kalerkantho

বুধবার । ১৮ ফাল্গুন ১৪২৭। ৩ মার্চ ২০২১। ১৮ রজব ১৪৪২

করোনার দ্বিতীয় ঢেউ

বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি স্মরণকালের সর্বনিম্ন

আমদানি, রপ্তানি ও বিনিয়োগে ধীরগতি

জিয়াদুল ইসলাম   

১৭ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি স্মরণকালের সর্বনিম্ন

করোনা মহামারির দ্বিতীয় ঢেউয়ের প্রভাবে দেশের আমদানি-রপ্তানি ও বিনিয়োগের গতি আবারও ধীর হয়ে পড়েছে। উৎপাদন ও বিনিয়োগ সহায়ক সব পণ্য আমদানির এলসি খোলা ও নিষ্পত্তি কয়েক মাস ধরেই রয়েছে নেতিবাচক ধারায়। রপ্তানি আয়েও নেতিবাচক চিত্র। স্মরণকালের সর্বনিম্ন পর্যায়ে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি।

অর্থনীতিবিদসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, করোনার কারণে চাহিদা কমে গেছে। সে কারণে পণ্যের আমদানিও কম হচ্ছে। এর প্রভাবে শিল্প খাতে পণ্যের উৎপাদন কম হচ্ছে। নতুন বিনিয়োগ হচ্ছে না। ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশ পুনরায় লকডাউনে যাওয়ায় রপ্তানি আদেশও কমে যাচ্ছে। এই অবস্থা দীর্ঘায়িত হলে অর্থনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, করোনার প্রাদুর্ভাবের পর থেকে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে যাচ্ছে না। ফলে মূলধনী যন্ত্রপাতি, শিল্পের কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী আমদানি কমছে। এর মানে উৎপাদনের যে সক্ষমতা রয়েছে, তার পুরোপুরি ব্যবহার হচ্ছে না। এসব কারণে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদাও কমে গেছে। এটা অর্থনীতির জন্য মোটেও ভালো লক্ষণ নয়।

ব্যবসায়ী ও শিল্প মালিকদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন বলেন, ‘করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশ পুনরায় লকডাউনে যেতে বাধ্য হয়েছে। এতে আমাদের রপ্তানি বাজার আবার হুমকিতে পড়ছে। কারণ এই পরিস্থিতিতে বায়ার সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা প্রবল। আর তাহলে অর্ডার অনেক কমে যাবে। ফলে তৈরি পোশাক খাত মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাতে রপ্তানি আয়ে আরো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণে সরকারকে নতুন করে প্রণোদনা দেওয়ার বিষয়ে ভাবতে হবে। তা না হলে ব্যবসায়ীদের টিকে থাকা কঠিন হবে।’

করোনার প্রথম ধাপের প্রভাবে আমদানি-রপ্তানিসহ ব্যবসা-বাণিজ্যে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বিশেষ করে, লকডাউনের কারণে গত বছরের মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত ব্যবসা ও বিনিয়োগ কার্যক্রম স্থবির ছিল। তবে প্রণোদনাসহ বিভিন্ন পদক্ষেপের মাধ্যমে এটা কাঠিয়ে ওঠার প্রাণপণ চেষ্টা করছে সবাই। এরই মাঝে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ অর্থনীতিকে নতুন শঙ্কায় ফেলেছে। আমদানি, রপ্তানি ও বিনিয়োগে সেই শঙ্কার ছাপ স্পষ্ট হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) শিল্পের যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্যের এলসি খোলার হার কমেছে। তেমনি হ্রাস পেয়েছে আমদানিও। এর মধ্যে শিল্পের যন্ত্রপাতির এলসি ৫.৩৯ ও নিষ্পত্তি ৩৮.৯৬ শতাংশ কমে গেছে। শিল্পের কাঁচামালের এলসি খোলা প্রায় ২ শতাংশ ও নিষ্পত্তি ৪ শতাংশ কমেছে। মধ্যবর্তী শিল্পপণ্যের এলসি সাড়ে ৫ শতাংশ ও নিষ্পত্তি কমেছে সাড়ে ২২ শতাংশ। ইয়ার্ন কটন ও সিনথেটিক এলসি খোলা কমেছে সাড়ে ১০ শতাংশ, নিষ্পত্তি কমেছে সাড়ে ৪ শতাংশ। বস্ত্রশিল্পের কাপড় ও গার্মেন্ট অ্যাকসেসরিজ আমদানির এলসি খোলা কমেছে ১৬ শতাংশ; নিষ্পত্তি কমেছে সাড়ে ১৪ শতাংশ।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, কারখানা সম্প্রসারণ, সংস্কার ও নতুন কারখানা স্থাপনের জন্য মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি করা হয়। এ জাতীয় পণ্যের আমদানি কমে যাওয়ার অর্থ হচ্ছে কারখানার সম্প্রসারণ ও সংস্কার কম হচ্ছে। অন্যদিকে চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে সার্বিক রপ্তানি আয় কমেছে .৩৬ শতাংশ। এর মধ্যে ডিসেম্বর মাসেই কমেছে প্রায় ৬ শতাংশ।

করোনা মহামারির এই সময়ে নতুন বিনিয়োগও কম হচ্ছে। এতে বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি তলানিতে নেমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরের ১৪.৮ শতাংশ বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে বেসরকারি খাতে ঋণ বেড়েছে মাত্র ৮.৬১ শতাংশ। এটি গত আট বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। তবে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টানা তিন মাস বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি .৮৭ শতাংশ বেড়ে ৯.৪৮ শতাংশে উঠেছিল। তা অক্টোবর থেকে আবার নিম্নমুখী হয়ে পড়ে। গত অক্টোবরেই এক লাফে .৮৭ শতাংশ কমে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৮.৬১ শতাংশে নেমে আসে। নভেম্বরে তা আরো .৪০ শতাশ কমে হয়েছে ৮.২১ শতাংশ। এটি স্মরণকালের সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধি।

করোনার কারণে বিদেশি বিনিয়োগেও বড় ধাক্কা এসেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) মোট এফডিআই এসেছে ৯৫ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৩০ শতাংশ কম।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা