kalerkantho

রবিবার। ৩ মাঘ ১৪২৭। ১৭ জানুয়ারি ২০২১। ৩ জমাদিউস সানি ১৪৪২

এক মাকে বাঁচাতে অন্য মাকে ‘হত্যা’

চার চিকিৎসককে ধরতে পুলিশ মাঠে

কিডনি অপারেশনের কথা বলে কৌশলে বাড়ি থেকে ডেকে আনা হয়েছিল রোগীকে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৯ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



চার চিকিৎসককে ধরতে পুলিশ মাঠে

নিজের মায়ের কিডনি প্রতিস্থাপনের কৌশল হিসেবে ডা. মামুন রোগীকে বাড়ি থেকে অপারেশনের কথা বলে ডেকে নিয়ে এসেছিলেন। একই কৌশলের অংশ হিসেবে রোগীর পরিচিত এক চিকিৎসককে ওই ইউনিটের ডিউটি থেকে সরিয়ে অন্যত্র পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। অন্যদিকে কিডনি কেটে নেওয়ার পরও আত্মরক্ষার কৌশল হিসেবে স্বেচ্ছায় মুচলেকার নাটক সাজিয়েছিলেন ডা. হাবিবুর রহমান দুলাল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) অপারেশনের নামে এক রোগীর দুই কিডনি কেটে নিয়ে ওই হাসপাতালে একজন চিকিৎসকের মায়ের শরীরে প্রতিস্থাপন, পরে মূল রোগী মারা যাওয়ায় গত শুক্রবার রাজধানীর শাহবাগ থানায় মামলার পর বেরিয়ে আসে এমন সব চাঞ্চল্যকর তথ্য। ঘটনাটি পুরনো হলেও গতকাল শনিবার দিনভর তা আবার আলোচনায় উঠে আসে।

ওই মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে বিএসএমএমইউয়ের ইউরোলজি বিভাগের অধ্যাপক হাবিবুর রহমান দুলালকে। অন্য তিন আসামি হলেন একই বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ফারুক হোসেন, চিকিৎসক মোস্তফা কামাল ও আল মামুন। মামলার বাদী ও  রোগীর ছেলে চলচ্চিত্র নির্মাতা রফিক সিকদারের দাবি, অপারেশনের কাজে নিয়োজিত অধ্যাপক ডা. দুলাল ও অন্যান্য আসামি পরিকল্পিতভাবে তাঁর মায়ের ভালো কিডনি কেটে নিয়েছেন। এর ফলে তাঁর মা ২০১৮ সালের ৩১ অক্টোবর মারা যান। মৃত্যুর দুই বছর পর ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন হাতে পেয়ে রফিক সিকদার মামলাটি করেন।

এদিকে মামলার পর এজাহারভুক্ত চার চিকিৎসককে গ্রেপ্তার করতে অভিযান শুরু করেছে পুলিশ। তবে গতকাল শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত তাঁদের গ্রেপ্তার করা যায়নি। 

এ ব্যাপারে ঢাকা মহানগর পুলিশের রমনা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) সাজ্জাদুর বলেন, মামলার পর তদন্ত চলছে। আসামিদের গ্রেপ্তারের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।

এ ব্যাপারে শাহবাগ থানার ওসি মামুন-অর-রশিদ বলেন, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে রওশন আরার ময়নাতদন্ত হয়েছিল। এ ঘটনায় করা মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে পূর্বপরিকল্পিতভাবে খুন করে আলামত নষ্ট এবং সহযোগিতার অভিযোগ এনেছেন বাদী। মামলার এজাহারের অভিযোগ অনুযায়ী তদন্ত চলছে এবং আমামিদের ধরার চেষ্টা চলছে। 

অতিসম্প্রতি দেওয়া ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রওশন আরার সব অঙ্গ ড্যামেজ ছিল। তা ছাড়া তাঁর দুটি কিডনিই স্যার্জিক্যালি অপসারণ করা হয়েছিল বলেও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসে।

মামলার এজাহারে রফিক সিকদার বলেছেন, ‘২০১৮ সালের ২৭ জুন বেলা সাড়ে ১২টার দিকে আমার মায়ের বাম কিডনিতে ব্যথা শুরু হয়। তাই তাঁকে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। পরের দিন ২৮ জুন সেখানকার ডা. ইউসুফ আলী আমার মা রওশন আরাকে (৫৫) পরীক্ষা করে দেখেন, তাঁর ডান কিডনি স্বাভাবিক এবং বাম কিডনিটি এফেকটেড অবস্থায় আছে। ডা. ইউসুফ ওই বছরের ১ জুলাই উন্নত চিকিৎসার জন্য মাকে বিএসএমএমইউতে পাঠান। ওই দিনই বিএসএমএমইউয়ে অধ্যাপক ডা. হাবিবুর রহমান দুলালের অধীনে মাকে কেবিন ব্লকের ৩১৩ নম্বর রুমে ভর্তি করি। পরে আমার মায়ের শরীরের পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু হয়। কেথেটারের মাধ্যমে অসুস্থ বাম কিডনির ইনফেকশনজনিত ইউরিন অপসারণের মাধ্যমে পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে যায়। পরে ওই চিকিৎসকের নির্দেশে ১৫ জুলাইয়ের পরীক্ষায়ও মায়ের ডান কিডনি স্বাভাবিক ছিল। এরপর ২৮ আগস্ট বিএসএমএমইউয়ে মায়ের অপারেশনের জন্য বিভিন্ন পরীক্ষা করি। ওই দিনই বায়োকেমিস্ট্রি প্রতিবেদনে দেখা যায়, আমার মায়ের কিডনির কার্যকারিতা স্বাভাবিক। এ ছাড়া অন্যান্য পরীক্ষায়ও মায়ের কিডনির অবস্থা ভালো ছিল। ওই বছরের ৫ সেপ্টেম্বর আমার মায়ের ক্ষতিগ্রস্ত বাম কিডনি অপসারণের জন্য আসামিরা মাকে অপারেশন থিয়েটারে নেন। ওই রাতে সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক আমাকে বলেন, মায়ের ডান কিডনি কাজ করছে না এবং তাঁকে আইসিইউয়ে নিতে হবে। বিএসএমএমইউয়ে আইসিইউ না পেয়ে মগবাজারে একটি হাসপাতালে  নেওয়া হয়। সেখান থেকে ল্যাবএইডে পরীক্ষা করতে পাঠানো হলেও মায়ের দুই কিডনির কোনোটিই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। এরপর অন্য একটি হাসপাতালে পরীক্ষা করালে চিকিৎসকরা একই মত দেন। চিকিৎসকরা তখন বলেছিলেন, আমার মায়ের দুটি কিডনিই অপসারণ করা হয়েছে।’

রফিক সিকদার জানান, ওই ঘটনার পর তিনি অধ্যাপক দুলালের কাছে ঘটনা জানতে চান। তিনি সঠিক জবাব দেননি। এরপর প্রতিবাদ করতে থাকেন তিনি। ২০১৮ সালের ১ অক্টোবর অধ্যাপক দুলাল তাঁর সঙ্গে লিখিতভাবে দায় স্বীকার ও চুক্তি করেন। ওই চুক্তি অনুযায়ী তাঁর মাকে নতুন কিডনি স্থাপন করার দায়িত্ব নেন। সব খরচও তিনি বহন করার লিখিত চুক্তি করেন; কিন্তু তা না করে সময়ক্ষেপণ করতে থাকেন।

এদিকে রওশন আরার পরিবার শুরু থেকেই অভিযোগ করে আসছিল, বিএসএমএমইউয়ের ইউরোলজি বিভাগের কয়েকজন চিকিৎসক রওশন আরার দুটি কিডনি কেটে বিক্রি করে দিয়েছেন। রওশনকে যখন ভর্তি করা হয়েছিল তখন সেখানে ওই হাসপাতালেরই চিকিৎসক মামুনের মাকে ভর্তি করা হয়। তাঁর দুটি কিডনি নষ্ট ছিল। চিকিৎসার পর ডা. মামুনের মা এখন পুরোপুরি সুস্থ।

রফিক বলেন, ‘যখন আমার মায়ের অপারেশনের সিডিউল পড়ে তখন ওই ইউনিটে আমাদের গ্রামের এক পরিচিত চিকিৎসক ডিউটিতে ছিলেন। হঠাৎ করেই অপারেশনের আগে আগে তাঁকে অন্য ইউনিটে সরিয়ে দেওয়া হয়। ফলে আমাদের সন্দেহ হচ্ছে, যাতে কিডনি চুরির ঘটনা কেউ টের না পায় সে জন্যই কৌশলের অংশ হিসেবে ওই চিকিৎসককে অন্য জায়গায় ডিউটিতে পাঠানো হয়।’

অভিযুক্ত ডা. হাবিবুর রহমান দুলালের সঙ্গে কথা বলার জন্য ফোন করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। আরেক অভিযুক্ত ডা. মামুনের ফোনে কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। একপর্যায়ে তিনি ফোনটি বন্ধ করে দেন।

এ ব্যাপারে বিএসএমএমইউয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. কনক কান্তি বড়ুয়া বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আমরা আগে একবার অভিযোগ পেয়েছিলাম। তখন এক দফা তদন্তের ব্যবস্থাও করা হয়েছিল। কিন্তু বাদীর মায়ের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন সম্পর্কে আমরা কিছু জানতাম না। এখন মামলা হয়েছে। আমরাও আবার তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।’

মন্তব্য