kalerkantho

মঙ্গলবার । ৭ বৈশাখ ১৪২৮। ২০ এপ্রিল ২০২১। ৭ রমজান ১৪৪২

রূপপুর বদলে দিয়েছে গ্রীন সিটি

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২১ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



রূপপুর বদলে দিয়েছে গ্রীন সিটি

পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের রাশিয়ান কর্মকর্তাদের আবাসন প্রকল্প গ্রীন সিটি দৃশ্যমান হওয়ার ফলে বদলে গেছে পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার রূপপুর গ্রাম। অজপাড়ায় গড়ে তোলা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন সব ভবন। রূপপুর গ্রীন সিটিতে গেলে মনে হবে এটি রাজধানীর কোনো অভিজাত এলাকা। পরিবর্তন হয়েছে মানুষের জীবনযাত্রারও।

রূপপুরের কর্মযজ্ঞের প্রশংসা করে ঈশ্বরদী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নায়েব আলী বিশ্বাস বলেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের মহাকর্মযজ্ঞ অভিভূত হওয়ার মতো। বিদ্যুৎকেন্দ্রের সুবাদে রূপপুর আজ এক অনন্য সুন্দর গ্রীন সিটি। বিদ্যুৎকেন্দ্রের আবাসন প্রকল্পের কারণে রূপপুরের পরিবেশ বদলে গেছে। অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। রূপপুরের আলোয় আলোকিত হয়েছে ঈশ্বরদী।

জানা গেছে, ২০২৩ সালে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর লক্ষ্য নিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৭ সালের ৩০ নভেম্বর। ওই দিন ঢালাই কাজ উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে বিদ্যুৎকেন্দ্রের রাশিয়ান কর্মকর্তাদের বসবাসের আবাসন প্রকল্প গ্রীন সিটির কাজ শুরু হয়েছে ২০১৬ সালের জুলাই মাসে। ৩৬ দশমিক ১১ একর জমিতে গ্রীন সিটি নির্মাণকাজ পূর্ণোদ্যমে চলছে। বাস্তবায়নে রয়েছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন ও গণপূর্ত অধিদপ্তর। মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী আবাসনের জন্য মোট ২১টি বহুতলবিশিষ্ট ভবন নির্মাণের কাজ চলছে। এগুলোর মধ্যে ২০ তলাবিশিষ্ট ১২টি, ১৬ তলাবিশিষ্ট ৭টি এবং ১৫ তলাবিশিষ্ট ২টি ভবন রয়েছে। ১৫ তলার দুটি ভবনে ১৫০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট থাকছে। ১২৫০ বর্গফুটের ফ্ল্যাটের ১৬টি এবং ৮৫০ বর্গফুটের ফ্ল্যাটের ২০ তলাবিশিষ্ট ৩টি ভবন রয়েছে। ডরমিটরি কাম মাল্টিপারপাস কমার্শিয়াল ২০ তলা ১টি ভবন নির্মাণের টেন্ডার ইতোমধ্যেই হয়ে গেছে। ফায়ার স্টেশন নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে। ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট ও স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্লান্টও গ্রীন সিটিতে থাকছে। এ ছাড়াও গ্রীন সিটিতে ১টি দোতলা মসজিদ ভবন, ছয়তলাবিশিষ্ট স্কুল ভবন, দ্বিতল সাবস্টেশন, জেনারেটর, পাম্প হাউজ ভবন, খেলার মাঠ, গেস্টহাউজ এবং ফোয়ারা নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। প্রকল্পে কর্মরত দেশি ও বিদেশিরা এই গ্রীন সিটিতে বসবাস করবেন। এ পর্যন্ত ১০টি আবাসিক ভবনের কাজ সম্পূর্ণ শেষ হয়েছে। রূপপুরের আকাশে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে সম্পূর্ণ শেষ হওয়া ২০ তলাবিশিষ্ট ৬টি এবং ১৬ তলাবিশিষ্ট ৪টি দৃষ্টিনন্দন ভবন।

বিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত তিন হাজারের অধিক রাশিয়ানসহ বিদেশিরা বসবাসও শুরু করেছেন। আরো কয়েকটি ভবনের কাজ চলমান রয়েছে। আবাসিক কোয়ার্টারগুলোতে আধুনিক মানের সকল সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পাবনা গণপূর্ত বিভাগ, ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলী, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও অন্যান্য জনবল দিনরাত সার্বক্ষণিক কাজ করে সকলের আন্তরিক চেষ্টা, নিষ্ঠা, শ্রম ও একাগ্রতায় মাত্র ১৩ মাসে ৩টি ২০ তলা ভবন নির্মাণ সম্পন্ন করেছে। এতে সরকারের সকল দপ্তর, মন্ত্রণালয়, নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর তদারকি ছিল চোখে পড়ার মতো। ফলে সময়মতো গ্রীন সিটিতে আবাসন সুবিধা পেয়ে ২৪ ঘণ্টাই কাজ করতে পারছেন বিদ্যুৎকেন্দ্রের মূল প্রকল্পে নিয়োজিত রাশিয়ানরা।

দেশের প্রকৌশলী, কর্মকর্তা-কর্মচারী, ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানসহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমানের সার্বিক তত্ত্বাবধানে রূপপুরের মতো অজপাড়া গাঁয়ে মাত্র ১৩ মাসে সকল সুবিধাসহ বাংলাদেশিদের দ্বারা গড়ে তোলা হয়েছে বিশ্বমানের এই গ্রীন সিটি। ৩টি ২০ তলা ভবনের নির্মাণকাজ

সম্পন্ন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সংস্থার চাহিদা ছিল ভবনগুলোতে সব ধরনের আসবাবপত্র দিয়ে সজ্জিত করে রাশিয়ানদের বসবাসের উপযোগী করা। সেই চাহিদার ভিত্তিতে প্রতিটি ভবনের ১১০টি ফ্ল্যাটের জন্য আসবাবপত্র ও হোম অ্যাপ্লায়েন্স ক্রয়প্রক্রিয়া শুরু করে গণপূর্ত অধিদপ্তর। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীন সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিটের (সিপিটিইউ) মাধ্যমে ই-জিপিতে দরপত্র আহ্বান করা হয়। উল্লেখ্য, ই-জিপিতে দরপত্র দাখিল কার্যক্রম উন্মুক্ত থাকায় যেকোনো ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান তাতে অংশগ্রহণ করতে পারে। ই-জিপির টেন্ডার বহিঃসদস্য ও প্রত্যাশী সংস্থার প্রতিনিধির উপস্থিতিতে যাচাই-বাছাই করে অনুমোদনের সুপারিশ করা হয় বিধায় দুর্নীতির সুযোগ থাকে না।

কোনো কোনো গণমাধ্যমে প্রচারিত সংবাদে বিভিন্ন ফ্লোরে মালামাল উঠানোর জন্য যে ব্যয় দেখানো হয়েছে, তার সঙ্গে দরপত্রের কোনো সম্পর্ক নেই। মালামাল ক্রয় ও সরবরাহের জন্য আহ্বানকৃত দরপত্রে আলাদাভাবে কোনো টাকা ধরা হয়নি। মালামাল উঠানোর কোনো আইটেম শিডিউলেও নাই। গণমাধ্যম, এমনকি সরকারি তদন্ত কমিটিও গতানুগতিক ধারণার বশবর্তী হয়ে একতরফাভাবে প্রাক্কলিত মূল্য ও কমিটি কর্তৃক সুপারিশকৃত মূল্যের মধ্যে বিপুল পার্থক্য নিরূপণ করে। দরপত্র বিজ্ঞপ্তি, সরকারি ক্রয় আইন ও বিধি কোনোটিকেই তাঁরা বিবেচনায় আনেননি।

দুঃখজনক যে, ২০১৬ সালে শুরু হয়ে ২০১৯ সালের মে মাস পর্যন্ত ৩ বছরে ১১টি ২০ তলা ভবন ও ৮টি ১৬ তলা ভবন নির্মাণকাজ প্রায় সম্পন্ন হলেও স্বার্থান্বেষী মহলের নেতিবাচক এবং উদ্দেশ্যমূলক প্ররোচনার ফলে ‘রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের’ আওতায় বাস্তবায়নাধীন গ্রীন সিটি আবাসিক এলাকা নির্মাণকাজের অগ্রগতি শুধু মন্থরই নয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে একেবারেই বন্ধ হয়ে আছে। কারণ নির্মাণকাজে ৩১ কোটি টাকা দুর্নীতি ও অপচয়ের অভিযোগে উক্ত কাজের সাথে সংশ্লিষ্ট সকল প্রকৌশলী ও প্রকল্প বাস্তবায়নকারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিকদের কারাগারে পাঠানোর পর গত দেড় বছরে কাজের অগ্রগতি নেই বললেই চলে। কাজের ধীরগতির কারণে জ্যেষ্ঠ রাশিয়ান কর্মকর্তা আসলে আবাসন সংকট তৈরি হতে পারে। অতিরিক্ত বিল প্রদান দেখিয়ে দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে (২০১৪ শিডিউল রেটে কাজের চুক্তি করা হলেও ২০১৮ সালের রেটে) প্রায় ৩৬ কোটি টাকা কেটে রাখা হয়েছে। কাটা হয়েছে অতিরিক্ত আয়কর, ভ্যাট। আনুষ্ঠানিক হস্তাস্তর ছাড়াই নির্মিত ভবনগুলোতে বসবাস শুরু করেছেন রাশিয়ান বিশেষজ্ঞ ও প্রকৌশলীগণ।

পাকশী ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেন জানান, বিদ্যুৎকেন্দ্রের মূল প্রকল্পের কাজ শুরুর আগেই বালিশকাণ্ডের  অভিযোগ ওঠায় আবাসন ভবন নির্মাণকাজের সাথে সংশ্লিষ্টদের তাত্ক্ষণিক শাস্তি প্রদান করা হয়েছে। যারা রাতদিন ২৪ ঘণ্টা তিন শিফটে অক্লান্ত পরিশ্রম করে দ্রুততম সময়ে রূপপুরের গ্রীন সিটির নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করে যাচ্ছিল তারা আজ অপরাধী। সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য একটি মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অপপ্রচার চালাচ্ছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান রূপপুর প্রকল্পকে দ্বিতীয় প্রজন্মের মুক্তিযুদ্ধ আখ্যা দিয়ে বলেছেন, বাংলাদেশের জনগণের হাজার হাজার কোটি টাকা জরিমানার হাত থেকে রক্ষা করতে যারা অমানুষিক পরিশ্রম ও সর্বোচ্চ মেধা ব্যয় করেছে, তারাই ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে আজ সমাজে ঘৃণার পাত্র। অথচ বাংলাদেশ সরকারের সাথে রাশিয়ান সরকারের যে চুক্তিপত্র (জিসিসি) রয়েছে, তাতে নির্ধারিত সময়ে রাশিয়ান প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের আবাসনব্যবস্থা সম্পন্ন করতে না পারলে বাংলাদেশকে ক্ষতিপূরণ দিতে হতো প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা।

পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র আইনের ১৯ ধারায় বলা আছে, সরল বিশ্বাসে করা কাজকর্মের ত্রুটি-বিচ্যুতি ধরে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ ও পরিচালনার কাজে সংশ্লিষ্ট কাউকে অভিযুক্ত করে কোনো মামলা করা যাবে না। আইনের তোয়াক্কা না করে মামলা করার ধারা থেকে বেরিয়ে না এলে ভবিষ্যতে সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্প বাস্তবায়নে কেউ কাজ করতে চাইবে না।

তবে বিশ্লেষকরা বলেছেন, প্রায় দুই লাখ কোটি টাকার সবচেয়ে বড় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে নির্মাণশিল্পের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় শুরু হবে। যথাসময়ে বিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মাণকাজ শেষ হলে উন্নয়নের নতুন মাত্রা যুক্ত হবে দেশের ইতিহাসে। মূল্যায়ন হবে নির্মাণশিল্পের কারিগর, প্রকৌশলী, ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্টদের।

শত বাধা অতিক্রম করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একক সিদ্ধান্ত ও প্রচেষ্টায় স্বপ্নের পদ্মা সেতু আজ বাস্তবে রূপ নিয়েছে। একইভাবে প্রধানমন্ত্রীর বলিষ্ঠ নেতৃত্ব সমালোচকদের কড়া জবাব দিয়ে বাস্তবে রূপ নেবে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। একদিন পরমাণু বিশ্বে নাম উঠবে বাংলাদেশের। দেশের চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানি করা যাবে বিদ্যুৎ।

এ বিষয়ে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক ড. মো. শৌকত আকবর বলেন, ১২ মাসের মধ্যে তিনটি ২০ তলা ভবন নির্মাণ করে প্রকৌশলী, ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্টরা নজির স্থাপন করেছেন। এ কাজের জন্য অবশ্যই তাঁরা প্রশংসার দাবিদার।

 

মন্তব্য