kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ মাঘ ১৪২৭। ২৮ জানুয়ারি ২০২১। ১৪ জমাদিউস সানি ১৪৪২

২০২২ সাল থেকে নতুন কারিকুলাম

মূল্যায়ন পদ্ধতি বদলে যাচ্ছে

► শিখনকালীন মূল্যায়নেই বেশি জোর
► মাধ্যমিকে থাকছে না বিভাগ বিভাজন
► প্রাথমিকে আটটি, মাধ্যমিকে ১০টি বই

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৪ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মূল্যায়ন পদ্ধতি বদলে যাচ্ছে

আমাদের লেখাপড়া অতিমাত্রায় পরীক্ষানির্ভর। পরীক্ষা ছাড়া মূল্যায়নের উপায় নেই। স্কুলগুলোও শিক্ষা বোর্ডের নির্দিষ্ট পরীক্ষার বাইরে একাধিক পরীক্ষা নিয়ে থাকে। করোনার কারণে গত ১৭ মার্চ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। এই সময়ে পরীক্ষা নিতে না পারায় শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নে হিমশিম খেতে হচ্ছে। ২০২২ সাল থেকে চালু হওয়া নতুন কারিকুলামে পরীক্ষানির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বের হয়ে আসার পরিকল্পনা করা হয়েছে। বইয়ের সংখ্যা কমানোর পাশাপাশি শিখনকালীন মূল্যায়নেই বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে।

জানা যায়, নতুন কারিকুলাম প্রণয়নে ২০১৭ সালে কাজ শুরু করে এনসিটিবি। তখন দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদদের নিয়ে দুটি কমিটি করা হয়। এরপর আবার ১০ জন শিক্ষাবিদ নিয়ে ‘কারিকুলাম ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রিভিশন কোর কমিটি’ গঠন করা হয়। সম্প্রতি তারা ‘জাতীয় শিক্ষাক্রম রূপরেখা, প্রাক-প্রাথমিক থেকে দ্বাদশ শ্রেণি’ নামে ১১৪ পৃষ্ঠার রূপরেখা জমা দিয়েছে। এই রূপরেখার ওপর এখন বিশিষ্টজন, শিক্ষাবিদদের মতামত নিচ্ছে এনসিটিবি। এরপর তা ন্যাশনাল কারিকুলাম কো-অর্ডিনেশন কমিটিতে (এনসিসি) যাবে। সেখানে অনুমোদনের পর মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত অনুমোদন শেষে বিষয়ভিত্তিক পাঠক্রম প্রণয়নের কাজ শুরু হবে।

জানা যায়, সব শ্রেণির কারিকুলাম একবারেই পরিবর্তন হবে না। ধাপে ধাপে হবে। নবম-দশম শ্রেণিতে রাখা হচ্ছে না বিভাগ বিভাজন। অর্থাৎ একজন শিক্ষার্থীকে সব বিষয় পড়তে হবে। তবে একাদশ শ্রেণিতে গিয়ে একজন শিক্ষার্থীকে তার পছন্দের বিভাগ নিতে হবে। বইয়ের সংখ্যায়ও পরিবর্তন আনা হচ্ছে। ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত থাকছে ১০টি বই। তবে প্রাথমিকে আটটি বই রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

এনসিটিবি চেয়ারম্যান অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র সাহা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা আশা করছি, জুন মাসের মধ্যে আমাদের সব কাজ শেষ হবে। এরপর তা এনসিসি ও মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন শেষে চূড়ান্ত হবে। আমরা ২০২২ সাল থেকে শিক্ষার্থীদের নতুন কারিকুলামের বই দিতে চাই। তবে কোন শ্রেণির শিক্ষার্থীরা কোন বছর থেকে নতুন কারিকুলামের বই পাবে, সেটি এখনো ঠিক হয়নি।’

সূত্র জানায়, একজন শিক্ষার্থী ষষ্ঠ শ্রেণিতে নতুন কারিকুলামের বই পেলে সে যাতে পরবর্তী শ্রেণিতেও নতুন কারিকুলামের বই পায়, সেটা লক্ষ রেখেই পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এভাবে ধাপে ধাপে সব শ্রেণিতে নতুন কারিকুলাম বাস্তবায়ন করা হবে।

জাতীয় শিক্ষাক্রম রূপরেখার প্রস্তাব অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের শিখনফল অর্জনে ১০টি বিষয় নির্ধারণ করা হয়েছে। সেগুলো হলো ভাষা ও যোগাযোগ, গণিত ও যুক্তি, জীবন ও জীবিকা, সমাজ ও বিশ্ব নাগরিকত্ব, পরিবেশ ও জলবায়ু, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য ও সুরক্ষা, মূল্যবোধ ও নৈতিকতা এবং শিল্প ও সংস্কৃতি।

সেই অনুযায়ী, প্রাক-প্রাথমিকে থাকতে পারে সমন্বিত বিষয় নিয়ে একটি বই। প্রাথমিকে আট বিষয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে। সেগুলো হলো বাংলা, ইংরেজি, গণিত, সামাজিক বিজ্ঞান, বিজ্ঞান, ধর্মশিক্ষা, ভালো থাকা এবং শিল্প ও সংস্কৃতি। মাধ্যমিকে ১০টি বিষয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে। সেগুলো হলো বাংলা, ইংরেজি, গণিত, জীবন ও জীবিকা, সামাজিক বিজ্ঞান, বিজ্ঞান, ডিজিটাল প্রযুক্তি, ভালো থাকা, ধর্মশিক্ষা এবং শিল্প ও সংস্কৃতি।

এক বছরের ৩৬৫ দিনের মধ্যে সরকারি ও সপ্তাহে দুই দিন করে সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে ১৩৭ দিন বাদ দিলে ১৮৫ কর্মদিবস পাওয়া যাবে। এই সময়ের মধ্যে প্রাক-প্রাথমিকে স্কুলে প্রতিদিন আড়াই ঘণ্টা, প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণিতে সাড়ে তিন ঘণ্টা, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিতে চার ঘণ্টা, ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণিতে পাঁচ ঘণ্টা, নবম ও দশম শ্রেণিতে সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা এবং একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা শিখনঘণ্টা নির্ধারণ করা হয়েছে।

মূল্যায়নের ব্যাপারে রূপরেখায় বলা হয়েছে, প্রাক-প্রাথমিকে শতভাগই থাকবে শিখনকালীন মূল্যায়ন, প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণিতেও শতভাগ শিখনকালীন মূল্যায়ন। অর্থাৎ কোনো ষাণ্মাসিক বা বার্ষিক পরীক্ষা থাকছে না। চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিতে ৭০ শতাংশ শিখনকালীন মূল্যায়ন এবং ৩০ শতাংশ সামষ্টিক মূল্যায়ন, ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণিতে শিখনকালীন মূল্যায়ন ৬০ শতাংশ এবং সামষ্টিক মূল্যায়ন ৪০ শতাংশ। নবম ও দশম শ্রেণিতে ৫০ শতাংশ করে শিখনকালীন ও সামষ্টিক মূল্যায়ন। দশম শ্রেণির পাঁচটি বিষয় বাংলা, ইংরেজি, গণিত, সামাজিক বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানের ওপর শিখনকালীন ও সামষ্টিক মিলিয়ে পাবলিক পরীক্ষার কথা বলা হয়েছে। আর বাকি পাঁচটি বিষয়ে থাকবে শুধু শিখনকালীন মূল্যায়ন। একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে শিখনকালীন মূল্যায়ন ৩০ শতাংশ ও সামষ্টিক মূল্যায়ন ৭০ শতাংশ। তবে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির সম্মিলিত ফলাফলের ভিত্তিতে চূড়ান্ত পাবলিক পরীক্ষার ফল নির্ধারণ করা হবে।

জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির সদস্য অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জাতীয় শিক্ষাক্রম রূপরেখায় অনেক কিছুই এসেছে। কিন্তু বর্তমান বৈশ্বিক মহামারির কথা বিবেচনা করে প্রযুক্তিকে জোর দিয়ে ঢেলে সাজাতে হবে। অনলাইন বা ডিজিটাল শিক্ষার ব্যাপারটি গুরুত্বসহকারে দেখতে হবে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার কারিকুলামে সমন্বয় থাকতে হবে। মূল্যায়নের আদর্শ ব্যবস্থা রূপরেখায় বলা হয়েছে। কিন্তু দেশের বর্তমান অবস্থায় তা বাস্তবায়ন অনেকটাই কষ্টকর। আগেও একসময় নবম-দশম শ্রেণিতে বিভাগ বিভাজন ছিল না। তাই এখন যেটা করা হচ্ছে সেটার পেছনে যুক্তি আছে বলে আমার মনে হয়।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা