kalerkantho

শুক্রবার । ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৭ নভেম্বর ২০২০। ১১ রবিউস সানি ১৪৪২

সাভার ও ত্রিশালের বাতাস কেন ঢাকার চেয়ে বিষাক্ত

শরীফুল আলম সুমন, তায়েফুর রহমান ও মোস্তাফিজ নোমান    

২২ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



সাভার ও ত্রিশালের বাতাস কেন ঢাকার চেয়ে বিষাক্ত

দূষণের নগরীর তালিকায় আগে থেকেই আছে ঢাকার নাম। কিন্তু চলতি বছর বারবারই রাজধানী শহরকে পেছনে ফেলছে ঢাকার সাভার ও ময়মনসিংহের ত্রিশাল এলাকাটি। রাজধানীর চেয়ে অনেক বেশি সবুজ থাকার পরও সাভার ও ত্রিশাল কেন দূষণের শীর্ষে অবস্থান করছে তা নিয়ে শঙ্কিত নাগরিকরা। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ারের তথ্যানুযায়ী এই দূষণের মাত্রা ‘অস্বাস্থ্যকর’ অবস্থায় পৌঁছেছে। শীত শুরুর আগেই এই মাত্রা চরম আকার ধারণ করেছে।

কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজধানী ঢাকার চেয়ে সাভার ও ত্রিশালে দূষণ বাড়ার উপযোগী উপাদান দিন দিন বাড়ছে। বিশেষ করে ইটভাটা, বর্জ্য পোড়ানো, কলকারখানা ও গাড়ির কালো ধোঁয়া এই দূষণের জন্য দায়ী। সাভার ও ত্রিশালে চলতি মাসের শুরু থেকেই চালু হয়েছে ইটভাটা। কলকারখানাগুলোর বেশির ভাগেরই নেই প্রয়োজনীয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। এ ছাড়া রাজধানী ঢাকার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সাভারের মতো এলাকায় তৈরি হচ্ছে বাড়ি, কমছে গাছপালা ও খোলা জায়গা। ফলে বাতাসে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিবছর বায়ুদূষণের কারণে বিশ্বে প্রায় ৭০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। দূষিত বায়ু ফুসফুসে ঢুকে ক্রমশ দুর্বল করে দেয়, যা শ্বাসতন্ত্রের সমস্যাজনিত মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করে। বায়ুদূষণের সঙ্গে এবার যোগ হয়েছে করোনাভাইরাসের মহামারি। এ ভাইরাসের প্রধান লক্ষ্যই ফুসফুস। এ কারণে এবার কাশি, অ্যাজমা, শ্বাসকষ্টসহ নানা রোগ বাড়ারও আশঙ্কা বেশি।

আইকিউএয়ারের গত বুধবার বিকেল ৫টার তথ্যানুযায়ী, সাভারের বায়ুমান সূচক (ইউএস একিউআই) ছিল ১৬৭, আর ত্রিশালে ১৬২। অন্যদিকে মানিকগঞ্জে ছিল ১৫৩ আর ঢাকায় ১৩৯। রাতে সব কিছু নীরব থাকার পরও দূষণের মাত্রা বেড়ে যায়। বুধবার রাত ৮টায় বায়ুমান সূচক ছিল ত্রিশালে ২৩৪, ঢাকায় ১৯০ ও সাভারে ১৮০। গত শুক্রবার বিকেল ৪টায় দেখা যায়, সাভারে ১৯০, মানিকগঞ্জে ১৮৫, ঢাকায় ১৮১ ও ত্রিশালে ১৬৫। গতকাল শনিবার বিকেল ৫টায় দেখা যায়, ঢাকায় ২৩৩, সাভারে ২৩০, মানিকগঞ্জে ১৬৯ ও ত্রিশালে ১৬৮। ইউএস একিউআই র্যাংকিং অনুযায়ী গতকাল বায়ুদূষণের নগরীর তালিকায় বিশ্বে ঢাকার অবস্থান ছিল তৃতীয়, বায়ুমান সূচক ১৯৭। এ সময় বিশ্বের সর্বোচ্চ দূষণের নগরী ছিল কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেক, বায়ুমান সূচক ২৪১। কলকাতায় ছিল ২০৩, কুয়েত সিটিতে ১৭৭ ও মুম্বাইয়ে ছিল ১৬৪।

বাতাসে প্রতি ঘনমিটারে ভারী বস্তুকণার পরিমাণ (পিপিএম) হিসাব করে বায়ুমান সূচক (একিউআই) তৈরি করা হয়। একিউআই শূন্য থেকে ৫০-এর মধ্যে থাকলে সেই এলাকার বাতাসকে ভালো বলা যায়। ৫১-১০০ হলে বাতাসের মান মডারেট বা মোটামুটি গ্রহণযোগ্য ধরা হয়। একিউআই ১০১-১৫০ হলে সেই বাতাস স্পর্শকাতর শ্রেণির মানুষের (শিশু, বৃদ্ধ, শ্বাসকষ্টের রোগী) জন্য অস্বাস্থ্যকর এবং ১৫১-২০০ হলে তা সবার জন্যই অস্বাস্থ্যকর বিবেচিত হয়। আর একিউআই ২০১-৩০০ হলে তা খুবই অস্বাস্থ্যকর এবং ৩০১ পেরিয়ে গেলে সেই বাতাসকে বিপজ্জনক ধরা হয়।

আইকিউএয়ার বলছে, ঢাকা ও আশপাশের এলাকার বাতাস চলতি সপ্তাহজুড়েই ছিল অস্বাস্থ্যকর। বাংলাদেশে বায়ুদূষণের উৎস নিয়ে গত বছরের মার্চে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে পরিবেশ অধিদপ্তর ও বিশ্বব্যাংক। তাতে দেখা যায়, দেশে বায়ুদূষণের প্রধান তিনটি উৎস হচ্ছে ইটভাটা, যানবাহনের কালো ধোঁয়া ও নির্মাণকাজ। আট বছর ধরে এই তিন উৎস ক্রমেই বাড়ছে। ২০১৩ সালে দেশে চার হাজার ৯৫৯টি ইটভাটা ছিল। ২০১৮ সালে বেড়ে দাঁড়ায় সাত হাজার ৯০২টি। এর মধ্যে দুই হাজার ৪৮৭টি ইটভাটা ঢাকা বিভাগেই।

পরিবেশ অধিদপ্তরের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, শুষ্ক মৌসুমে যে নির্মাণকাজগুলো হয়, তাতে সকাল ও বিকেলে পানি দিয়ে ভিজিয়ে রাখার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু রাজধানীর বেশির ভাগ এলাকায়ই তা মানা হচ্ছে না।

বায়ুদূষণ নিয়ে ২০ বছর ধরে কাজ করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক আবদুস সালাম। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি—এই চার মাসে বাংলাদেশের মানুষ সবচেয়ে ক্ষতিকর বাতাসে বাস করে। ঢাকার আশপাশের এলাকায় ইটভাটাগুলো এ সময় চালু হয়। নানা ধরনের বর্জ্য পোড়ানো হয়। কলকারখানার দূষণ, গাড়ির কালো ধোঁয়া ও যত্রতত্র নিয়ম না মেনে নির্মাণকাজ তো রয়েছেই। ঢাকায় যেসব দূষণ নেই, সাভারে সেগুলোও রয়েছে। ফলে সেখানকার বাতাসের মান আরো খারাপ।’

পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (বায়ুমান ব্যবস্থাপনা) মো. জিয়াউল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শুষ্ক মৌসুমে বাতাসে ধূলিকণা বাড়ে, বায়ুদূষণও বাড়ে। ইটভাটার কারণে ঢাকার আশপাশের বাতাস বেশি দূষিত হয়। তাদের নিয়মের মধ্যে রাখতে নিয়মিত অভিযানসহ নানা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।’

রাজধানী ঢাকার উপকণ্ঠ সাভারে সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক, নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়ক, বাইপাইল-আব্দুল্লাহপুর মহাসড়কসহ গোটা উপজেলার বিভিন্ন শাখা সড়কগুলোর পাশে যেখানেই নিচু জায়গা রয়েছে সেখানেই ফেলা হচ্ছে কঠিন বর্জ্য-আবর্জনা। যা মহাসড়কেও চলে আসছে। এ বর্জ্যের মধ্যে রয়েছে ক্ষতিকর প্লাস্টিক, পলিথিন ও রাসায়নিকসামগ্রীও। মাঝে-মধ্যেই এসব বর্জ্য আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। তখন কালো ধোঁয়ায় পুরো এলাকা ছেয়ে যায়। এ ছাড়াও ট্যানারি ও টেক্সটাইল ইত্যাদি প্রকল্প এরই মধ্যে সাভারে স্থানান্তর হয়েছে। পাশাপাশি সিরামিক, অটো মোবাইল, ওষুধ, বিস্কুট ও ব্রেড, রং তৈরির কারখানা, হিমাগার, তেলের কারখানা, ওয়েল্ডিং কারখানা, স মিল, জুতার কারখানা, সাবানের কারখানা, মশার কয়েল তৈরির কারখানা, নিট ও ওভেন, ওয়াশিং, ডায়িং প্যাকেজিংসহ কম-বেশি সব ধরনের কারখানা রয়েছে। লক্কড়ঝক্কড় যানবাহনের কালো ধোঁয়া প্রতিনিয়ত বাতাস দূষিত করছে। আমিনবাজার ও আশপাশের এলাকায় অবৈধভাবে গড়ে ওঠা অন্তত ৫০টি ইটভাটার কারণে মারাত্মকভাবে বায়ু দূষিত হচ্ছে।

সাভার চামড়াশিল্প এলাকার আশপাশের পরিবেশও এখন হুমকির মুখে। সেখানকার উচ্ছিষ্ট চামড়াসহ বিভিন্ন ক্ষতিকারক বর্জ্য স্তূপাকারে জমিয়ে রাখা হয়।

সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সায়েমূল হুদা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বর্জ্যজাত দূষণ ও ধোঁয়ার প্রভাবে জনসাধারণের চর্মরোগ, শ্বাসকষ্টসহ জটিল সমস্যা, ফুসফুসে সংক্রমণ ও ক্যানসারের মতো রোগ ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষত শিশু ও গর্ভবতী নারীরা বায়ুদূষণের সবচেয়ে বেশি শিকার।’

ত্রিশালে প্রায় ৮০টি ইটভাটা রয়েছে। তবে পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন ও নবায়নকৃত লাইসেন্স রয়েছে এমন ইটভাটার সংখ্যা ১০টির বেশি হবে না। ভাটাগুলোয় কয়লার পরিবর্তে ব্যবহৃত হচ্ছে কাঠ। ফলে আশপাশের পরিবেশ আচ্ছাদিত হচ্ছে কালো ধোঁয়ায়। ফলে অনেকেই নিজেদের বসতবাড়ি অন্যত্র সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, বালিপাড়া ইউনিয়নের বিয়ারা গ্রামে পাশাপাশি ১০-১২টি ইটভাটার কালো ধোঁয়ায় যেন আকাশ ছেয়ে গেছে। একই অবস্থা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের রাগামারা মোড় থেকে রামপুর সংযোগ সড়ক পর্যন্ত। এ ছাড়া আমিরাবাড়ী, হরিরামপুর ও মঠবাড়ী ইউনিয়নে গড়ে ওঠা শিল্প-কলকারখানার ধোঁয়ায়ও আচ্ছন্ন হচ্ছে পরিবেশ। বেশির ভাগ কারখানাই তাদের বর্জ্য পুড়িয়ে পরিবেশ দূষিত করছে। ত্রিশাল উপজেলায় শতাধিক ক্রাশার মিল ধুলাবালি উড়িয়ে শুঁটকি, মিটবোন, ভুট্টা, কুঁড়া গুঁড়ো করে মাছের খাবার উৎপাদন করে। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে প্রতিদিন রাস্তার কাজের জন্য পাথর ভাঙা হয়।

মাছের খাওয়ানোর জন্য খাবারের যে ফিটিং হয় তা প্রায় তিন হাজার মেট্রিক টন ধুলো ছিটানোর সমান বলে জানিয়েছেন উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা তোফায়েল আহমেদ। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এত ধুলাবালি অনেক জেলা শহরেও ওড়ে না।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা