kalerkantho

বুধবার। ৬ মাঘ ১৪২৭। ২০ জানুয়ারি ২০২১। ৬ জমাদিউস সানি ১৪৪২

করোনা মহামারি

আইসিইউ না মেলার সেই পুরনো দৃশ্য

তৌফিক মারুফ   

২৫ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আইসিইউ না মেলার সেই পুরনো দৃশ্য

রাজধানীর ধানমণ্ডির বাসিন্দা ব্যবসায়ী আশিকুর রহমানের বাসার কাছেই দেশের নামি-দামি হাসপাতালের ছড়াছড়ি। কিন্তু তাঁর বাবা যখন করোনায় আক্রান্ত হলেন তখন একটা নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) শয্যার জন্য হন্যে হয়ে ঘুরতে হলো তাঁকে। আশিকুর বলছিলেন, ৭৬ বছর বয়সী তাঁর বাবার প্রথম দিকে কোনো উপসর্গ ছিল না। হঠাৎ চার দিন আগে তাঁর শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। একজন পরিচিত চিকিৎসকের পরামর্শে তাঁকে নিয়ে যান কাছের একটি হাসপাতালে। সেখানকার জরুরি বিভাগের চিকিৎসকরা জানান তাঁর আইসিইউ লাগবে, কিন্তু তাঁদের এখানে শয্যা খালি নেই। এরপর বাবাকে নিয়ে ছুটলেন কল্যাণপুরের আরেকটি হাসপাতালে। সেখানে গিয়েও মেলেনি আইসিইউ শয্যা। অসহায় হয়ে ঢুকলেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে—সেখানেও একই জবাব। এক প্রভাবশালী বন্ধুর সহায়তায় যোগাযোগ করলেন পর্যায়ক্রমে সরকারি কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল ও কুয়েত বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালে, কিন্তু একই খবর—আইসিইউ খালি নেই। বাবাকে নিয়ে ঘণ্টাখানেক মানিক মিয়া এভিনিউতে অবস্থান করলেন, কোন দিকে যাবেন বুঝতে পারছিলেন না। শেষ পর্যন্ত ওই বন্ধুর সহায়তায় গুলশানের একটি ব্যয়বহুল হাসপাতালে ঠাঁই হয় তাঁর বাবার।

আশিকুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখন যে হাসপাতালে আছি, এটি আমি বরাবরই বিভিন্ন কারণে অপছন্দ করি। কিন্তু বাসার কাছের হাসপাতালগুলোতে টাকা সেধেও আমি একটি আইসিইউ বেড পাইনি।

বাধ্য হয়ে এখানে এলাম। তাহলে সরকার যে এত করে বলছে তাদের সব প্রস্তুতি আছে, সেগুলো কী হলো?’

উত্তরার সাহেদা আক্তার বলছিলেন, ‘কুয়েত মৈত্রী হাসপাতাল আর আমাদের বাসার দূরত্ব ২৪ টাকা রিকশাভাড়ার। কিন্তু আমার মাকে সেখানে আইসিইউতে ভর্তি করাতে পারলাম না বেড না থাকায়। পরে তিন হাসপাতাল ঘুরে বাধ্য হয়ে একটি প্রাইভেট হাসপাতালে নিয়ে গেছি। সেখানে খরচ এত বেশি হয়েছে যে আমি বড় ধরনের ধারদেনায় বাধ্য হয়েছি।’

শুধু আশিকুর বা সাহেদাই নন, এমন ভুক্তভোগী আরো অনেকে। প্রতিদিনই কুর্মিটোলা, কুয়েত মৈত্রী, ঢাকা মেডিক্যাল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মতো বড় বড় সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত হাসপাতালে আইসিইউয়ের জন্য মানুষের ভিড়, ছোটাছুটি, হয়রানি লেগেই আছে। এসব হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও নিরুপায় হয়ে ফিরিয়ে দিচ্ছে রোগীদের। অন্যদিকে দু-একটি বেসরকারি হাসপাতাল ছাড়া ভালো মানের বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউ শয্যাও এখন খালি পাওয়া যাচ্ছে না। যদিও সরকারি ও বেসরকারি সব হাসপাতালেই করোনা রোগীদের জন্য সংরক্ষিত সাধারণ শয্যার বেশির ভাগই ফাঁকা পড়ে আছে।

সরকারি রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ড. মুশতাক হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারের উচিত হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ ব্যবস্থাপনা জোরদার করা। নতুন ইউনিট করতে গেলে জনবলের সংকট দেখা দেবে। সে ক্ষেত্রে পুরনো ব্যবস্থাপনায় কিভাবে নতুন করে সচল করা যায় সেদিকে নজর দেওয়া দরকার। পাশাপাশি নতুনগুলোর জন্য জনবল তৈরি করার ওপরও নজর দিতে হবে। নয়তো মানুষের এমন দুর্দশা সামনে আরো বাড়তে পারে।’

গত দুই দিন ধরে একাধিক হাসপাতাল ঘুরে, ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে যে চিত্র পাওয়া গেছে, সেটা হলো ঢাকায় টাকা দিয়েও মিলছে না আইসিইউ শয্যা। সে কারণে গুরুতর রোগী নিয়ে বাড়ছে ঘোরাঘুরি। সাধারণ শয্যা খালি পড়ে আছে ৭০ শতাংশ। কিন্তু আইসিইউ শয্যার জন্য চলছে হাহাকার। ঢাকার বড় ১০টি সরকারি হাসপাতালের পাঁচটিতেই খালি হচ্ছে না আইসিইউ শয্যা। অন্যগুলোতে খালি মাত্র ১৫ শতাংশ, তা-ও আবার ভাগ্যে জুটছে না সাধারণ রোগীদের। শুধু সরকারি হাসপাতালেই নয়, হাহাকার অবস্থা বেসরকারি হাসপাতালেও। বেশির ভাগ মানসম্মত হাসপাতালের আইসিইউ ভরা থাকছে সব সময়। বিভিন্নভাবে প্রভাবশালীদের তদবিরই এখন সরকারি বা বেসরকারি হাসপাতালে আইসিইউ শয্যা পাওয়ার মূল ভরসা হয়ে উঠেছে। রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, সরকারি হাসপাতালে শয্যা না থাকার সুযোগ নিয়ে বেসরকারিতে আইসিইউ শয্যার ভাড়া ইচ্ছামতো নেওয়া হচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল) ডা. ফরিদ উদ্দিন মিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবেলায় হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা বাড়ানোর কাজ করছি। এ ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ঔষাধাগারে (সিএমএসডি) যে ভেন্টিলেটরগুলো রয়েছে সেগুলো বিভিন্ন হাসপাতালে বিতরণের প্রক্রিয়া চলছে। তবে এ জন্য যেসব প্রস্তুতি দরকার তা করতে কিছুটা সময় তো লাগবেই।’

ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘গত সোমবারও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব আমাদেরকে নির্দেশনা দিয়েছেন হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা দ্রুত আরো শক্তিশালী ও কার্যকরভাবে প্রস্তুত রাখতে।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, ঢাকায় সরকারি ও বেসরকারি ১৯টি হাসপাতালের ৩০৫টি আইসিইউ শয্যার মধ্যে ২১৫টিতে রোগী ভর্তি।

খুঁজে দেখা যায়, গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ঢাকার কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের আইসিইউয়ের ১০ শয্যা, কুয়েত মৈত্রীর ১৬ শয্যা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৬টি শয্যার সবগুলোই রোগীতে পরিপূর্ণ ছিল। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ২৪ শয্যার মধ্যে সাতটি, মুগদা জেনারেল হাসপাতালের ১০টির মধ্যে ৯টি, রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালের ১৫টির মধ্যে ১৪টিতে রোগী ভর্তি ছিল। বেসরকারি হাসপাতালের মধ্যে ইম্পালস ছাড়া সব হাসপাতালেই দু-একটি করে শয্যা খালি ছিল। তবে ধানমণ্ডি ও কল্যাণপুরের দুটি বড় হাসপাতালে কোনো শয্যা খালি ছিল না। শুধু ঢাকাতেই নয়, ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালেও কোনো আইসিইউ শয্যা খালি নেই; একটি শয্যাও খালি নেই চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালে।

সারা দেশের তথ্য অনুসারে, সরকারি-বেসরকারি ৫৫৫টি আইসিইউ শয্যার মধ্যে ৩০৩টিতে রোগী ছিল, ফাঁকা ছিল ২৫২টি। তবে ঢাকার বাইরে যেখানে শয্যা ফাঁকা যেসব এলাকায় এখন করোনা সংক্রমণ, আক্রান্ত বা মৃত্যুও ঢাকার তুলনায় অনেক কম।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা