kalerkantho

শুক্রবার । ১৩ ফাল্গুন ১৪২৭। ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১। ১৩ রজব ১৪৪২

সংসদ অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে রাষ্ট্রপতি

আমরা করোনা মোকাবেলায় সফল

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৯ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আমরা করোনা মোকাবেলায় সফল

সরকারের সময়োপযোগী ও সাহসী সিদ্ধান্তের ফলে বাংলাদেশ করোনা পরিস্থিতি সাফল্যের সঙ্গে মোকাবেলা করে যাচ্ছে বলে মনে করেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, সরকার শিগগিরই জনগণকে কভিড-১৯-এর টিকাও দিতে পারবে।

একাদশ জাতীয় সংসদের একাদশ অধিবেশনের প্রথম দিনে দেওয়া ভাষণে রাষ্ট্রপতি এসব কথা বলেন। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে গতকাল সোমবার শীতকালীন এই অধিবেশন শুরু হয়।

রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ বলেন, ‘কভিড-১৯ মহামারি মোকাবেলায় বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড এবং ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট অব লাইফ সায়েন্সেস প্রাইভেট লিমিটেডের সঙ্গে তিন কোটি ডোজ ভ্যাকসিন সরাসরি ক্রয়ের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় সিএমএসডির (কেন্দ্রীয় ঔষধাগার) মাধ্যমে জরুরি ভিত্তিতে ভ্যাক্সিন কেনা বাবদ ৬০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রদান করা হয়। আমি আশা করছি, সরকার খুব শিগগির জনগণকে কভিড-১৯-এর টিকা প্রদান করতে পারবে।’

বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ‘সোনার বাংলা’ গড়ে তুলতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত রেখে দেশ থেকে দুর্নীতি, মাদক, সন্ত্রাস ও জঙ্গিদের নির্মূলে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে আবদুল হামিদ বলেন, ‘শান্তি, গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির যে পথে আমরা হাঁটছি, সে পথেই আমাদের আরো এগিয়ে যেতে হবে। তাই আসুন, দল-মত-পথের পার্থক্য ভুলে গিয়ে ধর্ম-বর্ণ-গোত্র-নির্বিশেষে শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে আমরা লাখো শহীদের রক্তের ঋণ পরিশোধ করি।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে জনগণের সর্বাত্মক অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি কল্যাণমূলক, উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠন করা সম্ভব হবে, এমন আশা প্রকাশ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘আমরা স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর দ্বারপ্রান্তে। এ বছর মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে আমরা স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী পালন করব। তবে আমাদের লক্ষ্য ২০৪১ সালে বিশ্বসভায় একটি উন্নত-সমৃদ্ধ দেশের মর্যাদায় অভিষিক্ত হওয়া। তাই গণতন্ত্রায়ন, সুশাসন ও নিরবচ্ছিন্ন আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে সব রাজনৈতিক দল, শ্রেণি ও পেশা-নির্বিশেষে ঐকমত্য গড়ে তোলার সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ বলেন, জাতীয় সংসদ দেশের জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রবিন্দু। স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, পরমতসহিষ্ণুতা, মানবাধিকার ও আইনের শাসন সুসংহতকরণ এবং জাতির অগ্রযাত্রায় সরকারি দলের পাশাপাশি বিরোধী দলকেও গঠনমূলক ভূমিকা পালন করতে হবে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ‘মুজিববর্ষ’ পালনের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু অভিন্ন সত্তা। জীবিত বঙ্গবন্ধুর মতোই অন্তরালের বঙ্গবন্ধু শক্তিশালী। মুজিবর্ষে গৃহীত সব কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্ম সম্পর্কে জানতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

সরকারের সফলতার চিত্র তুলে ধরে আবদুল হামিদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর মূল অবকাঠামো দৃশ্যমান হয়েছে। এর নির্মাণকাজ ২০২২ সালের জুলাই নাগাদ সমাপ্ত হবে। কর্ণফুলী নদীর তলদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেলের নির্মাণকাজ ডিসেম্বর ২০২২ সাল নাগাদ সম্পন্ন হবে। ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ ২০২৩ সালের জুন নাগাদ সম্পন্ন হবে। আরো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের চিত্র তুলে ধরেন রাষ্ট্রপতি।

রাষ্ট্রপতি তাঁর ভাষণে বলেন, দেশে আইনের শাসন সমুন্নত রাখার ক্ষেত্রে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা, যুদ্ধপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারসহ চাঞ্চল্যকর অন্যান্য মামলার রায় দ্রুত প্রদান করে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। দুর্নীতি, মাদক, জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস, উগ্রবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ব্যাপক সাফল্য পেয়েছে।

রাষ্ট্রপতি বলেন, গোটা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও করোনার কারণে সব সেক্টরে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রধানমন্ত্রী ৩১ দফা নির্দেশনাসহ নানামুখী দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। সামাজিক সুরক্ষা ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে এক লাখ ২১ হাজার ৩৫৩ কোটি টাকার ২১টি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন। রপ্তানিমুখী শিল্পের শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা অব্যাহত রাখায় ৫০ লাখ শ্রমিক-কর্মচারীর চাকরি সুরক্ষা হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, বিনা মূল্যে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ, ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রি ও নগদ অর্থ বিতরণ ইত্যাদি কর্মসূচির কারণে দেশে একজনও করোনাকালে না খেয়ে থাকেনি। প্রধানমন্ত্রীর সময়োচিত সাহসী সিদ্ধান্তের ফলে বাংলাদেশ করোনা পরিস্থিতি সাফল্যের সঙ্গে মোকাবেলা করে যাচ্ছে।

এ সময় তিনি করোনা মোকাবেলায় সফল নারী নেত্রীদের করা ফোর্বস সাময়িকীর তালিকায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অন্তর্ভুক্ত হওয়াসহ ব্লুমবার্গের ‘কভিড-১৯ সহনশীল র্যাংকিং’-এ বাংলাদেশের ২০তম স্থান অর্জনের বিষয়টি তুলে ধরেন। এ জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রাজ্ঞ ও দূরদর্শী নেতৃত্বের প্রশংসা করেন তিনি।

রাষ্ট্রপতি বলেন, বিশ্বশান্তি, গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা, সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ নির্মূল, নারীর ক্ষমতায়ন ইত্যাদি ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকার স্বীকৃতিস্বরূপ প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। এ সবই বিশ্বে বাংলাদেশের মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে। এ জন্য প্রধানমন্ত্রীকে উষ্ণ অভিনন্দন ও আন্তরিক ধন্যবাদ জানান তিনি।

রাষ্ট্রপ্রধান বলেন, বাঙালি জাতির জীবনে শ্রেষ্ঠ গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সব বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং মৃত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ওয়ারিশদের পূর্ণাঙ্গ তথ্যসংবলিত একটি ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম প্রস্তুত করা হয়েছে। এর ফলে সরাসরি বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যাংক হিসাবে সম্মানী ভাতা প্রদান সহজতর হয়েছে। মুজিববর্ষের উপহার হিসেবে ১৪ হাজার গৃহ নির্মাণ করে বিনা মূল্যে অসচ্ছল বীর মুক্তিযোদ্ধাদের দেওয়ার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এ ছাড়া এসংক্রান্ত আরো কিছু প্রকল্পের কথা তুলে ধরেন রাষ্ট্রপতি।

আবদুল হামিদ বলেন, ‘মুজিববর্ষে বাংলাদেশের একজন মানুষও গৃহহীন থাকবে না’—প্রধানমন্ত্রীর এই নির্দেশনা বাস্তবায়নে সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ মানবিক বিবেচনায় বাস্তুচ্যুত ১১ লাখ রোহিঙ্গা নাগরিকের বাসস্থানের জন্য আশ্রয়ণ-৩ প্রকল্প নোয়াখালীর ভাসানচরে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

১৪৭ পৃষ্ঠার ভাষণের সংক্ষিপ্তসার সংসদে পাঠ করেন রাষ্ট্রপতি। তিনি তাঁর পুরো ভাষণ পঠিত বলে গণ্য করার জন্য আহ্বান জানালে স্পিকার তা গ্রহণ করেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা