kalerkantho

রবিবার। ৩ মাঘ ১৪২৭। ১৭ জানুয়ারি ২০২১। ৩ জমাদিউস সানি ১৪৪২

বাসযোগ্য ঢাকা গড়তে প্রয়োজন বাস্তবমুখী ড্যাপ

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৯ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বাসযোগ্য ঢাকা গড়তে প্রয়োজন বাস্তবমুখী ড্যাপ

রাজউকের আওতায় এক হাজার ৫২৮ বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত এলাকা নিয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন সরকার ২০১০ সালের ১০ জুন ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) (২০১০-২০১৫) গেজেট আকারে প্রকাশ করে। পরবর্তী সময়ে ড্যাপে অসংখ্য অসংগতি ও অবাস্তবমূলক প্রস্তাবনা আসায় স্থানীয় জনসাধারণের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে এলে তিনি জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে পরামর্শ, ওয়েবসাইট ও অন্যান্য মাধ্যম থেকে পাওয়া মতামত এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের অভিমত পর্যালোচনা করে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ প্রণীত ড্যাপ চূড়ান্ত করতে তৎকালীন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রীকে আহ্বায়ক করে সাত মন্ত্রী ও আট সচিবকে সমন্বয় করে ড্যাপসংক্রান্ত রিভিউ কমিটি গঠন করেন। ওই কমিটি পর্যায়ক্রমে জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় জনসাধারণ থেকে পাওয়া আবেদন পর্যালোচনা এবং বিভিন্ন অসংগতি দূরীকরণের সুপারিশ করে। পরবর্তী সময়ে খণ্ড খণ্ড আকারে গেজেট প্রকাশিত হয়। এরই মধ্যে রাজউক ২০১৬-২০৩৫ সালের মেয়াদের জন্য খসড়া রিভাইজড ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যান প্রণয়ন করে এবং তা জনসাধারণের মতামতের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।

রাজউক সূত্রে জানা যায়, ওই খসড়া প্রণীত ড্যাপের ওপর ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও পেশাজীবী সংগঠন থেকে প্রায় সাত হাজার মতামত অনলাইনে এবং লিখিত আকারে জমা নেওয়া হয়। ঢাকা শহরের আয়তন গোটা দেশের আয়তনের ১ শতাংশ অথচ দেশের এক-দশমাংশ জিডিপির জোগান দেয়। ফলে ঢাকা শহর হচ্ছে এই দেশের উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি। ঢাকা শহরের বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় দুই কোটি অনুমিত প্রক্ষেপণ অনুযায়ী ২০৪১ সালে জনসংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় তিন কোটি ৫০ লাখ। এই জনসংখ্যার জন্য যেমন পরিকল্পিত আবাসন দরকার, তেমনি প্রয়োজন কর্মসংস্থানের জোগান। অন্যথায় ক্রমবর্ধমান জিডিপিতে বিরূপ প্রভাব পড়বে। মানুষের অন্যতম মৌলিক চাহিদা বাসস্থান নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোক্তাদের অবদান অতুলনীয়। আবাসনশিল্পে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকা এবং জাতীয় উন্নয়নে এই খাতের অবদান ২১ শতাংশ। আবাসন খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে ২৭০টি পশ্চাৎ শিল্প জড়িত রয়েছে, যার মাধ্যমে দেশের প্রায় আড়াই কোটি মানুষের রুটি-রুজি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত। অন্যদিকে দেশের গার্মেন্টশিল্পও লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানসহ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সহায়তা করছে, যার ওপর ভিত্তি করে আজকের বাংলাদেশ উন্নয়নের মহাসড়কে রয়েছে। ঢাকা বিশ্বের অন্যতম জনবহুল শহর বাসযোগ্যতার মানদণ্ডে ঢাকার অবস্থান নিচের দিকে, যেখানে একটি শহরের মোট আয়তনের ২০-২৫ শতাংশ জায়গা রাস্তা কিংবা পরিবহন যোগাযোগের জন্য থাকা প্রয়োজন সেখানে ঢাকার বিদ্যমান রাস্তার পরিমাণ মোট আয়তনের প্রায় ৬ শতাংশ।

অন্যদিকে ঢাকা শহরের বিদ্যমান জনসংখ্যার অনুপাতে স্কুল, কলেজ, খেলার মাঠ, পার্ক, পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা অপ্রতুল। যানজট ও জলজট আজ নিত্যদিনের সঙ্গী। এই সমস্যা নিরসনের লক্ষ্যে রিভাইজড ডিটেইল্ড প্ল্যানে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব থাকা প্রয়োজন। যদিও খসড়া রিভাইজড ড্যাপে এ বিষয়ে কিছু প্রস্তাবনা দেওয়া আছে, কিন্তু সেই প্রস্তাবনাগুলো সব সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়ে যথাসময়ে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় ঢাকা শহরকে বাসযোগ্য হিসেবে গড়ে তোলা দুরূহ ব্যাপার হবে। জলাবদ্ধতা নিরসনের লক্ষ্যে সিএস, আরএস এবং মহানগর জরিপে চিহ্নিত খালগুলোকে উদ্ধারের বিষয়ে জোরালো সুপারিশ থাকতে হবে। এ ছাড়া বিভিন্ন অঞ্চলে জলকেন্দ্রিক পার্ক নির্মাণ করতে হবে।

সরেজমিন পরিদর্শন করে কৃষিজমি ও জলাশয়কে চিহ্নিত করতে হবে, যাতে জনসাধারণ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। আগের মতো বসতভিটাকে কৃষি কিংবা জলাশয় হিসেবে চিহ্নিত করা হলে আবার জনরোষ সৃষ্টির শঙ্কা থাকতে পারে। কেন্দ্রীয় ঢাকার ওপর চাপ কমাতে এবং গোটা ঢাকার সুষম উন্নয়নের লক্ষ্যে এলাকাভিত্তিক জনঘনত্ব জোনিং কিংবা ভবনের উচ্চতা বিষয়ক সুপারিশমালা রিহ্যাব, বিএলডিএ, সিভিল এভিয়েশন অথরিটি এবং ঢাকার নির্বাচিত মেয়রদের সঙ্গে অংশগ্রহণমূলক পদ্ধতিতে আলোচনার মাধ্যমে আরো পরিশীলিত ও সংশোধন করা প্রয়োজন। বাস্তবতাকে প্রাধান্য না দিয়ে তাত্ত্বিক ও পুথিগত বিদ্যার ওপর ভর করে যেসব মতামত বিভিন্ন মাধ্যমে দেওয়া হচ্ছে, সেই মতামতকে প্রাধান্য দিয়ে যদি কাল্পনিক ও অবাস্তব পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয় তা সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। প্রধানমন্ত্রী দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে আরো শক্তিশালী করতে প্রায় ১০০টির মতো সরকারি ও বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের ঘোষণা দিয়েছেন, যা পুরো দেশের সুষম উন্নয়নের জন্য একটি মাইলফলক উদ্যোগ। প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে টেকসই ও পরিবেশগত দিক মাথায় রেখে অর্থনৈতিক দিক বিবেচনায় নিয়ে প্রকৃত স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা করে একটি বাস্তবসম্মত ও জনকল্যাণমুখী ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যান চূড়ান্তকরণ করা। তবে শুধু ঢাকা শহরকে নিয়ে পরিকল্পনা করলে চলবে না, এখনই পুরো বাংলাদেশকে নিয়ে পরিকল্পনা প্রণয়ন করা উচিত।

মন্তব্য