kalerkantho

রবিবার । ১০ মাঘ ১৪২৭। ২৪ জানুয়ারি ২০২১। ১০ জমাদিউস সানি ১৪৪২

ফ্রাংকেনস্টাইন সৃষ্টি করলে জনককেই ফল পেতে হয়

ড. আব্দুল মঈন খান

৯ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ফ্রাংকেনস্টাইন সৃষ্টি করলে জনককেই ফল পেতে হয়

আমেরিকার রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসির ক্যাপিটল হিলের ওপর ৬ জানুয়ারি চরম ডানপন্থীদের দিনে-দুপুরের তাণ্ডব কি দেশটির কয়েক শ বছরের গণতন্ত্রের গৌরবময় ইতিহাসে একটি ন্যক্কারজনক অধ্যায়? একটু গভীরে গিয়ে উত্তর দিতে গেলে আমি বলব, একই সঙ্গে হ্যাঁ এবং না। আপনারা নিশ্চয়ই জিজ্ঞেস করতে পারেন এটা কেমন উত্তর আর কিভাবেই বা তা যুক্তিগ্রাহ্য? আসুন আমরা বরং বিষয়টিরনির্মোহ বিশ্লেষণে যাওয়ার চেষ্টা করি।

ইন্টারনেটের কল্যাণে রাতভর (বাংলাদেশ সময়) এ অযাচিত ঘটনা প্রত্যক্ষ করে শঙ্কিত হয়েছি ঠিকই; কিন্তু সম্ভবত অবাক হওয়ার কিছু ছিল না, কেননা ফ্রাংকেনস্টাইন সৃষ্টি করলে এর ফল তার জনককেই পেতে হয়। এবং চার বছর ধরে ঠিক সেটাই সৃষ্ট করেছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজের জেদগুলো বজায় রাখার জন্য।

এখানে মূল যে প্রশ্নগুলো আমাদের বিবেককে নাড়া দিচ্ছে তা হলো প্রথমত যে ‘মুক্ত বিশ্বের’ বড়াই আমেরিকা করে থাকে তার কি মৃত্যু ঘটছে? দ্বিতীয়ত, পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী দেশের মানুষের অন্তরে কেন এত অশান্তি? কোথায় গেল তাদের সেই ‘এমেরিকান ড্রিম’? আর সব শেষে, সভ্যতা ও উন্নয়নের শীর্ষে পৌঁছে এখন কি তাদের অবক্ষয় শুরু হলো?

এ প্রসঙ্গে আমেরিকার বর্তমান ‘সোসিও-পলিটিক্যাল’ পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনায় আরো কয়েকটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এক. পৃথিবীর সবচেয়ে সুরক্ষিত দেশের শীর্ষ সুরক্ষিত স্থান কংগ্রেসে কেমন করে অবলীলায় হাজার হাজার লোক শুধু ঢুকেই পড়েনি, স্পিকারের কক্ষ তছনছসহ মূল হাউস চেম্বারে হামলা চালিয়ে সিনেটর ও কংগ্রেসম্যানদের জীবনের ওপর মারাত্মক ঝুঁকি সৃষ্টি করে, এমনকি ভাইস প্রেসিডেন্টকে পর্যন্ত নিরাপত্তার জন্য ভূগর্ভস্থ টানেলে সরিয়ে নিতে হয়! একপর্যায়ে অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে এলোপাতাড়ি গোলাগুলি থেকে আত্মরক্ষার জন্য কংগ্রেস সদস্যদের হাউসের মূল চেম্বারের অভ্যন্তরে বেঞ্চের নিচে গিয়ে আশ্রয় নিতে হয়েছিল।

এর চেয়ে লজ্জাজনক আর কী হতে পারে? একই সঙ্গে কংগ্রেস প্রাঙ্গণের ভেতর পাইপগানসহ মলোটভ ককটেল এবং ট্রাকভর্তি অস্ত্রের সন্ধান পায় নিরাপত্তা বাহিনী, যা ঘটনাটির প্রচ্ছন্ন উদ্দেশ্য নিয়ে সবাইকে ভাবিয়ে তুলেছে। প্রশ্ন জাগে, অভ্যন্তরীণ যোগসাজশ ছাড়া সেখানে এত বড় নিরাপত্তা ব্যর্থতা কিভাবে হলো? পরে শোনা যাচ্ছে আসলেই নাকি (ফেডারেল) ন্যাশনাল গার্ডদের কংগ্রেসের নিরাপত্তায় যাওয়া থেকে বিরত রাখা হয়েছিল।

দুই. বর্ণবাদের বিষয়টি। অত্যন্ত স্পর্শকাতর প্রশ্নটি হচ্ছে, ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটারস’ মানবাধিকার আন্দোলনের সময় যদি প্রতিবাদকারীদের ওপর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মুহূর্তে মারমুখী হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে, তাহলে শীর্ষ গুরুত্বপূর্ণ কংগ্রেসের ওপর ‘মেগা’হামলাকারীদের নিয়ন্ত্রণ ও বাধা দেওয়ার জন্য কোনো নিরাপত্তা বাহিনীকে তাত্ক্ষণিক দেখা যায়নি কেন এবং কিভাবে অবলীলায় এই ধরনের নিরাপত্তা ব্যর্থতা সম্ভব হলো?

তিন. এই মারাত্মক হামলাকে দেশের আইনানুগ সরকার তথা সাংবিধানিক আইনসভাকে অকার্যকর করার ক্ষেত্রে ক্যু, এমনকি দেশদ্রোহের অভিযোগে অভিযুক্ত করাও যুক্তিযুক্ত কি না, সে বিষয়টিও এখন আর আলোচনার বাইরে নেই। এ ক্ষেত্রে প্ররোচনাকারী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিও প্রকাশ্য আলোচনায় চলে এসেছে। শুধু তা-ই নয়, তাদের সংবিধানের ২৫তম সংশোধনীসহ প্রেসিডেন্টকে পুনর্বার অভিশংসন করার বিষয়টি নিয়েও এখন আর রাখঢাক নেই।

তবে পাশাপাশি এ কথাও সত্য যে চরম বিশৃঙ্খলা ও ভয়াবহ অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসের পরও কিন্তু আমেরিকানরাই আবার সুস্থ ও শান্তিপূর্ণ একটি পরিবেশ অতি দ্রুত ফিরিয়ে এনেছে ও কংগ্রেস তার দায়িত্ব অত্যন্ত সুচারুরূপে সম্পন্ন করেছে। তদুপরি তাত্ক্ষণিকভাবে তারা এই ব্যর্থতার দায়ভার নিশ্চিতকরণ শুরু করে দিয়েছে। এসব দায়িত্বসম্পন্ন কার্যকর পদক্ষেপের কারণ হলো একটিই। আর তা হচ্ছে, শত শত বছর ধরে তারা গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করেছে এবং সম্পূর্ণ স্থিতিশীল কিছু গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করেছে, যা সমাজে সংগঠিত অপ্রত্যাশিত ‘শক অ্যাবজর্ভ’ করার ক্ষমতা রাখে। আমরা দেখলাম সকাল হওয়ার আগেই কংগ্রেস সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে পূর্ণ প্রক্রিয়াকরণ সমাধা করে নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে তাঁর সঠিক জায়গায় বসিয়ে দিয়েছে, যে ঐতিহ্য আমরা এখনো সৃষ্টি করতে পারিনি। মনে রাখতে হবে, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সেই গণতন্ত্রের প্রতীতি আমরাও যেদিন অর্জন করতে পারব, সেদিনই আমরা একটি গর্বিত জাতি হিসেবে বিশ্বের বুকে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারব।

লেখক : বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য     

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা