনুযায়ী অক্সফোর্ডের টিকা আমাদের জন্য আশানুরূপ ইতিবাচক ফলাফল দেবে। এ ক্ষেত্রে উদ্বেগের কোনো কারণ নেই।’

ডা. শামসুল আলম বলেন, ‘আমরা এখন মানুষকে টিকা দেওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করার দিকে বেশি মনোযোগী। কারণ টিকা আসার আগে মানুষের মধ্যে যত আগ্রহ দেখা গেছে, এখন বাস্তবতা কিছুটা ভিন্ন বলে আমাদের চোখে পড়ছে। নানা মাধ্যমে কিছু বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। সরকার এসব বিভ্রান্তি ও গুজবের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেবে। মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য দু-এক দিনের মধ্যেই ব্যাপকভাবে প্রচার-প্রচারণা শুরু হবে।’

এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিকল্পনা বিভাগ সূত্র জানায়, এরই মধ্যে কুর্মিটোলা হাসপাতালে টিকাদান কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে রাখা হয়েছে। ওই হাসপাতালে যাদের টিকা দেওয়া হবে, তাদেরও প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সমাজের যে কয়েকজন প্রতিনিধি সেদিন টিকা নেবেন, তাঁদের তালিকা তৈরি হচ্ছে। এখন প্রধানমন্ত্রীর শিডিউল পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন সবাই। অন্যদিকে পাইলট রানের জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল ও কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক শামসুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কেনা টিকা আসার পরই একসঙ্গে তা ডিস্ট্রিবিউশন করা হবে। তবে যদি দু-এক দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হয়, সে অনুযায়ী হয়তো কিছু টিকা পাইলট রানের জন্য আগেভাগে ইপিআই গোডাউন থেকে বের করে নির্দিষ্ট  হাসপাতালগুলোতে নেওয়া হতে পারে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা