kalerkantho

শনিবার। ২ মাঘ ১৪২৭। ১৬ জানুয়ারি ২০২১। ২ জমাদিউস সানি ১৪৪২

নতুন ঢেউয়ে রোগীর ত্রাহি

তৌফিক মারুফ   

২৮ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



নতুন ঢেউয়ে রোগীর ত্রাহি

দেশে কিছুদিন ধরে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বাড়ছে। পাশাপাশি হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের কাছেও রোগীর ভিড় বাড়তে শুরু করেছে। এর প্রভাব পড়েছে করোনা চিকিৎসায় গত কয়েক মাস ধরে প্রচলিত কিছু ওষুধের ওপর। তবে নতুন করে শুরু হয়েছে আরেকটি ওষুধ নিয়ে বাণিজ্য। এ ওষুধটির নাম টোসিলিজুমাব। যদিও করোনা চিকিৎসায় এর কার্যকারিতার ব্যাপারে নিশ্চিত নন বিশেষজ্ঞরা।

শুধু এই ওষুধই নয়, আরো কয়েকটি ওষুধ নিয়ে নতুন করে শুরু হয়েছে বাণিজ্য। এমনকি করোনাকালে নিউমোনিয়া ও ইমিউনিটির টিকা দেওয়ার আগ্রহ বাড়ার সুযোগে টিকা দুটির বিভিন্ন ব্র্যান্ডের দাম ইচ্ছামতো আদায় করা হচ্ছে। দেশি একাধিক কম্পানি এই টিকা উৎপাদন করলেও বিদেশি টিকাগুলোর দাম বিক্রেতারা যার কাছ থেকে যা পারেন সেভাবে আদায় করছেন।

বহুল প্রচলিত আইভারমেকটিন, ডক্সিক্যাপ, অ্যাজিথ্রোমাইসিন, ফেভিপিরাভির, ডেক্সামেথাসনের নির্ধারিত খুচরা দামের চেয়ে বেশি নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায় ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে। এমনকি কোনো কোনো কম্পানি করোনা মহামারির মধ্যেই এসব ওষুধের দাম আগের তুলনায় বাড়িয়ে দিয়েছে বলেও দাবি করেছেন বিক্রেতারা।

করোনা প্রাদুর্ভাবের শুরুর দিকে হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন নিয়ে হুড়াহুড়ি শুরু হলেও কিছুদিন যেতে না যেতেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আপত্তির মুখে তা থেমে যায়। এরপর শুরু হয় রেমডেসিভিরের পালা। সম্প্রতি এই ওষুধের কার্যকরিতা নিয়েও হতাশার কথা শুনিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। এর মধ্যেই রেমডেসিভির নিয়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও রমরমা বাণিজ্য হয়ে গেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন রোগতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ কালের কণ্ঠকে বলেন, করোনা চিকিৎসার নামে দেশে বা বিদেশে যেভাবে বিভিন্ন ওষুধের যথেচ্ছ ব্যবহার হচ্ছে তাতে বিপদ আরো বাড়ার আশঙ্কাই বেশি। কোন ওষুধে কী উপকার হচ্ছে সেটা এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। কিন্তু দেশের চিকিৎসকরা নানাভাবে নানা ওষুধের ব্যবহার করছেন। এতে ওষুধ কম্পানির বাণিজ্যই বেশি হচ্ছে বলে মনে হয়।

করোনা মহামারি মোকাবেলায় গঠিত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য, মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ খান আবুল কালাম আজাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কোনো কোনো চিকিৎসক প্রদাহ কমাতে টোসিলিজুমাব দিয়ে থাকেন। কিন্তু এর কি সুফল পাওয়া যায়-না যায় তা আমরা এখনো জানি না।’ তিনি আরো বলেন, ‘রেমডেসিভির দেশে সরকারি হাসপাতালে ফ্রি দেওয়া হয়। বেসরকারি হাসপাতালেও নির্দিষ্ট দামেই পাওয়ার কথা। কিন্তু টোসিলিজুমাব কারা দেয় বা কিভাবে ওষুধ জোগাড় হয় তা আমার সঠিকভাবে জানা নেই, যদিও এটি ব্যবহারের কথা জানি।’

বাংলাদেশ ফার্মাকোলজি সোসাইটির সভাপতি ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান বলেন, ‘কভিড আমাদের অ্যান্টিবায়োটিকের ক্ষেত্রে আরেক ধাপ বড় বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছে। লাখ লাখ মানুষ কভিড থেকে মুক্তির আশায় যথেচ্ছ অ্যান্টিবায়োটিক খেয়েছে। তাদের শরীরে এর প্রতিক্রিয়া ভবিষ্যতে কী হবে-না হবে সেটা বড় আশঙ্কার বিষয়। এই মানুষগুলো যখন অন্য কোনো জীবাণুতে আক্রান্ত হবে, তখন তারা আর কোনো অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে সুফল পাবে কি না তা নিয়েও সংশয় রয়েছে।’

কয়েকটি হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ‘টোসিলিজুমাব’ জেনেরিকের আর্থ্রাইটিসের এই ওষুধটি দেশে উৎপাদনের একমাত্র অনুমোদনপ্রাপ্ত কম্পানি হচ্ছে রোস বাংলাদেশ। তারা রেডিয়েন্ট নামের আরেকটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ওষুধটি বাজারজাত করে থাকে। তাদের ওষুধটির নাম এক্টিমরা।

রোস বাংলাদেশের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুসারে, এই আইভি ইনজেকশনটির তিনটি ডোজের (৮০ মিলিগ্রাম/৪ মিলিলিটার, ২০০ মিলিগ্রাম/১০ মিলিলিটার ও ১৬২ মিলিগ্রাম/০.৯ মিলিলিটার) প্রতিটির নির্ধারিত মূল্য যথাক্রমে ৮ হাজার ৭০০, ২১ হাজার ৩০০ ও ১৪ হাজার ৯৫০ টাকা। তাদের ওয়েবসাইটে না থাকলেও ৪০০ মিলিগ্রাম/২০ এমএলের আরেকটি ডোজ বিভিন্ন হাসপাতালে ব্যবহার করতে দেখা যায়। যার দাম কখনো ৪০ হাজার টাকা আবার কখনো ৮০-৯০ হাজার টাকাও নেওয়া হয়।

রাজধানীর পান্থপথের একটি বড় হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া একজন রোগীর স্বজন নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে কালের কণ্ঠকে বলেন, তাঁদের রোগীকে ওই হাসপাতালে কর্তব্যরত চিকিৎসক হঠাৎ করেই জরুরিভাবে ‘টোসিলিজুমাব’ ইনজেকশনটি দেওয়ার পরামর্শ দেন। অন্য সব ওষুধ হাসপাতালের ফার্মেসি থেকে সরবরাহ করা হলেও এটা নেই বলে জানানো হয়। সেই সঙ্গে বারবার তাগাদা দেওয়া হয় দ্রুত ওষুধটি সংগ্রহ করার জন্য। একপর্যায়ে অনেক খোঁজাখুঁজির পর ওই হাসপাতালেরই এক কর্মীর সূত্র ধরে একটি ইনজেকশন সংগ্রহ করা হয় গভীর রাতে। এর দাম পরিশোধ করা হয়েছে ৯০ হাজার টাকা।

গুলশানের আরেকটি হাসপাতালের এক রোগীও একই অভিযোগ করেন। তিনি দাবি করেন, তাঁর কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে এক লাখ টাকা। ওই রোগীর এক স্বজন নাম প্রকাশ না করে কালের কণ্ঠকে বলেন, চিকিৎসক ওষুধটি প্রয়োগের জন্য এমনভাবে পরামর্শ উপস্থাপন করেন তখন স্বজনদের কাছে মনে হয় এটা রোগীকে বাঁচানোর জন্য খুবই অপরিহার্য। ফলে যে যেভাবে পারেন হাসপাতালের বা চিকিৎসকের সূত্রে ওষুধটি জোগাড় করেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি হাসপাতালের একজন চিকিৎসক বলেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও কোনো কোনো চিকিৎসক এ ধরনের আরো কিছু ওষুধ বাবদ বড় অঙ্কের টাকা কমিশন পেয়ে থাকেন। যা কেউ কখনোই প্রকাশ্যে স্বীকার করেন না বা এই ওষুধের কোনো বিলও দেওয়া হয় না। ফলে প্যাকেটের গায়ে লেখা নির্ধারিত দামটিই থাকে প্রমাণ হিসেবে, যা পরিশোধকৃত দামের তুলনায় অনেক কম।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ সালেহ উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কম্পানি যদি নির্ধারিত দামের অতিরিক্ত নেয় তবে অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু তৃতীয় কোনো পক্ষ কৌশলে রোগীদের এ ওষুধ ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছে কি না সেটা এখন পর্যন্ত আমাদের নজরে আসেনি। এমন কিছু পাওয়া গেলেও বিধি অনুযায়ী শাস্তির আওতায় আনা হবে।’

সালেহ উদ্দিন বলছেন, এখনো করোনা চিকিৎসায় কার্যকর হিসেবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে কোনো ওষুধের চূড়ান্ত অনুমোদন মেলেনি। পরীক্ষামূলকভাবে কিছু কিছু ওষুধ ব্যবহার করছেন চিকিৎসকরা।

অতিরিক্ত দামের বিষয়ে জানতে চাইলে রোস বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কেউ অফিশিয়াল কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি, তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কম্পানির একজন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘টোসিলুজুমাব ৪০০ এমজি প্রতি ডোজ ওষুধের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ৪৯ হাজার ২৪২ টাকা। এ ক্ষেত্রে আমরা যখন হাসপাতালে রোগীদের জন্য ওষুধ সাপ্লাই দিই, তখন দাম আরো কম রাখা হয়। ফলে অতিরিক্ত দামের কোনো সুযোগ নেই। যদি অন্য কেউ অতিরিক্ত দাম নিয়ে থাকে সেই দায় আমাদের নয়। যদিও কোনো রোগীকে এক ডোজে কাজ না হয়, দুই ডোজ দিতে হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই তার দ্বিগুণ খরচ হয়। এ ছাড়া কোনো অবস্থাতেই আমাদের কম্পানি দ্বিগুণ দাম আদায় করতে পারে না।’

মন্তব্য