kalerkantho

শনিবার । ৯ মাঘ ১৪২৭। ২৩ জানুয়ারি ২০২১। ৯ জমাদিউস সানি ১৪৪২

জয় বাংলা

মোবারক আজাদ    

৫ ডিসেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



জয় বাংলা

নির্মাণকাল : ২০১৮ ভাস্কর : সৈয়দ মোহাম্মদ সোহরাব জাহান

সবুজে ঘেরা চারপাশ। পাহাড়, মাঠ আর বনের শোভায় দ্যুতি ছড়াচ্ছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। এই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে ভাস্কর্য ‘জয় বাংলা’। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে যে স্লোগান ছিল সবার মুখে মুখে, যে স্লোগান ছিল যুদ্ধজয়ের বড় প্রেরণা, সেই ‘জয় বাংলা’ নামে তৈরি করা হয়েছে এই ভাস্কর্যটি। এর মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধে নারীদের প্রত্যক্ষ ও সমান অংশগ্রহণের বিষয়টি যেমন ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, তেমনি মুক্তিযুদ্ধে পাহাড়িদের ভূমিকা ও উপজাতি এক নারীর অবয়ব উপস্থাপন করা হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধের স্মরণে ২০১৮ সালে এই ভাস্কর্যটি নির্মাণ করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের ভাস্কর্য বিভাগের ৪১তম ব্যাচের সাবেক শিক্ষার্থী সৈয়দ মোহাম্মদ সোহরাব জাহান। তাঁর সহযোগী ছিলেন মুজাহিদুর রহমান মুসা, জয়াশীষ আচার্য ও তপন ঘোষ।

‘জয় বাংলা’ ভাস্কর্যটি স্থাপন করা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ও বুদ্ধিজীবী চত্বরের মধ্যবর্তী চৌরাস্তায়। এর উচ্চতা প্রায় ১৮ ফুট এবং প্রস্থ ২২ ফুট। দুই স্তরে নির্মিত এই ভাস্কর্যের প্রথম স্তরে আছেন ১৬ জন মুক্তিযোদ্ধা। তাঁদের মধ্যে সাতজন নারী, যাঁরা মুক্তিযুদ্ধের প্রতিনিধিত্ব করছেন। ওপরে দ্বিতীয় স্তরে দুই হাতে অস্ত্র উঁচিয়ে জয়োল্লস করছেন এক নারী ও দুই পুরুষ মুক্তিযোদ্ধা; যা মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী স্বাধীনতার বহিঃপ্রকাশ। এর মধ্যে ওপরের স্তরে তিন মুক্তিযোদ্ধার উচ্চতা ১১ ফুট এবং নিচের স্তরের প্রতিটি মানব অবয়বের উচ্চতা সাড়ে পাঁচ ফুট থেকে ছয় ফুট। এ ছাড়া লোহার অবকাঠামোর ওপর কংক্রিটের ঢালাইয়ে নির্মিত ভাস্কর্যের ওপরের অংশে লাল রং এবং নিচের অংশে সাদা রং ব্যবহার করা হয়েছে।

ভাস্কর্যটি তৈরিতে সময় লেগেছে প্রায় এক বছর। এটি তৈরি করা হয়েছে ‘লাইভ কাস্টিং মেথডে’ অর্থাৎ জীবিত মানুষের ছাঁচে। ভাস্কর্যটি যাতে রোদ-বৃষ্টিতেও মলিন না হয়, সে জন্য ধূসর রঙের আস্তরণে মার্বেল ডাস্ট ব্যবহার করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ‘১৯৫২ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত স্বাধিকার আদায় ও স্বাধীনতাসংগ্রামে গণমানুষের অংশগ্রহণের স্মৃতিস্বরূপ গণমানুষের ভাস্কর্য চাই’ দাবিতে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন ‘আমরা চবিয়ান’ ব্যানারে ২০১৬ সালে আন্দোলন শুরু করে। এই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ‘জয় বাংলা’ ভাস্কর্যটি তৈরির উদ্যোগ নেয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। সব অন্যায়, অবিচার, জুলুম, নির্যাতনকে পদদলিত করে বীর বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা অর্জনের সাহসিকতার প্রতীক হিসেবে ভাস্কর্যটি তৈরি করা হয়েছে। এরই মধ্যে ভাস্কর্য প্রাঙ্গণটি মুক্তবুদ্ধিচর্চা ও যৌক্তিক দাবি আদায়ের বিপ্লবী চত্বরে রূপ নিয়েছে।

জানতে চাইলে ভাস্কর সৈয়দ মোহাম্মদ সোহরাব জাহান কালের কণ্ঠকে বলেন, “দেশ-বিদেশে অনেক কাজ করলেও আমি এই প্রথম কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাস্কর্য নির্মাণ করলাম। দেশের অন্যান্য নির্মিত ভাস্কর্যের চেয়ে এটির আলাদা বৈশিষ্ট্য হলো—অন্যান্য ভাস্কর্যে মুক্তিযুদ্ধে নারীদের অংশগ্রহণ পরোক্ষভাবে দেখানো হয়েছে। এই ভাস্কর্যে মুক্তিযুদ্ধে নারীর প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের বিষয়টি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের সময় সবচেয়ে সাহসী ও প্রেরণার স্লোগান ছিল ‘জয় বাংলা’। তাই ভাস্কর্যটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘জয় বাংলা’।”

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন টিপু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তরুণ প্রজন্মের কাছে জয় বাংলা ভাস্কর্যটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রসার, বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাস তুলে ধরছে।’ তিনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একটি ভাস্কর্য স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়ারও দাবি জানান।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সদ্য সাবেক শিক্ষার্থী সাগর আহমেদ বলেন, “দীর্ঘ সময় ক্যাম্পাসে ভাস্কর্য না থাকায় একটা অপূর্ণতা ছিল, ‘জয় বাংলা’ ভাস্কর্য স্থাপনে তা পূরণ হয়েছে। কারণ যেকোনো অপশক্তির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের সংগ্রাম যে অনিবার্য, এ ভাস্কর্য তারই প্রতীক হয়ে টিকে থাকবে।”

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা