kalerkantho

বুধবার । ২৯ বৈশাখ ১৪২৮। ১২ মে ২০২১। ২৯ রমজান ১৪৪২

করোনার বড় আঘাত বৈদেশিক কর্মসংস্থানে

মাসুদ রুমী   

২৯ ডিসেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



করোনার বড় আঘাত বৈদেশিক কর্মসংস্থানে

ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় ২০০০ সালে সৌদি আরব পাড়ি জমান বরিশালের চরবাড়িয়া ইউনিয়নের খন্দকার ফয়েজ হোসেন। মক্কার কাছাকাছি একটি রেস্টুরেন্টে কাজ পান তিনি। গত ২০ বছর বেশ ভালোভাবেই চলছিল সব। কিন্তু করোনাভাইরাস সংক্রমণে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে সব এলোমেলো হয়ে যায়। গত এপ্রিলে রেস্টুরেন্টটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশে ফিরে আসেন ফয়েজ। এখন তিনি বেকার। একই ইউনিয়নের সৌদিপ্রবাসী নুরুল ইসলামও দেশে ফিরে বেকারজীবন কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন।

ফয়েজ হোসেন ও নুরুল ইসলামের মতো লাখো প্রবাসী শ্রমিক কর্মস্থলে যোগ দিতে না পেরে সংকটে পড়েছেন। কারো চাকরি চলে গেছে, সময়মতো কাজে যোগ দিতে না পারায় কারো ভিসা বাতিল হয়েছে। আবার ভিসা-টিকিট সব থেকেও ফ্লাইটের রিটার্ন টিকিট না পেয়ে কাজে যোগ দিতে পারেননি অনেকে। নিরুপায় এই প্রবাসী শ্রমিকরা গত সেপ্টেম্বরে রাজপথে নামেন। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে সৌদি অ্যারাবিয়ান এয়ারলাইনস ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের কার্যালয়ের সামনে তাঁরা বিক্ষোভ করেন। সরকারের নানা তৎপরতায় ফ্লাইট চালুর পর কিছু প্রবাসী কাজে যোগ দেওয়া শুরু করেন।

ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হওয়ায় ২১ ডিসেম্বর থেকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে সৌদি আরব। সাত দিনের মেয়াদ শেষ হওয়ার শেষ দিনে আরো সাত দিনের জন্য নিষেধাজ্ঞা বাড়িয়েছে দেশটি। এতে আটকে গেছেন লাখো প্রবাসী কর্মী। সৌদির নিষেধাজ্ঞা দীর্ঘায়িত হলে প্রায় ৪০ হাজার নতুন ভিসা বাতিল হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এদিকে বাংলাদেশের বহু প্রবাসী শ্রমিক বিভিন্ন দেশে কর্তৃপক্ষের হাতে আটক রয়েছেন। তাঁদের সংখ্যা ১০ হাজারের কাছাকাছি। করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরুর পর এ বছরেই মধ্যপ্রাচ্যের নানা দেশে কারাগার অথবা ডিটেনশন সেন্টারে আটক প্রবাসী বহু বাংলাদেশি শ্রমিককে দেশে ফেরত পাঠিয়েছে সেসব দেশের কর্তৃপক্ষ। এখনো আরো অনেকে আটক রয়েছেন অনেক দেশে। তাঁদের বিরুদ্ধে শ্রম আইন ভঙ্গের অভিযোগ আছে।

অন্যদিকে করোনা মহামারির আগে সৌদিতে প্রথমবারের মতো কাজে যাওয়ার জন্য প্রায় ২৫ হাজার কর্মী ভিসা নিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁরা যেতে পারেননি। তাঁদের নতুন করে ভিসা নিতে বলা হচ্ছে।

সৌদি আরব থেকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাভোগ শেষে দেশে ফেরা কর্মীরা বলছেন, চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া, প্রতারিত হওয়া এবং ভিসার মেয়াদ শেষ বা কাজের অনুমতি না থাকাসহ বিভিন্ন কারণে তাঁদের আটক করে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। আর সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ফিরে আসা কর্মীরা জানিয়েছেন, কাজ না থাকায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের নিজ নিজ দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

জনশক্তি কর্মসংস্থান প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্য বলছে, ২০১৯ সালে বাংলাদেশ থেকে চাকরি নিয়ে বিভিন্ন দেশে যাওয়া কর্মীর সংখ্যা ছিল সাত লাখ। চলতি ২০২০ সালে সেই লক্ষ্যমাত্রা ছিল সাড়ে সাত লাখ। গত জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তিন মাসে বিদেশে যাওয়া মোট কর্মীর ৮৮ শতাংশ গেছে মধ্যপ্রাচ্যের ১০ দেশে। তাদের মধ্যে ৭৪ শতাংশই গেছে সৌদি আরবে। দেশটিতে প্রায় ২১ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক বিভিন্ন পেশায় কর্মরত।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের তথ্য বলছে, গত ১ এপ্রিল থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত সৌদি আরব, ইউএই, কুয়েত, কাতারসহ ২৮টি বৈদেশিক শ্রমবাজার থেকে ফিরে এসেছেন তিন লাখ ২৬ হাজার ৭৫৮ জন প্রবাসী। তাঁদের মধ্যে দুই লাখ ৮৭ হাজার ৪৮৪ জন পুরুষ এবং ৩৯ হাজার ২৭৪ জন নারী।

জানা গেছে, গত ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত কারাভোগ শেষে আউট পাস নিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রবাসী কর্মী ফেরত এসেছেন সৌদি আরব থেকে। গত আট মাসে দেশটি থেকে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছেন ১৭ হাজার ৩১৬ জন নারী কর্মীসহ মোট ৯৬ হাজার ৬৮৭ জন। একই সময়ে ইউএই থেকে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছেন আট হাজার ৩৯৭ জন নারীসহ মোট ৮৭ হাজার ৫২৫ জন কর্মী।

প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের তথ্য বলছে, ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত সিঙ্গাপুর থেকে ছয় হাজার ৩৪৪, মালদ্বীপ থেকে ১৪ হাজার ২২৩ এবং ওমান থেকে ১৮ হাজার ৯৫১ জন ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছেন। তাঁরা বিভিন্ন মেয়াদে কারাভোগ করে আউট পাসের মাধ্যমে দেশে ফেরেন। ভিসার মেয়াদ না থাকায় বা অবৈধ হওয়ায় সাধারণ ক্ষমার আওতায় কুয়েত থেকে ১৩ হাজার ৪২৬ জন ফেরত আসেন। এ ছাড়া বাহরাইন থেকে দুই হাজার ৬৩৫, দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ৭১, কাতার থেকে ১৪ হাজার ৯১১ এবং মালয়েশিয়া থেকে ৩৬ হাজার ৬৯৫ জন ফিরেছেন।

এদিকে করোনা সংক্রমণের শঙ্কায় ইতালিতে ঢুকতে না পেরে বিমানবন্দর থেকে ফেরত এসেছেন ১৫১ জন। এ ছাড়া ইরাক থেকে ১০ হাজার ১৬৯, শ্রীলঙ্কা থেকে ৫৭৪, মরিশাস থেকে ৪৫২, রাশিয়া থেকে ১০০ এবং তুরস্ক থেকে ১২ হাজার প্রবাসী ফেরত এসেছেন।

ব্র্যাক অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল ইসলাম গতকাল সোমবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এক যুগ ধরে প্রতিবছর গড়ে ছয় থেকে সাত লাখ কর্মী বিদেশে যাচ্ছিল। চলতি বছরেও শুরুটা ভালো ছিল। প্রথম তিন মাসে এক লাখ ৮০ হাজার শ্রমিক বিদেশে যায়। কিন্তু দেশে করোনাভাইরাস শনাক্ত হওয়ার পর সবচেয়ে বড় আঘাতটা আসে বৈদেশিক কর্মসংস্থানে। এ বছর দুই লাখের কিছু বেশি মানুষ বিদেশে যেতে পেরেছে। দেশের বাইরে অবস্থান করা এক কোটির বেশি আছে চরম সংকটে। তারা অনেকে করোনায় আক্রান্ত হয়েছে। দুই হাজারের বেশি প্রবাসী মারা গেছে। এর পরও পৌনে চার লাখ মানুষ কাজ হারিয়ে দেশে ফিরেছে। তাদের অনেকেই বেকার হয়ে পড়ায় ঋণে জর্জরিত।’

আশার খবর হলো, প্রবাসী আয়টা আশঙ্কা অনুযায়ী কমেনি। হয়তো অনেকেই চলে আসার আগে তাঁর পুরো আয়টা পাঠিয়ে দিয়েছেন। তবে নতুন বছরে শ্রমবাজার শিগগিরই স্বাভাবিক হবে বলে মনে হচ্ছে না। এই বাজার স্বাভাবিক করা এবং ফিরে আসা জনশক্তির কর্মসংস্থান নিশ্চিত করাটাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে।

জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিসের (বায়রা) সভাপতি বেনজীর আহমদ গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘২০২০ সাল জনশক্তি রপ্তানিতে সবচেয়ে বিপর্যয়ের বছর। সৌদি আরবে নতুন করে আবার ফ্লাইট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রবাসফেরত শ্রমিকরাও বড় সংকটে পড়েছে।’

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইমরান আহমদ বর্তমান পরিস্থিতির জন্য করোনা মহামারিকে দায়ী করেছেন। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, অন্যদের মতো প্রবাসীরাও করোনা পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন। অনেকেই করোনাকালে বা এরও আগে দেশে এসে আটকে গেছেন। তিনি বলেন, ‘ভিসার মেয়াদ বাড়ানো নিয়ে অনেকের সমস্যা আছে। আমাদের আয়ত্তের মধ্যে থাকা সমস্যাগুলো সমাধানের চেষ্টা চলছে।’



সাতদিনের সেরা