kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ মাঘ ১৪২৭। ২৮ জানুয়ারি ২০২১। ১৪ জমাদিউস সানি ১৪৪২

বিশেষজ্ঞ মত

আগামীর ঢাকার জন্যই বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা

মো. আশরাফুল ইসলাম
প্রকল্প পরিচালক (বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা)

৪ ডিসেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



আগামীর ঢাকার জন্যই বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা

ঢাকা মহানগর অঞ্চলের জন্য প্রস্তুত করা বিদ্যমান বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) ২০১০ সালের ২২ জুন গেজেট আকারে প্রকাশ হয়। যার মেয়াদ ছিল ২০১৫ সাল পর্যন্ত। এরপর ২০১৫ সালের মার্চে ড্যাপ ২০১৬-২০৩৫ প্রণয়নের কাজ শুরু হয়। প্রকল্পের কাজে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিয়োজিত আছে শেলটেক (প্রা.) লিমিটেড এবং ডিডিসি (প্রা.) লিমিটেড।

রাজউকের প্রণয়নাধীন ড্যাপ আগামী ২০ বছরের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে, যার আওতাধীন এলাকা ১৫২৮ বর্গকিলোমিটার। বিবিএস ২০১১ সাল অনুযায়ী জনসংখ্যা ১৫.৫১ মিলিয়ন এবং ২০৩৫ সাল প্রক্ষেপণ অনুযায়ী প্রক্ষেপিত জনসংখ্যা দুই কোটি ৬০ লাখ। গোটা রাজউক এলাকা তিন জেলায় (ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর), চার সিটি করপোরেশন এলাকা (ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ), পাঁচটি পৌরসভা (সাভার, তারাব, কালীগঞ্জ, সোনারগাঁ এবং কাঞ্চন) এবং ৬৯টি ইউনিয়ন পরিষদের সমন্বয়ে গঠিত। প্রকল্প এলাকাকে ছয়টি স্বতন্ত্র প্রধান অঞ্চলে এবং ৭৫টি উপ-অঞ্চলে ভাগ করে পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে।

এবারের পরিকল্পনাটির অন্তর্নিহিত দর্শন হচ্ছে—ঢাকাকে একটি মানবিক শহর হিসেবে গড়ে তোলা। পরিকল্পনার মূল ভিত্তি হচ্ছে অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিকল্পনা অর্থাৎ সব আর্থসামাজিক শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রয়োজন আর জীবনযাত্রাকে পরিকল্পনায় আমলে নেওয়া। উদ্দেশ্য হলো—সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকার পথের বাধাগুলো সরানো এবং তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা আর জীবনমানকে আরো উন্নত করার জন্য প্রয়োজনীয় ও জরুরি পদক্ষেপগুলো নেওয়া।

পরিকল্পনা প্রণয়ন পদ্ধতি : পরিকল্পনা প্রণয়নে মোট পাঁচটি ধাপ অনুসরণ করা হয়েছে। প্রতিটি ধাপে খসড়া প্রতিবেদন তৈরির পর তা সংশ্লিষ্ট সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধি সমন্বয়ে গঠিত ৩৯ সদস্যের কারিগরি ব্যবস্থাপনা কমিটির সামনে উপস্থাপন ও তাদের মতামতের ভিত্তিতে সংযোজন-বিয়োজনের পর চূড়ান্ত করা হয়েছে। খসড়া পরিকল্পনাটি কারিগরি কমিটিতে উপস্থাপন ও সদস্যদের লিখিত মতামতের ভিত্তিতে হালনাগাদের পর গত ৬ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ নভেম্বর পর্যন্ত গণশুনানির উদ্দেশ্যে জনসাধারণের মতামত, আপত্তি ও পরামর্শের জন্য রাজউকের পাঁচটি কার্যালয় ও ওয়েবসাইটে দেওয়া হয়।

জনগণের অংশগ্রহণ : সব শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে বিভিন্ন স্তরে মতবিনিময়সভার মাধ্যমে ড্যাপ প্রণয়ন করা হয়েছে। খসড়া বিশদ পরিকল্পনার ওপর দুই মাসব্যাপী গণশুনানি থেকে প্রায় সাড়ে সাত হাজার মতামত পাওয়া যায়, যা পর্যালোচনা করে খসড়া প্রতিবেদন পরিশীলিতকরণের কাজ চলছে। এ ছাড়া বিভিন্ন পেশাজীবীর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক মতবিনিময়সভা চলমান রয়েছে।

বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব : প্রস্তাবগুলো হলো—নিয়ন্ত্রিত মিশ্র ভূমি ব্যবহারে উৎসাহ, জনঘনত্ব বিন্যাস পরিকল্পনা, নৌপথের সমন্বয়ে ব্লু নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা এবং অবকাঠামোর সার্বিক রূপান্তরে নগরজীবন রেখা প্রতিষ্ঠা।

নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্তের আবাসনের বিধান পুনর্নির্ধারণ : ড্যাপে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্তের আবাসনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কারণ, ঢাকা মহানগর অঞ্চলের মোট জনসংখ্যার বিরাট অংশ এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। পরিকল্পনায় নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্তের জন্য সুলভ আবাসনের বিধান পরিমার্জনের মাধ্যমে সাধারণভাবে প্রযোজ্য বিধানের চেয়ে তা শিথিলের সুপারিশ করা হয়েছে। বিশ্বের প্রায় সব বড় শহরেই এ ধরনের ব্যতিক্রম লক্ষণীয়। এই শ্রেণির আবাসনের বিধান পুনর্নির্ধারণের মাধ্যমে শহরের মোট জনসংখ্যার বড় অংশ উপকৃত হবে।

সরকার এরই মধ্যে নিম্ন আয়ের মানুষের আবাসনের জন্য রেন্টাল হাউজিংসহ বিভিন্ন প্রকল্পের উদ্যোগ নিয়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে এবারের পরিকল্পনায় প্রস্তাবিত উন্নয়নস্বত্ব বিনিময় কৌশল প্রয়োগের ক্ষেত্রেও সুলভ আবাসনের সংস্থান রাখার বিনিময়ে উন্নয়ন প্রণোদনা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে করে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোক্তাদের মাধ্যমেও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য আবাসনের জোগানের পথ প্রশস্ত হবে।

ব্লকভিত্তিক আবাসন পদ্ধতি : শহরের আবাসন চাহিদা পূরণে ব্লকভিত্তিক উন্নয়ন পদ্ধতি অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। যেহেতু নগর এলাকায় জায়গার স্বল্পতা আছে, তাই অপেক্ষাকৃত কম জায়গার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিতকরণে এই পদ্ধতির প্রয়োগ জরুরি। ব্লকভিত্তিক আবাসন পদ্ধতির অন্যতম উদ্দেশ্য হলো উচ্চতা সম্প্রসারণে উৎসাহিত করা, যাতে যত্রতত্র নগরাঞ্চল সম্প্রসারণ কমিয়ে আনা এবং শহরের নিচু জমি ও কৃষিজমির সুরক্ষা হয়।

সড়ক ও গণপরিবহন ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার : প্রণীত ড্যাপে সড়ক, নৌ ও রেলপথকে গুরুত্ব দিয়ে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। পরিকল্পনায় সর্বমোট ২৭৪৯ কিলোমিটার সড়কপথের প্রস্তাব করা হয়েছে। যোগাযোগব্যবস্থা কার্যকর, নির্বিঘ্ন ও যানজটমুক্ত করার জন্য ঢাকা স্ট্রাকচার প্ল্যান ২০১৬-২০৩৫ এবং কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা ২০১৬-২০৩৫ সালের সঙ্গে সমন্বয় রেখে ঢাকার আশপাশের শহরকে যুক্ত করতে পাঁচটি মেট্রো, দুটি বিআরটি, ছয়টি এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, ঢাকা-ময়মনসিংহ রোডের সমান্তরালে দুটি প্রধান সড়ক, দুটি রিংরোড, রিংরোডের সঙ্গে সংযুক্ত রেডিয়াল রোড এবং বৃত্তাকার নৌপথের প্রস্তাব করা হয়েছে। মানুষের যাতায়াত সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী করার লক্ষ্যে ড্যাপে গণপরিবহনব্যবস্থাকে সব থেকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যা স্বল্প সময়ে এবং স্বল্প ব্যয়ে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার সহায়তায় প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।

ট্রানজিটভিত্তিক উন্নয়ন : স্টেশন বা টার্মিনাল এলাকা কিংবা তার চারপাশ হচ্ছে এমন একটি এলাকা, যেখানে বিভিন্ন ধরনের যানবাহন জড়ো হয় এবং এর মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক যাত্রীকে তাদের বিভিন্ন গন্তব্যে স্থানান্তর করা। স্টেশন ব্যবহারকারী যাত্রীদের লক্ষ্য করে সাধারণ কর্মকাণ্ড ক্রমেই বাড়ছে। তাই এই এলাকাগুলোকে সুবিধাজনক ও আকর্ষণীয় করে তুলতে হবে, যেন মানুষ এই স্থানগুলো ব্যবহার বা এখানে বাস করতে অনেক বেশি উৎসাহী হয়।

পথচারী ও অযান্ত্রিক যান চলাচলে অগ্রাধিকারমূলক নির্দেশনা : ড্যাপে পথচারী ও অযান্ত্রিক যান চলাচলের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ঢাকা শহরের পরিবহনব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন ধরনের ব্যয়বহুল প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে, যা পরিবহন সমস্যা দূর করতে কার্যকর অবদান রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে। ব্যয়বহুল প্রকল্পগুলোর পরিবর্তে বরং স্বল্প ব্যয়ের কার্যকরী প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে বেশিসংখ্যক মানুষ উপকৃত হবে। অযান্ত্রিক যানবাহন ও পথচারীদের হাঁটার অনুকূল পরিবেশ না থাকার পরও বর্তমানে ঢাকা শহরে মোট যাত্রার প্রায় ৩৫ শতাংশ মানুষ অযান্ত্রিক যানবাহন দিয়ে এবং ৪০ শতাংশ মানুষ হাঁটতে অভ্যস্ত। ড্যাপে পথচারী ও অযান্ত্রিক যান চলাচলবিষয়ক বিস্তারিত প্রস্তাব এবং নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সাইকেলের জন্য আলাদা লেন করার সুপারিশ করা হয়েছে।

বিদ্যালয়ভিত্তিক অঞ্চলের ধারণা ও স্বাস্থ্যসেবার প্রস্তাব : যারা যে এলাকায় বাস করবে, তাদের ছেলে-মেয়েরা সেই এলাকায় অবস্থিত স্কুলে ভর্তি হবে। এই ধারণাকে নগর পরিকল্পনার ভাষায় বলা হয় বিদ্যালয়ভিত্তিক অঞ্চল ধারণা। পৃথিবীর উন্নত প্রায় সব দেশে এই ধারণা বলবৎ আছে।  ঢাকা শহরের দুর্বিষহ যানজটের অন্যতম কারণ এই একমুখী স্কুল-কলেজের অবস্থান। নগরবাসীকে এ থেকে পরিত্রাণ পেতে প্রণীত ড্যাপে বিদ্যালয়ভিত্তিক গঠনের এলাকা প্রস্তাব করা হয়েছে।

প্রতিটি অঞ্চলে বড় পার্ক নির্মাণ : একটি পরিবেশবান্ধব শহরের জন্য যে সংখ্যক পার্ক, খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত স্থান থাকার কথা, ঢাকা মহানগর অঞ্চলে তা নেই। ভৌত জরিপ থেকে দেখা যায়, ঢাকায় মোট উন্মুক্ত স্থানের পরিমাণ মোট এলাকার মাত্র ০.৯ শতাংশ, যা খুবই নগণ্য। উন্মুক্ত স্থান, পার্ক, বন ইত্যাদি সবুজায়নের উদ্যোগ পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, বাস্তুতন্ত্রের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখে। উন্মুক্ত স্থানগুলোতে যদি স্থানীয় পরিবেশের উপযোগী গাছ লাগানো হয়, সেগুলো শহরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ঢাকা শহরে রমনা পার্কের মানের আর কোনো পার্ক নির্মিত হয়নি। পরিবেশবান্ধব শহর তৈরির লক্ষ্যে ড্যাপে মহানগরের পাঁচটি বৃহৎ আঞ্চলিক পার্ক, ৪৯টি জলকেন্দ্রিক পার্ক, পাঁচটি বৃহৎ ইকো পার্ক, আটটি অন্যান্য পার্ক এবং খেলার মাঠের প্রস্তাব করা হয়েছে।

উন্নয়নস্বত্ব বিনিময় পদ্ধতি : উন্নয়নস্বত্ব প্রতিস্থাপন পদ্ধতি এক ধরনের ভূমিভিত্তিক বিনিময় প্রক্রিয়া, যা টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে যথাযথ ও কার্যকর প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। ড্যাপ এলাকার জন্য মূলত ঐতিহাসিক স্থাপনা, কৃষিজমি, বন্যাপ্রবণ অঞ্চল বা সংবেদনশীল এলাকা সংরক্ষণে উন্নয়নস্বত্ব বিনিময় পদ্ধতির সুপারিশ করা হয়েছে।

সর্বোপরি মানুষের সার্বিক জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের কথা বিবেচনা করে প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত রূপকল্প ২০৪১ অনুযায়ী বাংলাদেশকে উন্নত রাষ্ট্রে রূপান্তরের নিমিত্তে রাজধানী শহরের জন্য সময়োপযোগী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ ও কৌশলের সমন্বয়েই এবারের বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনাটি প্রণয়ন করা হয়েছে। সবার গঠনমূলক মতামত নিয়েই খসড়া পরিকল্পনাটি চূড়ান্ত করা হবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা