kalerkantho

রবিবার । ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৯ নভেম্বর ২০২০। ১৩ রবিউস সানি ১৪৪২

বাংলাদেশে বিশ্লেষণ

গণতন্ত্র মানবাধিকার ফেরাবেন বাইডেন

কূটনৈতিক প্রতিবেদক    

১ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



গণতন্ত্র মানবাধিকার ফেরাবেন বাইডেন

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি থেকে কার্যত ‘হারিয়ে যাওয়া’ গণতন্ত্র, মানবাধিকার, আইনের শাসন ফেরানোর অঙ্গীকার করেছেন ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী জো বাইডেন। একই সঙ্গে তিনি অঙ্গীকার করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নীতির সঙ্গে পররাষ্ট্রনীতির বাধ্যতামূলক সম্পৃক্ততা রাখার বিষয়ে। গতকাল শনিবার ঢাকায় এক ওয়েবিনারে সাবেক পররাষ্ট্রসচিব মো. শহীদুল হক বলেছেন, নানা সূত্রে বিগত বছরগুলোতে তাঁর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের করিডরে হাঁটার সুযোগ হয়েছে। ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আমলে পররাষ্ট্র দপ্তরের কক্ষগুলো কেবল খালিই হয়নি, হতাশাও ভর করেছে। অন্যদিকে হোয়াইট হাউসে ‘সমান্তরাল পররাষ্ট্র দপ্তর’ তৈরি করা হয়েছিল। ট্রাম্প প্রশাসন প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থা রাখেনি। অন্যদিকে জো বাইডেন বরাবরই প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থা রাখা একজন মানুষ। শিক্ষাবিদ, পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ে অভিজ্ঞ দুই হাজারেরও বেশি বিশেষজ্ঞকে তিনি দায়িত্ব দিয়েছেন নতুন পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নের জন্য। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে তিনি জলবায়ু চুক্তিতে ফেরার, মানবাধিকার ইস্যুতে বিশ্বে আবার যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব ফেরানোর অঙ্গীকার করেছেন।

শহীদুল হক বলেন, ‘বাইডেন গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও মানবাধিকারকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে ফিরিয়ে আনবেন বলেই মনে করা যায়। ট্রাম্প এটি একদমই বাদ দিয়ে দিয়েছিলেন। ট্রাম্প শুধু মানবাধিকার পরিষদ থেকেই বেরিয়ে আসেননি, দ্বিপক্ষীয় পর্যায়েও সেগুলো কখনো গুরুত্ব পায়নি। কেবল পররাষ্ট্র দপ্তর কিছু কথাবার্তা বলেছে।’

আগামী মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন এবং দক্ষিণ এশিয়ার ওপর এর প্রভাব বিষয়ে গতকাল ঢাকায় নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগ এবং সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব পলিসি অ্যান্ড গভর্নেন্স (এসআইপিজি) আয়োজিত ওয়েবিনারে এ অভিমত জানান এসআইপিজির সিনিয়র ফেলো মো. শহীদুল হক। আলোচনা অনুষ্ঠানে অন্য বক্তারা বলেন, এবারের নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্রকে একটি বড় পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন আবারও ক্ষমতায় এলে বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান আরো দুর্বল হবে। অন্যদিকে বাইডেন ক্ষমতায় এলে রাজনীতি আবারও রাজনীতিবিদদের হাতে ফিরবে। পররাষ্ট্রনীতিতে অনেক পরিবর্তন আসবে। তবে ট্রাম্প, বাইডেন যে-ই ক্ষমতায় আসুক না কেন বাংলাদেশের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য তেমন কোনো পরিবর্তন হওয়ার কথা নয়।

যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটি রাজনীতি ও সরকার বিভাগ ডিস্টিংগুইশড অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের সবচেয়ে বড় বিষয় হলো পররাষ্ট্রনীতি ও অভ্যন্তরীণ নীতি পুরোপুরি বদলে ফেলা। অতীতে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে রিপাবলিকান, ডেমোক্রেট নির্বিশেষে পররাষ্ট্রনীতিতে ধারাবাহিকতা আছে। সেটা ট্রাম্প পুরোপুরি শেষ করে দিয়েছে।

তিনি বলেন, বাইডেন প্রশাসনের কাজ হবে এটিকে বদলানো। প্যারিস জলবায়ু চুক্তি, ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি, ট্রান্স প্যাসিফিক পার্টনারশিপ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনেসকো থেকে বেরিয়ে আসা, ন্যাটো সম্পর্কে রীতিমতো বিপজ্জনক মন্তব্য করা—যেগুলো রিপাবলিকান করেছে, তা বদলাতে হবে বাইডেনকে।

আলী রীয়াজ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ট্রাম্পের সময়ে যুদ্ধ করেনি ঠিক, কিন্তু বিভিন্ন জায়গায় লোক মেরেছে। তিনি বলেন, আধিপত্যবাদী রাষ্ট্র হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ করে। এটি একটি জঘন্য বিষয়। আধিপত্যবাদী রাষ্ট্র হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক গণতন্ত্রের ধারক যদি না থাকে তাহলে পৃথিবীজুড়ে ‘পপুলিস্ট’ এবং ‘টোটালিটারিয়ান রেজিম’ তৈরি হয়। 

তিনি আরো বলেন, বাইডেন ক্ষমতায় এলে এশিয়ার ক্ষেত্রে বড় তিনটি প্রভাব পড়বে। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রকে এশিয়ার দিকে মনোযোগ দিতেই হবে। ক্ষমতার ভরকেন্দ্র ক্রমাগতভাবে এশিয়ার দিকে চলে এসেছে। বাণিজ্যিক, অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব এশিয়ায় সুনিশ্চিত। ট্রাম্প ছাড়া অন্য যে প্রশাসনই আসুক, সে-ই এশিয়ার দিকে দৃষ্টি দিবে। দ্বিতীয়ত, বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক স্বার্থ বিবেচনায় যুক্তরাষ্ট্রকে যেখানে দাঁড়াতে হবে সেটা হচ্ছে এশিয়াকেন্দ্রিক। তার বাইরে ইউরোপকেন্দ্রিক হওয়ার আর কোনো সুযোগ নেই। তৃতীয়ত, সামরিক, অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে চীনের উত্থানকে আমলে নিতে হবে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএস) সাবেক চেয়ারম্যান ও চীনে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুনশি ফয়েজ আহমেদ বলেছেন, সবাই যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনকে অস্বাভাবিক হিসেবে দেখছেন। অন্য ইস্যুর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কভিড-১৯ মোকাবেলা এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ব্যক্তিগত চরিত্র, আচরণ ও কাজের ধরন। তাঁর আচরণের কাছে বিশেষ কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠী তাঁর প্রতি অতি আকৃষ্ট। মার্কিন নাগরিকদের বড় অংশ তাঁর প্রতি সন্দিহান এবং তাঁকে অপছন্দ করে।

সাবেক নির্বাচন কমিশনার, নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও এসআইপিজির সিনিয়র ফেলো ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘রোহিঙ্গা ইস্যু ক্রমেই জটিল হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র বলছে, তারা সমাধান করবে। কিভাবে করবে আমরা জানি না। এই নীতিও এতখানি আগ্রাসী থাকবে কি না আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে।’

তিনি বলেন, ‘যদি ডেমোক্র্যাটরা ক্ষমতায় আসেন, তাহলে হয়তো পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে একটা ভারসাম্য আসবে। চীনের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ সম্পর্ক রেখে যুক্তরাষ্ট্র খুব লাভবান হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না। সে জায়গায় আমরা হয়তো কিছুটা নমনীয় অবস্থান দেখব।’

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. রাজ কুমার কোঠারি বলেন, জো বাইডেন ক্ষমতায় এলেও ভারত-মার্কিন সম্পর্ক গভীর হবে। কারণ ভারতকে বাদ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে এশিয়ায় সুসম্পর্কের বিস্তৃতি সম্ভব নয়।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক সাহাব এনাম খান মনে করেন, যদিও পৃথিবীর ওপর থেকে পুলিশি ব্যবস্থা সরিয়ে নিয়েছে ট্রাম্প-প্রশাসন; কিন্তু ট্রাম্পই প্রথম যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট, যিনি নির্বাচিত হয়েছিলেন কেবল যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে, পুরো বিশ্বের জন্যে নয়।

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান এবং এসআইপিজির পরিচালক অধ্যাপক ড. তৌফিক এম হকের সঞ্চালনায় উপাচার্য অধ্যাপক আতিকুল ইসলাম, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান, সহকারী অধ্যাপক মো. হারিছুর রহমান যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা