kalerkantho

রবিবার । ১০ মাঘ ১৪২৭। ২৪ জানুয়ারি ২০২১। ১০ জমাদিউস সানি ১৪৪২

প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হলে উসকানি সফল হয় না

এম হুমায়ুন কবির

৯ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হলে উসকানি সফল হয় না

গণতন্ত্র সম্পর্কে আমাদের সাধারণত যে ধারণা তা হলো—এটি একটি যথার্থ ব্যবস্থা। আমাদের এ ধারণা সব সময় সঠিক না-ও হতে পারে। গণতন্ত্রও ‘ভালনারেবল’ বা কোনো কোনো জায়গায় ভঙ্গুর হতে পারে। বিশেষ করে, যখন একটি নীতিগত অবস্থান থেকে এ বিষয়টিকে খুব ক্ষতির মুখে ঠেলে দেওয়া হয় মিথ্যা বক্তব্য দিয়ে, মিথ্যাচার করে, বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে। তখন সেই বিপদটা আরো বেশি ত্বরান্বিত হয়। সেইবিপদটাই আজ আমরা যুক্তরাষ্ট্রে দেখছি।

বুধবার রাতে ওয়াশিংটন ডিসিতে কংগ্রেসে যা ঘটল তা নিঃসন্দেহে একটি অভাবনীয়, অপ্রত্যাশিত এবং নিন্দনীয় ঘটনা। যুক্তরাষ্ট্রেও এ নিয়ে বড় ধরনের নিন্দার ঝড় উঠছে। বাইরের দেশগুলোর জন্যও এটি একটি অস্বস্তিকর অবস্থা। তারাও এ ঘটনার নিন্দা করছে। কারণ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মূল বিষয়টাই হচ্ছে শান্তিপূর্ণভাবে পার্থক্য মিটিয়ে ফেলা। এটিই কিন্তু গণতন্ত্রের মৌলিক ভিত্তি। শান্তিপূর্ণভাবে আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে সমস্যার সমাধান করা।

সে জায়গা থেকে বের হয়ে আমরা যখন অশান্ত ও সংঘাতময় পরিস্থিতি দেখি, তখন সেটা আমাদের সবার জন্যই চিন্তার কারণ। তবে যা না বললেই নয় তা হলো—এখানে দুটি বিষয় আছে। একটি হলো, চোখের সামনে যা ঘটছে বা যা দেখতে পাচ্ছি সেটা গুরুত্বপূর্ণ। তার পাশাপাশি সারা বিশ্বে কতগুলো বিষয় একই সময়ে ঘটছে। বিষয়গুলোকে বস্তুনিষ্ঠভাবে বোঝার জন্য আমাদের সেগুলোর প্রতিও মনোযোগী থাকতে হবে।

যেমন এই ঘটনাটির উদ্দেশ্য যদি হয়ে থাকে কংগ্রেসের অধিবেশন চলাকালে তার কার্যক্রমকে বিঘ্নিত ও প্রতিহত করা, তাহলে নিশ্চিতভাবেই বলা চলে যে তারা সফল হয়নি। এখানে কংগ্রেস একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে কিছু আবেগী মানুষের অতি আগ্রহী অপকর্মের মুখে শক্তভাবে দাঁড়িয়ে থেকেছে। তাদের ওপর অর্পিত যে সাংবিধানিক দায়িত্ব সেটিও তারা শেষ পর্যন্ত পালন করেছে। জো বাইডেনের নির্বাচনের যে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া গত ৩ নভেম্বর থেকে চলমান তা তারা সম্পন্ন করেছে। কাজেই আমাদের মনে রাখতে হবে যে, একদিকে বিভ্রান্তিকর তথ্যের ভিত্তিতে আমরা কিছু বিভ্রান্ত মানুষের নিন্দনীয় কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের একটি যৌক্তিক, স্বার্থক অবস্থান আমরা লক্ষ করেছি। কাজেই আমাদের জন্য যেটি প্রথম শিক্ষা তা হলো—প্রতিষ্ঠান যদি শক্তিশালী থাকে তাহলে এ ধরনের মিথ্যাচার, বিভ্রান্তিকর তথ্য এবং উত্তেজনাকর অবস্থায় যারা বিভ্রান্ত হয়ে এ ধরনের অপকর্ম ঘটানোর চেষ্টা করে তারা কিন্তু সফল হতে পারে না। কাজেই গণতন্ত্রের জন্য প্রধানত প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান।

দ্বিতীয়ত, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কয়েক বছর ধরে বিভিন্নভাবে প্ররোচনা দিয়ে, উসকানি, মিথ্যা বক্তব্য দিয়ে কিছু লোককে উত্তেজিত করেছেন। ওই মানুষদের একটি অংশ গত বুধবার রাতে কংগ্রেসে হামলা চালিয়েছে। কাজেই এখানে আরো একটি শিক্ষণীয় বিষয় আছে যেটি নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট বাইডেন যুক্তিসংগতভাবে বলেছেন। নেতৃত্ব যেমন মানুষকে অনুপ্রাণিত করতে পারে, তেমনি উত্তেজিতও করতে পারে। এখানে কিন্তু আমরা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের উত্তেজনাকর বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া হিসেবেই এই দুর্ঘটনা দেখেছি। তাই এটিও আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। যাঁরাই গণতন্ত্রের ধারক-বাহক হিসেবে নিজেদের ধরে রাখতে চান, তাঁদেরকেই শান্তিপূর্ণ বক্তব্য দিতে হবে। দায়িত্বশীলভাবে তাঁদের কাজ করতে হবে। কারণ তাঁদের কাঁধের বোঝা অনেক বেশি। মানুষ তাঁদেরই অনুসরণ করে। অন্তত গণতন্ত্রের স্বার্থে তাঁদের এই বাড়তি দায়িত্ব বহন করতে হবে।

তৃতীয়ত, আমরা মনে করি যে গণতন্ত্র চর্চার দিক দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র অনেক সামনে এগিয়ে আছে। এখানে যুক্তরাষ্ট্রের যে বৈশ্বিক অবস্থান সেটিও যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে মনে রাখতে হবে। বিশ্বে সামরিক শক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র বড়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি কিন্তু তার নৈতিক শক্তি এবং ‘রোল মডেল’ হিসেবে বিশ্বে অবস্থান। সেই জায়গায় যারাই এই কাজ করছে এমনকি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও যে বক্তব্যগুলো দিচ্ছেন সে বক্তব্যগুলোর ফলাফল বিশ্ব পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে নির্ণয় করবে।

যেমন আজ সারা বিশ্বের কাছে প্রশ্ন, যুক্তরাষ্ট্রকে আমরা সারা বিশ্বে গণতন্ত্রের পীঠস্থান বলে ভাবি। সেই পীঠস্থানে কি যুক্তরাষ্ট্রকে আর গ্রহণ করা যাবে? যুক্তরাষ্ট্র কি তার সেই স্থান ধরে রাখতে পারল? আমি বলব, হ্যাঁ, এটি বিরাট প্রশ্নের মুখে পড়েছে। কিন্তু এর পাশাপাশি এটিও মনে রাখতে হবে, যুক্তরাষ্ট্রের বেশির ভাগ জনগণ এখনো গণতন্ত্রের পক্ষেই আছে। প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংবিধানিক যে দায়দায়িত্ব আছে সেগুলো যাতে পালন হয় সে জন্য তারা যত্নশীল।

পরিবর্তিত যুক্তরাষ্ট্রে যে পরিবর্তনের ইঙ্গিত সেটিও আমরা দেখতে পাচ্ছি। জর্জিয়ায় সিনেটের দুটি আসনে ডেমোক্র্যাটরা জিতে গেল। এতে করে এখন মোটা দাগে যুক্তরাষ্ট্রে ডেমোক্রেটিক প্রশাসনের যুগ শুরু হলো বলা চলে। প্রেসিডেন্টশিপ, সিনেট ও প্রতিনিধি সভা—তিনটি জায়গাই কিন্তু এখন ডেমোক্রেটিক পার্টির আওতায় চলে এলো। যুক্তরাষ্ট্রকে ঐক্যবদ্ধ করাই নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে থাকছে। তাঁকে ওই প্রতিষ্ঠানগুলো সদ্ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন এক জায়গায় নিয়ে যেতে হবে। সেখানে এই বিভাজন দূর করে আবারও হয়তো বিশ্বের সামনে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে গণতন্ত্রের পীঠস্থান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে।

আমি মনে করি, এখানে অনেক ঘটনা ঘটেছে যেগুলো ইতিবাচক। যেমন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বক্তব্যগুলো সব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘ব্লক’ করে দিয়েছে। এই বোধটুকু তাদের কাজ করছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এটি রিপাবলিকান পার্টিকে তারা আর আর্থিক সহযোগিতা দেবে না। কাজেই এই হট্টগোলের পাশাপাশি আমরা ইতিবাচক বিষয়গুলোও যুক্তরাষ্ট্রে দেখছি। আমার মনে হয়, কংগ্রেসে হামলার ঘটনাটি সর্বজনীন না করে কিছু বিভ্রান্ত মানুষ উসকানিতে যারা পা দিয়েছে তাদের কর্মকাণ্ড হিসেবেই আমরা আপাতত মনে করতে পারি। আমরা আশা করতে চাই, আগামী দিনের যুক্তরাষ্ট্র এখনকার নতুন প্রেক্ষাপটে আরো শক্তিশালী হবে। যুক্তরাষ্ট্র তার গণতন্ত্রের প্রতি সারা বিশ্বের মানুষের যে প্রত্যাশা তা মনে রেখেই আগামী দিনে নিজের অবস্থান নির্ধারণ করবে।

লেখক : যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত, বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা