kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০২২ । ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ । ১১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

মন্দাকাল কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে অর্থনীতি

মাসুদ রুমী   

২৭ ডিসেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



মন্দাকাল কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে অর্থনীতি

করোনাভাইরাস মহামারির কারণে ভয়ংকর আর্থিক মন্দার সাক্ষী ২০২০ সাল। বিশ্ব অর্থনীতির ইতিহাসে ১৯৩০ সালের মহামন্দার পর সবচেয়ে বড় মন্দার মুখোমুখি এই গ্রহের মানুষ। এই আঘাত বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও পড়েছে। অসংখ্য মানুষের রুটি-রুজিতে টান পড়েছে, ব্যাপকভাবে কর্মী ছাঁটাই হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

অনেকে কাজ হারিয়ে গ্রামে চলে গেছে। মুখ থুবড়ে পড়েছে উৎপাদনশীলতাও। ব্যবসায়ীদের দৃষ্টিতে বছরটি বেঁচে থাকার, ব্যবসা করার নয়। এমন নেতিবাচক খবরের মধ্যেই আশার আলো দেখছে বাংলাদেশ।

গত ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা শনাক্ত হওয়ার পর সংক্রমণ মোকাবেলায় ২৬ মার্চ থেকে টানা ৬৬ দিন সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। অঘোষিত এই লকডাউনে জরুরি সেবা, কাঁচাবাজার, নিত্যপণ্য ও ওষুধের দোকান ছাড়া সব বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে অর্থনীতি বাঁচাতে ঈদুল ফিতর উপলক্ষে সীমিত পরিসরে স্বাস্থ্যবিধি মেনে দোকানপাট, শপিং মল খুলে দেওয়া হয়। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চালু হয় গণপরিবহন। করোনাভীতি কাটিয়ে মানুষ শামিল হয় জীবিকার মিছিলে। আর নিষেধাজ্ঞা শিথিল ও প্রণোদনা প্যাকেজের কারণে ক্রমেই গতি ফিরতে থাকে ব্যবসা-বাণিজ্যে। অর্থনীতি সচল রাখার যুদ্ধে বড় ভূমিকা রাখে কৃষি খাত ও প্রবাসী আয়। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে একের পর এক রেকর্ড হতে থাকে। শক্তিশালী কৃষি খাত তুলনামূলক শক্ত অবস্থানে থেকে অর্থনীতিকে সহায়তা দেয়। এখন ধীরে ধীরে কাটছে অনিশ্চয়তার মেঘ। এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে সামষ্টিক অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, উৎপাদন ও সরবরাহের অনেক খাত ঘুরে দাঁড়িয়েছে, কিন্তু অর্থনীতির চাহিদার দিকে সেভাবে উন্নতি দেখা যায়নি। রাজস্ব আয়, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান এখনো নেতিবাচক ধারায় রয়েছে। সে কারণে অর্থনীতি স্বাভাবিক গতিতে ফেরাতে আরো সময় লাগবে। এর মধ্যে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ নিয়ে নতুন শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ জন্য কার্যকরভাবে করোনা মোকাবেলায় দ্রুত টিকা আনা, ক্ষতিগ্রস্ত খাতগুলোয় নীতি সহায়তার পরিধি বাড়ানো, ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ দ্রুত বাস্তবায়নের পাশাপাশি অবহেলিত খাতের জন্য নতুন প্রণোদনা দেওয়ার দরকার বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সমাজের সকল অংশের মানুষের ওপর করোনার আঘাত এসেছে। জীবন-জীবিকা, ব্যবসা, উৎপাদন, অর্থনীতি কোনো কিছুই এই আঘাতের বাইরে নয়। তবে এ ক্ষেত্রেও বৈষম্য হয়েছে দেশের অর্থনীতির কাঠামোগত সমস্যার কারণে। অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ঘটলেও অর্থনীতির মৌলিক কাঠামো আঘাত সহ্য করার ক্ষমতা খুব নাজুক ছিল। যার ফলে আমাদের দিন এনে দিন খাওয়া মানুষের ওপর বড় রকম আঘাত এসেছে। এই আঘাত আরো বিস্তৃত হয়েছে, কারণ আমাদের জীবনব্যাপী সব মানুষের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি নেই। ’ তিনি বলছেন, কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক খাতের ব্যাপ্তি কম হওয়া, রপ্তানিতে একক খাতের ওপর বেশি নির্ভরতা, কৃষিতে বহুমুখীকরণের অভাব, প্রণোদনা প্যাকেজ বিতরণে বৈষম্য, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার অভাবে মহামারির ধাক্কা বাংলাদেশে বেশি লেগেছে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. নাজনীন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘২০২০ সাল শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, সারা দুনিয়ার জন্যই চ্যালেঞ্জের বছর, অর্থনৈতিক স্থবিরতার বছর হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। শুরুর দিকে যেমন পরিস্থিতি ছিল তা থেকে কিছুটা আমরা বের হয়ে এসেছি। করোনার প্রথম ঢেউয়ে জীবন-জীবিকা বেশ খানিকটাই স্বাভাবিক হওয়ার যে প্রবণতা দেখতে পাচ্ছি, তার ফলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বড় বিপর্যয়ে পড়েনি। এই কারণেই আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক থাকছে। ২০২১ সালের শেষের দিকে গিয়ে হয়তো আমরা করোনার প্রভাব কাটিয়ে উঠে স্বাভাবিক অর্থনীতির গতিধারায় ফিরতে পারব। রাজস্ব ঘাটতি আমাদের ভবিষ্যতে চ্যালেঞ্জে ফেলতে পারে। ’ তবে তিনি বলছেন, এই বছর স্বাস্থ্য খাতের দুর্বলতাগুলো বিশেষভাবে টের পাওয়া গেছে। কৃষি কত গুরুত্বপূর্ণ, সেটাও বোঝা গেছে। এ বছর করোনা ছাড়াও বন্যার সমস্যাও মোকাবেলা করতে পারা গেছে। সাধারণ মানুষের টিকে থাকার ক্ষমতা অর্থনীতির জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটা নতুন করে উপলব্ধি করা গেছে।

অর্থনীতি বিশ্লেষক মামুন রশীদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনা অভিঘাত মোকাবেলায় সাময়িক ব্যর্থতা, ধীরে ধীরে সেই সক্ষমতা অর্জন, দুর্নীতি আর বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণ-সক্ষমতাই ছিল ২০২০ জুড়ে আলোচনায়। অন্যদিকে যুগপত্ভাবে চীন ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ব্যবস্থাপনায় সরকারের বিচক্ষণতা, সংকট মোকাবেলায় স্থানীয় প্রশাসনের শক্তিশালী ভূমিকাও প্রশংসিত হয়েছে। সংকট মোকাবেলায় সরকারের সামগ্রিক সক্ষমতাও বেড়েছে। ’ তিনি বলছেন, বিদেশে শ্রমিক যাওয়া প্রায় ৭০ শতাংশ কমে গেলেও প্রবাসী আয় আরো কিছু দেশের মতো অনেক বেড়েছে। বেড়েছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। প্রযুক্তি অবকাঠামো থাকার কারণে এ সংকটকালে ই-কমার্সের প্রসার ঘটেছে। সুপারশপ, হোম ডেলিভারি, ফার্মেসি ব্যবসার প্রসার ঘটেছে। ব্যবসার রূপান্তরে ও ব্যক্তিজীবনে প্রযুক্তির ব্যবহার বহুগুণ বেড়েছে। বেড়েছে স্মার্টফোন, ইন্টারনেটের ব্যবহার ও বাসায় থেকে অফিসের কাজ। এসবই অর্থনীতিকে জেগে উঠতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) জানাচ্ছে, করোনার কারণে বিশ্বের অর্থনীতি এই বছরে অন্তত ৩ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একই কারণে চলতি বছর বিশ্ব অর্থনীতি ৫.৬ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা আঙ্কটাড। চলমান করোনা মহামারি মোকাবেলায় এখন পর্যন্ত সারা বিশ্বে ১৩ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে।

এমন প্রেক্ষাপটে আইএমএফ বলছে, মহামারির মধ্যেই চলতি অর্থবছরে মাথাপিছু জিডিপিতে (মোট দেশজ উৎপাদন) ভারতকে ছাড়িয়ে যাবে বাংলাদেশ। সংস্থাটির পূর্বাভাস ঠিক থাকলে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি হবে এক হাজার ৮৮৮ ডলার, ভারতের এক হাজার ৮৭৭ ডলার। এ ছাড়া এই সূচকে দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষ এবং এশিয়ার মধ্যে চতুর্থ হতে চলেছে বাংলাদেশ। মন্দার মধ্যেও এমন পূর্বাভাসের কারণে আলোচনায় ছিল বাংলাদেশের অর্থনীতি।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনার মধ্যে অন্যান্য দেশ যেখানে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধিতে যাচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশ আসলে একটা ইতিবাচক প্রবৃদ্ধিতে আছে। এটা স্বস্তির বিষয়। আমার কাছে মনে হয় এটি আশাবাদী হওয়ার মতো একটি বিষয়। ’

দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে দেখা যাচ্ছে, করোনা সংকটের মধ্যেই বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪২ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে। রেমিট্যান্স, রপ্তানি আয় ও বৈদেশিক ঋণ সহায়তার ওপর ভর করে রিজার্ভ এই উচ্চতায় পৌঁছেছে। ১ জানুয়ারি থেকে ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে দেশে ২০.৫০ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আসে। করোনাকালে অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে বড় ভূমিকা রেখে চলেছে কৃষি। মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ১৫.৪৪ শতাংশ অবদান কৃষি ও সেবা খাতের। কর্মসংস্থানেও বড় ভূমিকা রাখছে খাতটি। আয় কমে যাওয়ায় শহরত্যাগী মানুষগুলোকেও ধারণ করেছে গ্রামীণ অর্থনীতি।

চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি করে এক হাজার ৫৭৪ কোটি ৭৮ লাখ ডলার আয় হয়েছে। এই অঙ্ক গত বছরের একই সময়ের চেয়ে দশমিক ৯৩ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে নভেম্বর মাসে রপ্তানি আয়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে দশমিক ৭৬ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) সার্বিকভাবে পণ্য আমদানি কমেছে প্রায় ১৩ শতাংশ।

অন্যদিকে করোনায় বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার মাঝেও ভালো অবস্থায় আছে দেশের পুঁজিবাজার। এশিয়া ফ্রন্টিয়ার ক্যাপিটালের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর মাসে পুঁজিবাজারের উত্থানে এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষে বাংলাদেশ। এমনকি ২৪.৪ শতাংশ উত্থানের মধ্য দিয়ে বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভালো করেছে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার।

তবে বিদেশি বিনিয়োগ, বৈদেশিক বাণিজ্য, রাজস্ব আয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি— এসব ক্ষেত্রে নেতিবাচক ধারা চলছে।

রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৩.১৯ শতাংশ। গত অর্থবছরের একই সময়ে রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি ছিল ৬.১৯ শতাংশ। রাজস্ব আহরণ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শোচনীয় অবস্থায় থাকলেও অক্টোবর ও নভেম্বরে প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক হয়েছে। এ ছাড়া ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ বেড়েছে। কমেছে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি।

অর্থনীতি জাগিয়ে তুলতে এ পর্যন্ত মোট এক লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার ২১টি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে, যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩.৭ শতাংশ।

অর্থনীতিবিদ এবং সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজের সুবিধা যাদের পাওয়ার কথা তারা যাতে পায়, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। যারা কাজ হারাচ্ছে, তাদের আয়-রোজগারের ব্যবস্থা করতে হবে। কর্মসংস্থান বাড়াতে বিদেশি বিনিয়োগ আনতে হবে। ’



সাতদিনের সেরা