kalerkantho

শনিবার। ২ মাঘ ১৪২৭। ১৬ জানুয়ারি ২০২১। ২ জমাদিউস সানি ১৪৪২

উচ্চ আদালতের নির্দেশনা পাত্তাই দিচ্ছে না কেউ

শরীফুল আলম সুমন ও বাহরাম খান   

২৮ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



উচ্চ আদালতের নির্দেশনা পাত্তাই দিচ্ছে না কেউ

দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থলে যৌন নিপীড়নবিরোধী কমিটি করার জন্য ২০০৯ সালে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা থাকলেও এর বাস্তবায়ন নেই। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি দপ্তর, বেসরকারি সংস্থা (এনজিও), শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন নিপীড়নবিরোধী কমিটি গঠন ও এর কার্যকারিতার খবর নিতে গিয়ে হতাশ হতে হয়েছে। কারণ বেশির ভাগ কর্মক্ষেত্রেই এখন পর্যন্ত কমিটি গঠন হয়নি। হাতে গোনা যে কটি প্রতিষ্ঠানে কমিটি গঠন করা হয়েছে, সেখানেও তা কার্যকর নয়। অনেক আগে একবার কমিটি করা হলেও পুনর্গঠন করা হয়নি। অনেক প্রতিষ্ঠানে নিয়মানুযায়ী হয়নি কমিটি।

আদালতের নির্দেশনায় বলা হয়েছিল, প্রত্যেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থলে যৌন নিপীড়নবিরোধী পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করতে হবে। এর প্রধান হবেন একজন নারী। ওই কমিটিতে একাধিক নারী সদস্য থাকবেন। এর মেয়াদ হবে দুই বছর। প্রতিবছর কমিটি দুইবার সভা করবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে হল, অনুষদ ও ইনস্টিটিউটভিত্তিক আলাদা কমিটি করতে হবে। দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থলে অভিযোগ কেন্দ্র থাকবে। পাঁচ সদস্যের কমিটি ওই কেন্দ্র পরিচালনা করবে। কমিটি যৌন হয়রানির কোনো অভিযোগ পেলে তদন্ত ও অনুসন্ধানসাপেক্ষে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পুলিশকে বলবে। এরপর দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী অপরাধের ধরন ও মাত্রা বুঝে বিচার বিভাগ যথাযথ ব্যবস্থা নেবে।

বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়ন, মানবাধিকার নিয়ে বরাবরই সোচ্চার দেশি-বিদেশি এনজিওগুলো। কিন্তু কালের কণ্ঠ’র হাতে আসা তথ্য বলছে, নিজেদের প্রতিষ্ঠানেই যৌন হয়রানি রোধে আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী কমিটি গঠন করা হয়নি। এ ছাড়া স্কুল-কলেজগুলোতে ওই কমিটি নেই বললেই চলে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কমিটি আছে নামকাওয়াস্তে। বেশির ভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একবার কমিটি গঠন করা হলেও তা দীর্ঘদিনেও পুনর্গঠন হয়নি বা কার্যকারিতা নেই।

এনজিও ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, মোট দুই হাজার ৫২০টি দেশি-বিদেশি এনজিওর মধ্যে এখন পর্যন্ত কমিটি গঠন হয়েছে মাত্র পাঁচটি এনজিওতে। সেগুলো হচ্ছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি), বাংলাদেশ ইয়ুথ লিডারশিপ সেন্টার, সেভ দ্য চিলড্রেন, ব্র্যাক ও নারীপক্ষ। আরো কয়েকটি এনজিওর কমিটি থাকলেও তারা সেই তথ্য এখনো ব্যুরোকে জানাতে পারেনি বলে জানা যায়।

এনজিও ব্যুরোর মহাপরিচালক রাশেদুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করতে এক বছর আগে আমরা সব এনজিওকে চিঠি দিয়েছিলাম। কিন্তু এটা খুবই দুঃখজনক যে বেশির ভাগ এনজিও এখনো কমিটি গঠন করেনি। যারা এখনো কমিটি গঠন করেনি, আমরা ফের তাদের চিঠি দিচ্ছি। তবে করোনার কারণে সব কিছু ওলটপালট হয়ে গেছে। অনেক অফিস বন্ধ। হয়তো সে কারণে এনজিওগুলো কমিটি গঠন করতে পারেনি।’

সরকারের ৫৮টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে সচিবালয়ে থাকা প্রায় ৪৫টি দপ্তরের বেশির ভাগে কমিটি গঠন করা হয়নি। ১০টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগে খোঁজ নিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে কমিটি গঠনের তথ্য পাওয়া গেছে। বাকি সাতটিতেই কমিটি গঠন হয়নি।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) রমা রানী রায় কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এসংক্রান্ত কোনো নির্দেশনা আমরা পেয়েছি বলে মনে পড়ছে না। তবে আমি খোঁজ নিয়ে দেখছি। নির্দেশনা থাকলে অবশ্যই কমিটি গঠন করা হবে।’

পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন ও বাজেট) নাসরীন আক্তার চৌধুরী বলেন, ‘যৌন নিপীড়ন বিরোধী কমিটি এখনো আমাদের বিভাগে করা হয়নি। তবে কমিটি করা অবশ্যই দরকার। আমরা শিগগিরই এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেব।’ যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (প্রশাসন) ফাইজুল কবীর বলেন, তাঁদের মন্ত্রণালয়ে কমিটি গঠনের কাজ চলছে, দ্রুত কমিটি গঠন করা হবে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ইতি রানী পোদ্দার জানান, ‘কমিটি আছে কি না আমার জানা নেই। হাইকোর্টের নির্দেশনা অবশ্যই পালনীয়। যদি কমিটি না থাকে তাহলে আমরা এ বিষয়ে উদ্যোগ নেব।’

স্কুল-কলেজে যৌন নিপীড়ন বিরোধী কমিটি আছে কি না সে ব্যাপারে তথ্য পাওয়া যায়নি মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তরে। সব বিশ্ববিদ্যালয়ে কমিটি আছে কি না সেটাও জানা যায়নি। তবে বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে কমিটি থাকলেও এর কার্যকারিতার তেমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এমনকি অনেক বিশ্ববিদ্যালয় শুরুর দিকে একবার কমিটি গঠন করলেও নিয়মানুযায়ী তা আর পুনর্গঠন করেনি।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) সদস্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আলমগীর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যৌন নিপীড়ন বিরোধী কমিটি আছে। কিন্তু কমিটিগুলো কী কাজ করছে সে ব্যাপারে যাতে প্রতি তিন মাস পর পর ইউজিসিতে প্রতিবেদন পাঠানো হয় সে চেষ্টা আমরা করছি। এ জন্য আমরা সব বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিটির প্রধানদের নিয়ে একটি কর্মশালা করারও পরিকল্পনা করেছিলাম। কিন্তু করোনার কারণে সম্ভব হয়নি। পরিস্থিতির উন্নতি হলে আমরা এ ব্যাপারে কর্মশালা করে তিন মাস পর পর সব তথ্য নিব।’

২০১৮ সালে অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ, সুপ্রিম কোর্টের ২০০৯ সালের নির্দেশনার প্রয়োগ ও কার্যকারিতা’ শীর্ষক একটি গবেষণা চালায়। তাতে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩০ জন নারী শিক্ষার্থীর সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। সেখানে দেখা যায়, শিক্ষাক্ষেত্রে যৌন নিপীড়ন রোধে কমিটি গঠনের কথা জানেন না ৮৪ শতাংশ এবং আদালতের নির্দেশনার কথা জানেন না ৮৭ শতাংশ শিক্ষার্থী। আর ওই নির্দেশনার কথা কেবল শুনেছেন ১৩ শতাংশ শিক্ষার্থী। এ ছাড়া কর্মক্ষেত্রে কমিটি গঠনে আদালতের নির্দেশনা সম্পর্কে জানে না ৬৪.৫ শতাংশ এবং নির্দেশনার কথা জানে কিন্তু বিস্তারিত জানা নেই ১৪ শতাংশের। গবেষণায় তিনটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে মাত্র একটিতে যৌন নিপীড়ন রোধে কমিটি থাকার তথ্য মেলে।

মন্তব্য