kalerkantho

সোমবার। ৪ মাঘ ১৪২৭। ১৮ জানুয়ারি ২০২১। ৪ জমাদিউস সানি ১৪৪২

খালের ওপর কাগুজে সেতু

► বরগুনার আমতলীর হলদিয়া ইউনিয়নে ১২ বছর আগে ৯ সেতু নির্মাণ না করেই বিল তোলা হয়
► জড়িতদের শাস্তি দাবি

রফিকুল ইসলাম, আমতলী (বরগুনা) থেকে ফিরে   

২৯ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



খালের ওপর কাগুজে সেতু

কাজির গরু কিতাবে আছে গোয়ালে নেই—চিরচেনা এ প্রবাদের বাস্তবতা মিলেছে বরগুনার আমতলীতে। দক্ষিণের এই উপজেলার এক ইউনিয়নেই ৯টি সেতুর খোঁজ মিলেছে শুধু কাগজেই। বাস্তবে কোনো সেতুর চিহ্ন সেখানকার স্থানীয় লোকজনও কখনো দেখেনি। আমতলী উপজেলা প্রকৌশলীর প্রতিবেদনে শুধু হলদিয়া ইউনিয়নেই কমপক্ষে ৯টি সেতু নির্মাণের কথা বলা হয়। স্থানীয় লোকজন প্রকল্পের স্থান নিশ্চিত করলেও সেখানে সেতু নির্মাণ করা হয়েছে শুনে তাদের ‘চক্ষু চড়কগাছ’। এই কাগুজে সেতুগুলো বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের সময়কার। রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে বিএনপির তৎকালীন কয়েকজন নেতা কাজ না করেই বিল তুলে নিয়েছিলেন। এদিকে সেতু লোপাটের সঙ্গে জড়িতদের শাস্তির আওতায় আনার দাবি তুলেছে এলাকাবাসী। 

হলদিয়া ইউনিয়নের পূর্ব চিলা রামজীর হাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এই বিদ্যালয়ের প্রবেশপথে রয়েছে প্রায় ৬৫ ফুট (২০ মিটার) দীর্ঘ খাল। খালটির ওপর প্রায় ৪১ লাখ টাকা ব্যয়ে ৮২ ফুট (২৫ মিটার) দীর্ঘ সেতু নির্মাণ করা হয়। ঠিকাদার আলমাস খান ২০০৯ সালের ৩০ জুন শতভাগ কাজ শেষ করে বরাদ্দের টাকা তুলে নেন। ২০১০ সালের অক্টোবরে উপজেলা প্রকৌশল অফিসে কাজের অগ্রগতির তালিকায় সেতুটি স্থান পায়। সেতুর কাজ শতভাগ হয়েছে বলে প্রকৌশলী তাঁর প্রতিবেদনে উল্লেখও করেন। সেই প্রতিবেদনের অনুলিপি কালের কণ্ঠ’র হাতেও এসেছে। তবে কালের কণ্ঠ অনুসন্ধান চালিয়ে সেতুর অগ্রগতির প্রতিবেদনের সঙ্গে বাস্তবতা খুঁজে পায়নি। পূর্ব চিলা রামজীর হাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে দুই কিলোমিটারে আরো তিনটি কাগুজে সেতু পাওয়া যায়। এ ছাড়া হলদিয়ার তিনটি গ্রামে আরো চারটি সেতুর বিষয়ে প্রকৌশলীর প্রতিবেদনে উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে সেখানে সেতুর অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

সেতু আছে, সেতু নেই : হলদিয়া ইউনিয়নের উত্তর রাওগাঁ গ্রাম। সেই গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে সুগন্ধি (বাঁশবুনিয়া) খাল। পানি নিয়ন্ত্রণের জন্য সেই খালে সরকারিভাবে স্লুইস গেট নির্মাণ করা হয়েছে। স্লুইস গেটের উত্তরে রয়েছে সরকারি রাওগাঁ আবাসন। আবাসনের দুই দিকে খালের ওপর দুটি সেতুর বিষয়ে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে একটির অস্তিত্ব থাকলেও অন্যটি নিয়ে রয়েছে ধোঁয়াশা। অগ্রগতির প্রতিবেদনে উত্তর রাওগাঁ আবাসনের পশ্চিম দিকে নুরুল হকের বাড়ির সামনে একটি সেতুর কথা উল্লেখ রয়েছে। ঠিকাদার শহীদুল ইসলাম মৃধা এক কোটি ১৪ লাখ টাকা চুক্তিমূল্যে ২০০৮ সালের ১ অক্টোবর সেতুটির নির্মাণকাজ শেষ করেন। সরেজমিনে গিয়ে ওই সেতুরও অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। এমনকি নুরুল হক নামের কোনো ব্যক্তি আবাসনের আশপাশে বাস করতেন তা-ও স্থানীয় লোকজন নিশ্চিত করতে পারেনি। ধারণা করা হচ্ছে, নুরু মুসল্লির বাড়ির সামনের সেতু দেখিয়ে কল্পিত নুরুল হকের বাড়ির সামনের সেতুটি লোপাট করা হয়েছে।

হলদিয়ার ইউপি সদস্য ছিদ্দিকুর রহমান হাওলাদার বলেন, উত্তর রাওগাঁ আবাসনের দক্ষিণ দিকে প্রায় আধাকিলোমিটার দূরে নুরু মুসল্লির বাড়ি। ওই বাড়ির সামনে একটা সেতু আছে। সুগন্ধি বাজারের পাশেই একটি গার্ডার ব্রিজ রয়েছে। এ ছাড়া আবাসনের আশপাশে বাঁশবুনিয়া খালের ওপারে আর কোনো সেতু নেই। শুধু তা-ই নয়, আবাসনের এক কিলোমিটারের মধ্যে নুরুল হক নামের কেউ নেই।      

আরো কাগুজে সেতু : পূর্ব চিলা রামজীর হাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কিছুটা দূরের গ্রাম দক্ষিণ তক্তাবুনিয়া। গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে হাইচাবুনিয়া খাল। খালের পারেই ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে নির্মিত মোল্লাপাড়া আবাসন। সরকারি সেই আবাসনে যোগাযোগ স্থাপনের জন্য হাইচাবুনিয়া খালের ওপর ১১৫ ফুট (৩৫ মিটার) দীর্ঘ লোহার সেতু তৈরি করা হয়েছে। ঠিকাদার নিজাম উদ্দীন প্রায় ৬৪ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০০৯ সালের ১৫ জুলাই সেতুটির নির্মাণকাজ শেষ করেন। প্রকৌশলী তাঁর অগ্রগতি প্রতিবেদনে সেতুর কাজ শতভাগ শেষ হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন, কিন্তু আবাসনের আশপাশের এক কিলোমিটারের মধ্যে কোনো সেতুই খুঁজে পাওয়া যায়নি।   

দক্ষিণ তক্তাবুনিয়া গ্রামে আরেকটি সরকারি আবাসন রয়েছে। গ্রামের নাম অনুসারে সেটি দক্ষিণ তক্তাবুনিয়া আবাসন। আবাসনের উত্তর-পূর্ব কোণ ঘেঁষে বাঁশবুনিয়া খাল বয়ে গেছে। আবাসনে যোগাযোগ স্থাপনের জন্য ওই খালের ওপর প্রায় ৩০০ ফুট (৯১ মিটার) দৈর্ঘ্যের লোহার তৈরি সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। ঠিকাদার বাদল খান এক কোটি ৬১ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০০৮ সালের ১ অক্টোবর সেতুটির নির্মাণকাজ শেষ করেন। প্রকৌশলী তাঁর অগ্রগতি প্রতিবেদনে সেতুটির কাজ শতভাগ হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন, কিন্তু আবাসনের আশপাশের এক কিলোমিটারের মধ্যে কোনো সেতুই খুঁজে পাওয়া যায়নি।   

একইভাবে কাগজে আছে বাস্তবে নেই—এমন আরো পাঁচটি সেতুর ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া গেছে। সরেজমিনে হলদিয়া ইউনিয়নের পশ্চিম চিলা গ্রামের আশ্বেদ মোল্লার বাড়ির সামনে গিয়ে কোনো সেতু দেখা যায়নি। যদিও প্রকৌশলীর প্রতিবেদনে ওই সেতুর কাজ শতভাগ হয়েছে বলে দেখানো হয়েছে। রাওগাঁ আবাসনের পাশ দিয়ে বয়ে চলা কেওড়াবুনিয়া খালের ওপর নির্মিত ৪০ মিটার দীর্ঘ ওই সেতু খুঁজে পাওয়া যায়নি। চিলা গ্রামের মোসলেম গাজীর বাড়ির সামনের সেতুটির কাজ শতভাগ শেষ হয়েছে বলে দেখানো হয়েছে। বাস্তবে সেখানে সেতু দেখা যায়নি।

সেতু লুটপাটের কারিগর : সেতুগুলোর মধ্যে সাতটির ঠিকাদারি কাজ পেয়েছেন চারজন ঠিকাদার। তাঁরা সেতু নির্মাণ করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। হলদিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম মৃধা দুটি সেতু নির্মাণ করেন। চেয়ারম্যানের ফুফাতো ভাই নিজাম উদ্দীন তিনটি কাজের ঠিকাদারি পেয়েছিলেন। পাশের চাওড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আকতারুজ্জামান ওরফে বাদল খান একটি কাজের ঠিকাদারি পান।

বাদল খানের ছোট ভাই আলমাস খান। তিনি চাওড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি। তিনিও একটি কাজের ঠিকাদারি পেয়েছিলেন। স্থানীয় আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতারা বলছেন, চেয়ারম্যান শহীদুল ইসলাম মৃধা ও বাদল খান, নিজাম উদ্দীন, আলমাস খান একসময় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। সেতুগুলো বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের সময়কার। রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে বিএনপির তৎকালীন ওই চার নেতা কাজ না করেই বিল তুলে নিয়েছেন। তাই কাগুজে সেতুগুলো খুঁজে পাওয়া যায়নি।

ঠিকাদাররা যা বলছেন : হলদিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম মৃধা দুটি সেতু নির্মাণ করেছেন। তিনি বলেন, পূর্ব চিলা রামজীর হাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ বেশ কয়েকটি সেতুর নির্ধারিত স্থান পরিবর্তন করা হয়েছে। তাই সেতুগুলো নির্ধারিত স্থানে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তবে কোথায় সেতুগুলো নির্মাণ করা হয়েছে, তা-ও তিনি জানেন না।

ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আকতারুজ্জামান ওরফে বাদল খান বলেন, ‘দক্ষিণ তক্তাবুনিয়া আবাসন লাগোয়া বাঁশবুনিয়া খালের ওপর ৯১ মিটার দীর্ঘ সেতু নির্মাণের ঠিকাদারি কাজ পেয়েছিলাম। অর্থসংকটের কারণে কাজটি অন্য এক ঠিকাদারের কাছে বিক্রি করেছি। সেখানে সেতু নির্মিত হয়েছে কি না, তা আমার জানা নেই।’ 

প্রকৌশলীরা যা বলছেন : আমতলীর উপসহকারী প্রকৌশলী সোহরাফ হোসেন বলেন, প্রায় এক যুগ আগে সেতুগুলো নির্মিত হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে সেতুগুলো উধাও হয়ে যেতে পারে না।

সেতুর কাজ তদারকির দায়িত্বে থাকা আমতলীর প্রকৌশলী আতিয়ার রহমান অবসরে গেছেন। মুঠোফোনে তিনি বলেন, প্রায় এক যুগ আগে সেতুগুলো নির্মিত হয়েছে। প্রকল্প অনুযায়ী কাজগুলো করা হয়েছে। প্রকল্পে উল্লেখ করা স্থানগুলোর পাশেই সেতুগুলো নির্মাণ করা হয়েছে। এমনও হতে পারে, নির্ধারিত স্থানের একটু দূরেই সেতুগুলো নির্মাণ করা হয়েছে। তাই ঘটনাস্থলে সেতুগুলো দেখা যাচ্ছে না। তা ছাড়া এই স্বল্প সময়ের মধ্যে সেতুগুলো নাই হয়ে যেতে পারে না।

এলজিইডি বরগুনার নির্বাহী প্রকৌশলী ফোরকান আহমেদ খানের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। এমনকি খুদে বার্তা পাঠালেও তিনি কোনো সাড়া দেননি। তবে তাঁর দপ্তরের এক প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সেতু নির্মাণ না করেই তার অর্থ লোপাট করবে, এমনটি হওয়ার নয়। কারণ নির্মাণকাজ থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত নির্বাহী প্রকৌশলী কাজ তদারকি করেন। তাই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চাইলেও সেতু না করে টাকা তুলে নিতে পারে না।

মন্তব্য