kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৭ মাঘ ১৪২৭। ২১ জানুয়ারি ২০২১। ৭ জমাদিউস সানি ১৪৪২

সাবাস বাংলাদেশ

রফিকুল ইসলাম ও রেদওয়ানুল হক, রাজশাহী   

৩ ডিসেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



সাবাস বাংলাদেশ

নির্মাণকাল : ১৯৯২ ভাস্কর : নিতুন কুন্ডু

দুই তরুণ মুক্তিযোদ্ধা। একজনের পরনে প্যান্ট, অন্যজনের লুঙ্গি। একজন দুই হাত দিয়ে রাইফেল ধরে আছে, আরেকজনের ডান হাতে রাইফেল আর বাঁ হাত মাথার ওপরে মুষ্টিবদ্ধ; যেন বাঙালির হৃদয়ের বিজয় অর্জনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞার বহিঃপ্রকাশ। তারা শত্রুকে শেষ করে দিতে অদম্য গতিতে ছুটছে, যা মুক্তিযুদ্ধে সব পেশার মানুষের অংশগ্রহণের প্রতীক। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের পশ্চিম পাশের মাঠে দাঁড়িয়ে আছে ভাস্কর্য ‘সাবাস বাংলাদেশ’। শিল্পী নিতুন কুন্ডুর শৈল্পিক হাতের ছোঁয়ায় লাল বেলে মাটির এই ভাস্কর্যে রচিত হয়েছে সংগ্রামী বাঙালির ইতিহাস এবং অসাম্প্রদায়িক বাংলার চূড়ান্ত এক বিজয়ের জীবন্ত ছবি। বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদের উদ্যোগে ১৯৯১ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি ভাস্কর্যটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। ১৯৯২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি এটির উদ্বোধন করেন শহীদ জননী জাহানারা ইমাম।

ভাস্কর্যটির পাদদেশে রয়েছে একটি মুক্তমঞ্চ। ৪০ বর্গফুট জায়গার ওপর নির্মিত ভাস্কর্যের ঠিক পেছনেই রয়েছে ৩৬ ফুট লম্বা একটি দেয়াল। দেয়ালটির উপরিভাগে একটি বৃত্ত, যা স্বাধীনতার সূর্যের প্রতীক। ভাস্কর্যটির দুই পাশে রয়েছে আয়তাকার দুটি দেয়াল, যার একটিতে কয়েকজন বাউলগান করছে, যা বাঙালি জাতির গ্রামীণ সংস্কৃতির পরিচায়ক। অন্য দেয়ালটিতে মায়ের কোলে শিশু ও দুই তরুণী, যাদের একজনের হাতে রয়েছে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা। সেই পতাকার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে এক কিশোর। যা আজ বাঙালির প্রেরণার বাতিঘর হয়ে গৌরবের সঙ্গে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। ভাস্কর্যের নিম্নভাগে লেখা কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য রচিত চরণ—‘সাবাস, বাংলাদেশ, এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়/জ্বলে পুড়ে-মরে ছারখার, তবু মাথা নোয়াবার নয়।’

ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানে সক্রিয় অংশ নেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। এই আন্দোলনে পাকিস্তানি হানাদারদের গুলি থেকে শিক্ষার্থীদের বাঁচাতে গিয়ে শহীদ হন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. শামসুজ্জোহা। এরপর ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানিরা অতর্কিত হামলা চালিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদ নিশ্চিহ্ন করার যে ব্যর্থ প্রয়াসের সূচনা করে তাতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ও আক্রান্ত হয়। কয়েক দিনের মধ্যে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর যে দল রাজশাহীতে সক্রিয় ছিল তা দুর্বল হয়ে পড়ে। এপ্রিলের মাঝামাঝিতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি বড় অংশ শহরে ঢোকে। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থায়ী ঘাঁটি গাড়ে। তাদের বিতাড়িত করতে গিয়ে মারা যান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হবিবুর রহমান, অধ্যাপক সুখরঞ্জন সমাদ্দার, অধ্যাপক মীর আবদুল কাউয়ুমসহ অনেকেই। তাঁদের আত্মত্যাগ ও স্মৃতির প্রতি সম্মানে নির্মাণ করা হয় এই ‘সাবাস বাংলাদেশ’।

তৎকালীন ভাস্কর্য নির্মাণ কমিটির সদস্য আহমেদ শফিউদ্দিন বলেন, ওই সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন অধ্যাপক আমানুল্লাহ আহমদ। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, ছাত্রসংসদ, শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্ট সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ভাস্কর্যটি নির্মাণ করা হয়। পাশাপাশি জনসাধারণের অংশগ্রহণও ছিল।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘স্বাধীনতাযুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক তরুণ জীবন বিলিয়েছিলেন। তাঁদের স্মরণে নির্মিত এই ভাস্কর্যটি আমাদের সবার জন্য এক অনুপ্রেরণার উৎস। ভাস্কর্যটির মাধ্যমে বাঙালি জাতির দেশপ্রেম, পরস্পরের সম্প্রীতি ও একতাবদ্ধতার ছবি অঙ্কিত হয়েছে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা