kalerkantho

রবিবার । ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৯ নভেম্বর ২০২০। ১৩ রবিউস সানি ১৪৪২

বিশেষজ্ঞ মত

মানসিক সংকটে থাকা ব্যক্তি গভীর মনোযোগ ও যত্ন আশা করে

ডা. সালাহউদ্দিন কাউসার

১১ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



মানসিক সংকটে থাকা ব্যক্তি গভীর মনোযোগ ও যত্ন আশা করে

মানসিক রোগী, মাদকসেবীদের চিকিৎসাসেবা ব্যবস্থাপনা নিয়ে দেশে এখনো অনেক কিছু পরিষ্কার নয়। সাধারণ মানুষ যেমন নিজেদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতন নয়, অন্যের মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কেও সঠিক ধারণা রাখে না। ফলে অহরহ দেখা যায় মানসিকভাবে অসুস্থ মানুষের সঙ্গে আচরণগত সংকট। অসচেতনতা ও আচরণে বিপদে পড়ে মানসিক রোগীরা। এর পরিণতি অনেক সময় মর্মান্তিক এবং অপরাধের পর্যায়ে পৌঁছে যায়। ছেলেধরা সন্দেহে একজন নারীকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা, সম্প্রতি লালমনির হাটে এক যুবককে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যার মতো ঘটনা দেখেছি আমরা। পরে জানা গেছে, তাঁরা দুজনই মানসিক অসুস্থতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। পথেঘাটে, পরিবারে, মানসিকভাবে অসুস্থ একজন ব্যক্তির সঙ্গে অন্যদের আচরণে অসংগতি দেখা যায়। এমনকি হাসপাতাল, নিরাময় কেন্দ্রগুলোতেও সঠিক ব্যবস্থাপনার ঘাটতি রয়েছে। একজন উত্তেজিত মানসিক রোগীকে কিভাবে শান্ত করে চিকিৎসাসেবার আওতায় আনা যায়, তা নিয়ে সঠিক মাত্রায় প্রশিক্ষণ যেমন নেই, তেমনি ঘাটতি রয়েছে প্রযুক্তিরও। দক্ষ সেবাকর্মী না হলে এসব ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী মানসিক রোগীদের জন্য বিপদ বয়ে আনে।

আরেকটা সংকট হচ্ছে সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোয় উপযুক্ত পরিবেশ, জনবল, আনুষঙ্গিক বিষয়গুলো সঠিকভাবে আছে কি না তা তদারকি হয় না। মনিটরিং ঠিকভাবে হলে বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা কমে যায়।

মানসিক রোগীদের সেবার নামে নির্যাতন করার অনেক অভিযোগও শোনা যায়। এগুলো অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। তার ওপর যদি অনুমোদনহীন কোনো সেবা প্রতিষ্ঠানে কাউকে চিকিৎসার নামে মেরে ফেলার মতো ঘটনা ঘটে, তা খুবই স্পর্শকাতর। এতে বোঝা যায়, এসব প্রতিষ্ঠানে কর্তৃপক্ষের মনিটরিং ছিল না।

একজন সুস্থ মানুষ আর মানসিকভাবে অসুস্থ মানুষের মধ্যে কিছু পার্থক্য থাকে, যেগুলো খেয়াল করলেই বোঝা যায়। বিশেষ করে যারা মানসিকভাবে অসুস্থ তাদের কথাবার্তা, দৃষ্টি, আচরণগত কিছু পার্থক্য থাকে। এসব খেয়াল করে যদি কোনো মানুষের মধ্যে অস্বাভাবিকতা দেখা যায় তবে তার সঙ্গে অধিকতর মানবিক আচরণ করা দায়িত্বশীল মানুষের কাজ। আর মানসিক রোগীরা গভীরভাবে অন্যের সহানুভূতি প্রত্যাশা করে।

যাঁরা হাসপাতাল কিংবা নিরাময় কেন্দ্রে মানসিক রোগীদের নিয়ে কাজ করেন, তাঁদের অধিকতর সতর্কতা ও দক্ষতা থাকতে হবে। যে রোগীকে সহজে নিয়ন্ত্রণে আনা যায় না তার সঙ্গে কিভাবে সহনশীল অচরণ করতে হবে সে বিষয়ে প্রশিক্ষণ থাকতে হবে। আমাদের দেশে কোনো কোনো হাসপাতালে কিছু অত্যাধুনিক প্রযুক্তি এসেছে, সেগুলোর পরিধি আরো বাড়ানো দরকার। যেমন একধরনের পোশাক এসেছে, যা উত্তেজিত মানসিক রোগীদের নিয়ন্ত্রণে ব্যবহার করা হচ্ছে। যেসব হাসপাতালে এ ধরনের উপকরণ নেই সেখানে বিকল্প হিসেবে এমন আচরণ করতে হবে, যাতে রোগী কোনোভাবে শারীরিক আঘাতপ্রাপ্ত না হয়। আর নিয়মতান্ত্রিক যেসব ওষুধ ব্যবহার করা দরকার, তা অতিমাত্রায় ব্যবহার করা যাবে না। যাঁরা মানসিক রোগী নিয়ে কাজ করবেন তাঁরা কিভাবে বিষয়টি সামলাবেন তা চিকিৎসাসংক্রান্ত বইয়ে লেখা আছে। এসব বিষয়ে পড়াশোনার ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে বলতে হয়, দেশে মানসিক রোগী কিংবা মাদকসেবীদের চিকিৎসাসেবা ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের উন্নয়ন দরকার। মানুষের মধ্যেও পারিবারিক এবং সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।

লেখক : চেয়ারম্যান, মনোরোগ বিদ্যা বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা