kalerkantho

শুক্রবার । ১৩ ফাল্গুন ১৪২৭। ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১। ১৩ রজব ১৪৪২

পরশুরামও নিজেদের করে নিল আ. লীগ

সরকারি দলের প্রার্থী সবাই বিনা ভোটে জয়ী

কাজী হাফিজ   

১৯ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



পরশুরামও নিজেদের করে নিল আ. লীগ

কুমিল্লার লাকসামের মতোই ফেনীর পরশুরামের ভোটের মঞ্চটাও নিজেদের মতো করে সাজিয়ে নিয়েছেন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা। অভিযোগ রয়েছে, ভয়ভীতি দেখিয়ে সুকৌশলে ভোটের মাঠ থেকেই দূরে রাখা হয়েছে প্রতিদ্বন্দ্বী সব প্রার্থীকে। এর ফলে পরশুরাম পৌরসভার সব পদে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী বিনা ভোটে জনপ্রতিনিধি হতে যাচ্ছেন। আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ওই নির্বাচনে কোনো ভোটারকে আর কেন্দ্রেই যেতে হচ্ছে না। শুধু পরশুরাম নয়, আগামী ৩০ জানুয়ারি অনুষ্ঠেয় তৃতীয় ধাপের নির্বাচনে ফেনী পৌরসভায় সংরক্ষিত ও সাধারণ ওয়ার্ড কাউন্সিলরের ২৪ পদের মধ্যে ১৫টিতে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে। এর আগে ২০১৫ সালের নির্বাচনেও এই পৌরসভায় মেয়র এবং সংরক্ষিত ও সাধারণ ওয়ার্ডের ২৩টিতে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার ঘটনা ঘটেছিল। এ ছাড়া গত ১৬ জানুয়ারি দ্বিতীয় ধাপে অনুষ্ঠিত দাগনভূঞা পৌর নির্বাচনে সাধারণ ওয়ার্ডের চারজন এবং সংরক্ষিত তিনটি ওয়ার্ডের সবাই বিনা ভোটে জয়ী হয়েছিলেন।

পাঁচ বছর আগের নির্বাচনেও ফেনীর তিনটি পৌরসভায় ভোটের আগেই ৯০ শতাংশের বেশি প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হওয়ার নজির ছিল। স্থানীয় সরকারের অন্য নির্বাচনেও ফেনীতে একই রকম পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়, যা ‘ফেনী স্টাইল’ নামে পরিচিত।

এ ব্যাপারে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এম হাফিজউদ্দিন খান বলেন, দেশে নির্বাচনব্যবস্থা যে ভেঙে পড়েছে তার উদাহরণ এসব বিনা ভেটের পৌর নির্বাচন। এ ধরনের ঘটনা আরো অনেক স্থানে হচ্ছে।

অভিযোগ রয়েছে, ফেনীর পরশুরামে বিএনপিসহ অন্য কোনো দলের প্রার্থীকে মনোনয়নপত্র জমা দিতেই দেওয়া হয়নি। সরকারদলীয় প্রার্থীর সমর্থকদের হুমকি-ধমকিতে অন্য প্রার্থীরা নীরবে এলাকা ছাড়েন। পরশুরামে গত রবিবার মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীরাই শুধু মনোনয়ন জমা দেন। অন্য কোনো প্রার্থীকে কাছেই ঘেঁষতে দেওয়া হয়নি। আগামী ২৭ জানুয়ারি এসব একক প্রার্থীকে বিনা ভোটে নির্বাচিত হওয়ার ঘোষণা দিয়ে নিয়ম রক্ষা করার কথা রয়েছে।

এদিকে পরশুরাম উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবদুল হালিম সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেন, পরশুরাম পৌর নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে থেকেই স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সন্ত্রাসীরা বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের বাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে মারধর, প্রাণনাশের হুমকি দিতে শুরু করে। কয়েকজন নেতাকর্মীর ওপর হামলা ও মারধর করা হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এ অবস্থায় প্রাণ বাঁচাতে তাঁরা বাধ্য হয়েই নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। অন্যদিকে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে পরশুরাম উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন মজুমদার বলেন, বিএনপির অভিযোগ সত্য নয়। তাদের কোনো সাংগঠনিক ভিত্তি নেই। তাই প্রার্থী দেয়নি তারা।

এবার পরশুরাম পৌরসভার ঘটনা সম্পর্কে জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ও নির্বাচনের রিটার্নিং অফিসার মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন পাটোয়ারী বলেন, ‘বিএনপিসহ সম্ভাব্য অন্য প্রার্থীদের সঙ্গে আমি নিজে যোগাযোগ করেছি। মনোনয়নপত্র জমা দিতে কোনো বাধা থাকলে জানাতে বলেছি। কিন্তু কোনো সাড়া পাইনি।’

এদিকে ফেনী পৌরসভায় নারীদের জন্য সংরক্ষিত ছয়টি ওয়ার্ডের পাঁচটিতে এবং সাধারণ ১৮টি ওয়োর্ডের ১০টিতেই একক প্রার্থী। তাঁরাও বিনা ভোটে বিজয়ের হাসি হাসবেন।

পরশুরাম উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং অফিসার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামের বরাত দিয়ে আমাদের ফেনী প্রতিনিধি জানান, পরশুরামে মেয়র পদে একমাত্র প্রার্থী হিসেবে নিজাম উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। তিনটি সংরক্ষিত নারী ওয়ার্ডের মধ্যে মনোনয়নপত্র জমা দেন ১, ২, ৩ নম্বর ওয়ার্ডে আফরোজা আক্তার; ৪, ৫, ৬, নম্বর ওয়ার্ডে রাহেলা আক্তার এবং ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডে হালিমা আক্তার। ৯ ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদের মধ্যে ১ নম্বর ওয়ার্ডে আবদুল মান্নান, ২ নম্বর ওয়ার্ডে খুরশিদ আলম, ৩ নম্বর ওয়ার্ডে আবু তাহের, ৪ নম্বর ওয়ার্ডে আবদুল মান্নান, ৫ নম্বর ওয়ার্ডে এনামুল হক, ৬ নম্বর ওয়ার্ডে কামাল উদ্দিন, ৭ নম্বর ওয়ার্ডে নিজাম উদ্দিন চৌধুরী, ৮ নম্বর ওয়ার্ডে রাসুল আহাম্মেদ মজুমদার এবং ৯ নম্বর ওয়ার্ডে আবু শাহাদাত চৌধুরী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।

ফেনী পৌরসভায় যাঁরা বিনা ভোটে জয়ী : তৃতীয় ধাপে আগামী ৩০ জানুয়ারি অনুষ্ঠেয় পৌর নির্বাচনে ফেনী পৌরসভার ১৮টি ওয়ার্ডে যে ১০ কাউন্সিলর প্রার্থী বিনা ভোটে জয়ী হচ্ছেন, তাঁরা হলেন ১ নম্বর ওয়ার্ডে আশ্রাফুল আলম গীটার, ২ নম্বর ওয়ার্ডে লুৎফুর রহমান হাজারী খোকন, ৩ নম্বর ওয়ার্ডে কোহিনুর আলম, ৪ নম্বর ওয়ার্ডে শাহাব উদ্দিন, ৫ নম্বর ওয়ার্ডে জয়নাল আবদীন লিটন, ৬ নম্বর ওয়ার্ডে আবুল কালাম, ৯ নম্বর ওয়ার্ডে সাইফুল ইসলাম তানজিম, ১১ নম্বর ওয়ার্ডে গোলাম মেহেদী আলম চৌধুরী রুবেল, ১৩ নম্বর ওয়ার্ডে নাসিরুদ্দীন এবং ১৬ নম্বর ওয়ার্ডে আমির হোসেন বাহার। নারীদের জন্য সংরক্ষিত পাঁচটি ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদে বিনা ভোটে নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন হাছিনা আক্তার, সেলিনা চৌধুরী সেলি, ফেরদৌস আরা ঝর্ণা, জেসমিন আক্তার ও ফেরদাউস আরা বেগম। এঁরা সবাই সরকারি দলের প্রার্থী।

চতুর্থ ধাপে ৩২৯০ প্রার্থী : আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় চতুর্থ ধাপের ৫৮ পৌরসভার নির্বাচনে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসারদের কাছে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন মোট তিন হাজার ২৯০ জন প্রার্থী। এর মধ্যে মেয়র পদে ২৮৭ জন, সংরক্ষিত ওয়ার্ডে ৬৬৪ জন এবং সাধারণ ওয়ার্ডে দুই হাজার ৩৩৯ জন। মেয়র পদে সর্বাধিক ১২ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈল পৌরসভায়। দুজন করে প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন নাটোরের বড়াইগ্রাম ও চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায়।

কালের কণ্ঠ’র নিজস্ব প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, চতুর্থ ধাপের এই নির্বাচনেও মেয়র পদে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগকে দলের বিদ্রোহী প্রার্থীর সমস্যায় পড়তে হতে পারে। বিএনপিও বিদ্রোহমুক্ত থাকছে না। এ ছাড়া বিএনপি এই ধাপের নির্বাচনে সব পৌরসভায় প্রার্থী দিতে পারেনি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা