kalerkantho

সোমবার। ৪ মাঘ ১৪২৭। ১৮ জানুয়ারি ২০২১। ৪ জমাদিউস সানি ১৪৪২

বাংলাদেশের আনন্দ বেদনার কাব্যে

সনৎ বাবলা   

২৭ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



বাংলাদেশের আনন্দ বেদনার কাব্যে

বাঙালি হৃদয় ভেঙে খান খান হয়ে গেল। ঘরের আটপৌরে বধূটিও ম্যারাডোনাকে চিনত-জানত। তাই তাঁর বিদায়েও সেই বধূর হৃদয় ভারাক্রান্ত হয়েছে, কাজে মন বসাতে পারছে না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছে, ‘ফুটবল অত বুঝি না, তবে তোমাকে দেখেই হাসি-কান্নার মানে বুঝেছি। তোমার বিজয়ে আনন্দিত হয়েছি, তোমার কথায় উজ্জীবিত হয়েছি। আমাদের মতো সাধারণের কাতারে তোমাকে খুঁজে পেয়েছি। সেই তুমি চলে গেলে...।’ যে মানুষটি ফুটবল বোঝে না, সে-ও ডিয়েগো ম্যারাডোনার বিয়োগব্যথায় আক্রান্ত মারাত্মকভাবে।

আসলে ম্যারাডোনাকে নিয়ে বাঙালির আবেগ আর বেগ দুটিই প্রবল। ফুটবল ঈশ্বরকে কাঁদতে দেখে তাদের চোখেও জল গড়িয়ে যায়। আবার ডোপ টেস্টে বাদ পড়লে তার জন্য রাস্তায় মিছিল বের হয়। বাঙালির ম্যারাডোনা-প্রেম শুরু হয় ১৯৮৬ বিশ্বকাপ থেকে। তার আগে ছিল পেলের রাজত্ব, সেটা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পাঠ্য বইয়ের ‘কালো মানিক’-এর সুবাদে। ’৮৬ বিশ্বকাপে সেই রাজত্বে ভাগ বসান আর্জেন্টিনার ডিয়েগো ম্যারাডোনা। তখন সাদাকালো টিভির যুগ শেষ হয়ে রঙিন পৃথিবীতে প্রবেশ করতে শুরু করেছে এ দেশের মানুষ। স্বাদ পরিবর্তনের সঙ্গী হিসেবে পেয়েছিল ডিয়েগো ম্যারাডোনাকে। বল পায়ে অদ্ভুত খেলা, দুর্দান্ত গোল এবং সবশেষে ‘ছোট’ মানুষটির বিশ্বজয়ের দৃশ্য স্থায়ী আসন করে নিয়েছে মানুষের হৃদয়ে। আর্জেন্টিনা যত দূর দেশই হোক, ম্যারাডোনা যত অচেনাই হোক, সেই বিশ্বকাপেই তিনি হয়ে গেলেন সবার চেনা এবং

আপনজন! এমনই আপন যে পাড়ার চায়ের দোকানেও তিনি আলোচনার বিষয়বস্তু।

সেটা আরো স্পষ্ট হলো ১৯৯০ বিশ্বকাপে। সাধারণ মানের এক দল নিয়ে ফুটবল ঈশ্বর অসাধারণের পানে যাত্রা করেছিলেন। কিন্তু ফাইনালে জার্মানির কাছে হারের পর ম্যারাডোনার কান্নায় শরিক হয়ে গেল পুরো জাতি। রেফারিকে হাতের কাছে পেলে যেন এক ঘা দিয়ে বসবে, এমনই ছিল অবস্থা। অনেকে বলে, সেই কান্নায় ড্রইংরুম থেকে ম্যারাডোনা-প্রেম পৌঁছে যায় রান্নাঘরে! ঘরের মেয়েদের মধ্যেও ধরা পড়ে এই প্রেম আসক্তি। দেশের সাবেক ফুটবলার ও কোচ গোলাম সারওয়ার টিপু মনে করেন, ‘এ দেশের ফুটবলে ম্যারাডোনার প্রভাব ব্যাপক। তাঁর খেলায় মোহগ্রস্ত হয়ে একটা প্রজন্ম ফুটবলমুখী হয়েছে। এমনকি ঘরের বউ-মেয়েরাও তাঁকে চেনে এবং তাঁর ভালো-মন্দ নিয়ে আলোচনা করে।’

ওই দুটি বিশ্বকাপে এ দেশের মানুষ এমন ম্যারাডোনায় দারুণ মোহগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল। দেশে হু হু করে বাড়তে থাকে আর্জেন্টিনা সমর্থন। আর ম্যারাডোনা! তিনি তত দিনে বাঙালির ঘরের ছেলে। সেটা আরো বোঝা যায় ১৯৯৪ বিশ্বকাপে ডোপ টেস্টে তিনি বাদ পড়ার পর। এমনই আত্মিক বন্ধন হয়ে গিয়েছিল, ম্যারাডোনার মাদক নেওয়ার অপকর্ম মানুষ বিশ্বাস করেনি, বরং ষড়যন্ত্র বলে সন্দেহ করেছিল। 

আসলে এক দশকে এ দেশ হয়েছিল ম্যারাডোনাময়। মাঠের খেলা ছাড়াও মাঠের বাইরে ছিল তাঁর বর্ণময় উপস্থিতি। ফুটবল ফেরি করার সঙ্গে সঙ্গে চে গুয়েভারার আদর্শে উদ্বুদ্ধ মানুষটি প্রতিবাদমুখর ছিলেন উচ্চমার্গের। সোচ্চার ছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে। এটাই তো এ দেশের সাধারণ মানুষের প্রবৃত্তি। আর্জেন্টিনার বস্তি থেকে উঠে আসা এক তরুণের বড় হওয়ার মধ্যে তারা খুঁজে বেড়িয়েছে নিজের গল্প। সেই গল্পের মহানায়কের প্রস্থান তাই বড়ই বেদনাবিধুর।

মন্তব্য