kalerkantho

বুধবার। ৬ মাঘ ১৪২৭। ২০ জানুয়ারি ২০২১। ৬ জমাদিউস সানি ১৪৪২

আমৃত্যু উল্লেখ না থাকলে যাবজ্জীবন মানে ৩০ বছর কারাদণ্ড

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২ ডিসেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আমৃত্যু উল্লেখ না থাকলে যাবজ্জীবন মানে ৩০ বছর কারাদণ্ড

যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামিকে কত বছর কারা ভোগ করতে হবে তা নিয়ে বিতর্কের অবসান হয়েছে। দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ গতকাল মঙ্গলবার এক রায়ে বলেছেন, দেশের প্রচলিত দণ্ডবিধি ও ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অর্থ ৩০ বছরের কারাদণ্ড। তবে কোনো আদালত বা ট্রাইব্যুনাল বা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল রায়ে যদি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড মানে আমৃত্যু কারাদণ্ড উল্লেখ করেন, শুধু সেই ক্ষেত্রে স্বাভাবিক মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত আসামিকে কারা ভোগ করতে হবে।

আইনজীবীরা আপিল বিভাগের এই রায়ের পর বলেছেন, রায়ে আমৃত্যু উল্লেখ না থাকলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড মানে ৩০ বছর কারাদণ্ড। এ ক্ষেত্রে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামিরা রেয়াত সুবিধাও পাবে।

প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে আপিল বিভাগ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে এই রায় দেন। আদালত সংক্ষিপ্ত রায় দিয়েছেন। বিস্তারিত জানা যাবে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর। তবে যে আসামির মামলা কেন্দ্র করে এই রায় দেওয়া হয়েছে, সেই আতাউর রহমানের রিভিউ আবেদন নিষ্পত্তি করে তাঁর আমৃত্যু কারাদণ্ডই বহাল রেখেছেন আদালত।

গতকাল এই রায় ঘোষণার সময় আসামিপক্ষে আদালতে আইনজীবী হিসেবে যুক্ত ছিলেন খন্দকার মাহবুব হোসেন ও মোহাম্মদ শিশির মনির। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বিশ্বজিত দেবনাথ।

আদালত সংক্ষিপ্ত রায়ে বলেন, প্রাথমিকভাবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড মানে হচ্ছে দণ্ডিত ব্যক্তির স্বাভাবিক মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত পুরো সময়। আর ৪৫ ও ৫৩ ধারা যদি দণ্ডবিধির ৫৫ ও ৫৭ ধারা এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫(এ)-এর সঙ্গে মিলিয়ে পড়া হয়, তাহলে বোঝা যায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড মানে হচ্ছে ৩০ বছর। আদালত বা ট্রাইব্যুনাল যদি স্বাভাবিক মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত কারাদণ্ড দেন, সেই ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫(এ) প্রযোজ্য হবে না।

আপিল বিভাগের রায় ঘোষণার পর রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্ট সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে সংক্ষিপ্ত আদেশ দিয়েছেন। বিভিন্ন আইন, ধারা, উপধারা বিশ্লেষণ করে আদালত বলেছেন, যাবজ্জীবন মানে ৩০ বছর। যদি কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কোনো মামলায় কারো আমৃত্যু কারাদণ্ড উল্লেখ করেন, সে ক্ষেত্রে ৩০ বছরের বিধানটি হবে না। আমৃত্যু কারাদণ্ড হবে।’

খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, আজকের রায়ে আপিল বিভাগ বলেছেন, প্রাথমিকভাবে যাবজ্জীবন বলতে একজন মানুষের স্বাভাবিক জীবন যত দিন তত দিন বোঝায়। কিন্তু আইনের বিধান অনুযায়ী একজন যাবজ্জীবন আসামির সাজা হবে ৩০ বছর কারাদণ্ড। সে ক্ষেত্রে আইনের অন্যান্য রেয়াত সুবিধা পাবে। আর যদি রায়ে বলে দেওয়া হয় যে আমৃত্যু কারাদণ্ড, সে ক্ষেত্রে স্বাভাবিক মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত তাকে জেলখানায় থাকতে হবে। তিনি বলেন, ‘শুনানিকালে আমরা বলেছিলাম, বর্তমান আইনের বিধানে যাবজ্জীবন ৩০ বছর। কেননা ৩০ বছর যদি না হয় তাহলে আইনের অন্য বিধানগুলো যেমন—৩৫এ, জেলকোড—সব বাতিল হয়ে যাবে। আদালত এসব কিছু বিবেচনায় নিয়ে রায় দিয়েছেন।’ 

মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, ‘রায়ে স্পষ্ট হলো যে কোনো মামলার রায়ে কারো যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হলে তাকে ৩০ বছর কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।’ তিনি এ রায়কে ঐতিহাসিক উল্লেখ করে বলেন, ‘এত দিন যাবজ্জীবন কারাদণ্ড নিয়ে একটি বিভ্রান্তি ছিল। তার অবসান হলো এই রায়ের মধ্য দিয়ে।’  

২০০১ সালে সাভারে জামান নামের এক ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই ঘটনায় ২০০৩ সালে তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড দেন দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল। হাইকোর্টে আপিলের পর বিচারিক আদালতের দণ্ড বহাল থাকে। এর বিরুদ্ধে আপিলের পর ২০১৭ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি আসামিদের মৃত্যুদণ্ড মওকুফ করে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন সর্বোচ্চ আদালত। মামলার ৯২ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় ২০১৭ সালের ২৪ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়। রায়ে বলা হয়, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অর্থ আমৃত্যু কারাদণ্ড। এ অবস্থায় আতাউর রহমানসহ আসামিরা রিভিউ আবেদন করেন। এই রিভিউ আবেদনের ওপর রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে শুনানি করেছিলেন প্রয়াত মাহবুবে আলম। আসামিপক্ষে ছিলেন খন্দকার মাহবুব হোসেন।

শুনানিকালে আপিল বিভাগ উভয় পক্ষের আইনজীবী ছাড়াও অ্যামিকাস কিউরি (আদালতের বন্ধু) হিসেবে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ চার আইনজীবী সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এ এফ হাসান আরিফ, ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ আবদুর রেজাক খান, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ব্যারিস্টার রোকনউদ্দিন মাহমুদ ও সমিতির সভাপতি (বর্তমান অ্যাটর্নি জেনারেল) এ এম আমিন উদ্দিনের যুক্তি শোনেন। এই শুনানি শেষে যেকোনো দিন রায় ঘোষণার জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখার আদেশ দেন গত বছর ১১ জুলাই। এ অবস্থায় ওই রিভিউ আবেদনের ওপর আপিল বিভাগ গত ২৪ নভেম্বর আদেশে রায়ের দিন নির্ধারণ করেন পয়লা ডিসেম্বর। গতকাল নির্ধারিত দিনে সংক্ষিপ্ত রায় দিলেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা