kalerkantho

শনিবার । ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৮ নভেম্বর ২০২০। ১২ রবিউস সানি ১৪৪২

অক্সফোর্ড ও রাশিয়ার কিছু ভ্যাকসিন নভেম্বরেই দেশে!

তৌফিক মারুফ   

২৯ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



অক্সফোর্ড ও রাশিয়ার কিছু ভ্যাকসিন নভেম্বরেই দেশে!

করোনাভাইরাসের ছয়টি ভ্যাকসিন বিভিন্ন দেশে অনুমোদন পেয়ে গেছে স্বল্প পরিসরে ব্যবহারের জন্য। এই ছয়টিসহ মোট ১১টি ভ্যাকসিন এখন তৃতীয় ধাপের ট্রায়ালে রয়েছে। যদিও এখন পর্যন্ত কোনো ভ্যাকসিনই যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অথরিটি (এফডিএ) থেকে চূড়ান্ত অনুমোদন পায়নি। তবে উদ্ভাবনে লেগে থাকা কম্পানিগুলোসহ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, চীন ও ভারতের বিভিন্ন পর্যায়ের রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এবং কিছু বিজ্ঞানীর কথা থেকে তিন-চারটি ভ্যাকসিন নভেম্বর-ডিসেম্বরের মধ্যেই অনুমোদন পেয়ে যাওয়ার আভাস রয়েছে। এ ক্ষেত্রে অ্যাস্ট্রেজেনিকা-অক্সফোর্ডের, ফাইজার-বায়োনটেকের, মর্ডানার ও সিনোফার্মা বা সিনোভেকের ভ্যাকসিনের কথা শোনা যাচ্ছে বেশি। সেই সঙ্গে রাশিয়ার স্পুিনক-ভি নিয়েও আশার কথা শোনাচ্ছে দেশটির সরকার। নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক তথ্য সূত্র থেকে পাওয়া যাচ্ছে এমন চিত্র।

তবে বাংলাদেশের জন্য কিছুটা বাড়তি আশার আলো দেখা যাচ্ছে অ্যাস্ট্রেজেনিকা-অক্সফোর্ডের ও রাশিয়ার স্পুিনক-ভি ভ্যাকসিন নিয়ে। ভারতের একাধিক সূত্র থেকে জানা গেছে, নভেম্বরের মধ্যেই ভারতে এই দুটি ভ্যাকসিনের স্বল্প পরিসরে ব্যবহারের অনুমতি মিলতে পারে। ভারতের স্বাস্থ্য বিভাগ কোনো কোনো রাজ্যে এই ভ্যাকসিন প্রয়োগের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে। আর ভারত হয়ে ভ্যাকসিন দুটি বাংলাদেশে আনার ব্যাপারেও বাংলাদেশের দুটি কম্পানি জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এ ব্যাপারে ভারতের দুটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট দুটি কম্পানির চুক্তির প্রক্রিয়া প্রায় চূড়ান্ত। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশের এ দুই কম্পানি নভেম্বর নাগাদ কিছু পরিমাণ ভ্যাকসিন দেশে নিয়ে আসা এবং প্রয়োগের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। সরকারের কাছে অনুমোদনের জন্য আবেদনও করেছে। এ ছাড়া আগাম ভ্যাকসিন নিতে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে ছুটছেন বাংলাদেশের কেউ কেউ—এমন তথ্য মিলছে বিভিন্ন সূত্র থেকে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অক্সফোর্ড ও রাশিয়ার ভ্যাকসিন আনতে দেশের দুটি বড় ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান সার্বিক প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। এ ছাড়া রাশিয়ার ভ্যাকসিনের বিষয়ে দুই দেশের সরকারি পর্যায়েও আলোচনা চলছে। পাশাপাশি ভারত বায়োটেক আমাদের এখানে ট্রায়াল করবে আইসিডিডিআরবির সঙ্গে। এই প্রক্রিয়াও এগিয়েছে। অন্যদিকে সানোফির ভ্যাকসিনের ট্রায়ালের জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে প্রক্রিয়া চলছে।’

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) তথ্য অনুসারে এ পর্যন্ত বিভিন্ন দেশে মানবদেহে পরীক্ষামূলক প্রয়োগ চলা ভ্যাকসিনের সংখ্যা ৪৮টি। এ ছাড়া আরো ৮৮টি রয়েছে প্রাণীর ওপর প্রয়োগের পর্যায়ে। মানবদেহে প্রয়োগের আওতায় থাকা ৩৪টি রয়েছে প্রথম ধাপে, ১৪টি রয়েছে দ্বিতীয় ধাপে, ১১টি রয়েছে তৃতীয় ধাপে। করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন মানবদেহে কমপক্ষে ৫০ শতাংশ নিরাপদ হলেই তা গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচনায় নেওয়ার নির্দেশনা দিয়ে রেখেছে ডাব্লিউএইচও। ফলে তৃতীয় ধাপে থাকা ভ্যাকসিনগুলোর মধ্য থেকে বেশ কয়েকটির অনুমোদন পাওয়া অনেকটাই সহজ হয়ে উঠছে বলে মত দিয়েছেন কেউ কেউ।

রাশিয়া ও চীন চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় না থেকেই তাদের দুটি ভ্যাকসিন তৃতীয় ধাপের ট্রায়াল শুরুর পর আগাম প্রয়োগের অনুমোদনও দিয়েছে, যা নিয়ে ডাব্লিউএইচওসহ বিভিন্ন পর্যায় থেকে সমালোচনাও রয়েছে। তৃতীয় ধাপের ট্রায়ালে থাকা ভ্যাকসিনগুলোর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের মর্ডানা ও ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথের (এনআইএইচ) একটি ভ্যাকসিন। মর্ডানা সূত্র জানিয়েছে, তারা তাদের তৃতীয় ধাপের ট্রায়ালের আওতায় ৩০ হাজার স্বেচ্ছাসেবীর শরীরে ভ্যাকসিন প্রয়োগ সম্পন্ন করেছে, যাঁদের মধ্যে সাত হাজার রয়েছেন ৬৫ বছরের বেশি বয়সী মানুষ। এখন তাদের ফলাফল বিশ্লেষণ চলছে, যেখানে তারা খুবই আশাব্যঞ্জক ফল পাচ্ছে। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র সরকার দেড় বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করেছে এই কম্পানির ১০০ মিলিয়ন ভ্যাকসিনের জন্য। কানাডা ও কাতার ২০ মিলিয়ন ভ্যাকসিন নিতে চুক্তি করেছে মর্ডানার সঙ্গে।

অন্যদিকে বায়োনটেক-ফাইজার ও ফসুনফার্মার উদ্যোগে উদ্ভাবিত ভ্যাকসিনও রয়েছে তৃতীয় ধাপের ট্রায়ালের শেষ পর্যায়ে। এ পর্যন্ত তারা ৪৩ হাজার মানুষের দেহে এই ভ্যাকসিনের পরীক্ষামূলক প্রয়োগ করেছে। ১২ বছরের নিচের শিশুদেরও দেওয়া হয়েছে এই ভ্যাকসিন। যুক্তরাষ্ট্রের কোনো করোনা ভ্যাকসিনের মধ্যে এটাই প্রথম, যা শিশুদের জন্যও উপযোগী করা হচ্ছে। ফাইজারের প্রধান নির্বাহী ড. অ্যালবার্ট বউরলা গত মঙ্গলবারও গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, তাঁদের ভ্যাকসিন চমৎকার কার্যকর হচ্ছে বলে যুক্তরাষ্ট্র সরকার এই ভ্যাকসিনের জন্য ১.৯ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে রেখেছে ১০০ মিলিয়ন ডোজের জন্য। ডিসেম্বরের মধ্যে এটা সরবরাহ করার লক্ষ্য রয়েছে।

এদিকে মর্ডানা ও ফাইজারের ভ্যাকসিনের তাপমাত্রা নিয়ে জটিলতার এখনো সুরাহা হয়নি। যদিও চেষ্টা চলছে তাপমাত্রা ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনার। ফাইজারের ভ্যাকসিন সংরক্ষণ ও পরিবহনের জন্য ন্যূনতম মাইনাস ৮০ ডিসি সেলসিয়াস তাপমাত্রা দরকার হবে।

এদিকে তৃতীয় ধাপের আরেক ভ্যাকসিন হচ্ছে চীনের ক্যানসিনো। চীন সরকার এই ভ্যাকসিনের তৃতীয় ধাপের ট্রায়াল চলা অবস্থায়ই স্বল্প পরিসরে প্রয়োগের অনুমোদন দিয়েছে। সে দেশের সেনাবাহিনীর সদ্যস্যদেরও এই ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা হয়েছে। সৌদি আরব, রাশিয়া ও পাকিস্তানে এই ভ্যাকসিনের তৃতীয় ধাপের ট্রায়াল চলছে।

রাশিয়ার গ্যামেলিয়া রিসার্চ ইনস্টিটিউটের স্পুিনক-ভি তৃতীয় ধাপের ট্রায়াল শুরুর পরপরই দেশটির প্রেসিডেন্ট অনুমোদন দিয়ে দিয়েছেন স্বল্প পরিসরে প্রয়োগের জন্য। রাশিয়ার পাশাপাশি বেলারুশ, ভেনিজুয়েলা, আরব আমিরাত ও ভারতে এই ভ্যাকসিনের তৃতীয় ধাপের ট্রায়াল চলছে। ব্রাজিল, ভারত ও মেক্সিকো এই টিকা নিতে চুক্তি করেছে রাশিয়ার সঙ্গে। তৃতীয় ধাপের আরেক ভ্যাকসিন জনসন অ্যান্ড জনসন। যুক্তরাষ্ট্র সরকার এই ভ্যাকসিনের ১০০ মিলিয়ন ডোজের জন্য এক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নও নেবে ২০০ মিলিয়ন ডোজ।

তৃতীয় ধাপের সবচেয়ে আলোচিত, যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও অ্যাস্ট্রাজেনিকার ভ্যাকসিনটির ট্রায়াল চলছে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ভারতে। ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট এরই মধ্যে এই ভ্যাকসিনের কয়েক মিলিয়ন ডোজ তৈরি করে রেখেছে। যদিও ভ্যাকসিনটির পরীক্ষামূলক প্রয়োগের পর্যায়ে আমেরিকায় একজন অসুস্থ হলে কয়েক দিন ট্রায়াল বন্ধ রাখে কম্পানি। অন্যদিকে ব্রাজিলে এর ট্রায়ালের আওতায় থাকা একজনের মৃত্যুর পর গবেষকরা নিশ্চিত করেছেন, যিনি মারা গেছেন তাঁকে মূলত প্লাসিবো (ভ্যাকসিন নয়, অন্য কিছু) দেওয়া হয়েছিল। ফলে এফডিএ ট্রায়াল চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছে।

তৃতীয় ধাপের আরেক ভ্যাকসিন হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের নোভাভেক্স। মার্কিন সরকার ১.৬ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে রেখেছে এই ভ্যাকসিন পেতে। প্রতিষ্ঠানটি মার্কিন সরকারকে ১০০ মিলিয়ন ডোজ ভ্যাকসিন দেবে। ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের সঙ্গেও চুক্তি করেছে এই প্রতিষ্ঠান।

এ ছাড়া চীনের আরো দুটি ভ্যাকসিন তৃতীয় ধাপে থাকা অবস্থায়ই দেশটির সরকার স্বল্প পরিসরে আগাম ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে। এর একটি হচ্ছে উহান ইস্টটিউট অব বায়োলজিক্যাল প্রডাক্টস লিমিটেড। আরব আমিরাতের সরকারও এই ভ্যাকসিন সে দেশে স্বল্প পরিসরে আগাম ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে। আরব আমিরাত, পেরু ও মরক্কোতে ভ্যাকসিনের ট্রায়াল চলছে।

অন্যদিকে চীনের সিনোভেক কম্পানির ভ্যাকসিনের ট্রায়াল বাংলাদেশে হওয়ার কথা থাকলেও এখনো শুরু হয়নি। তবে তৃতীয় ধাপের ট্রায়ালে থাকা এই ভ্যাকসিন এরই মধ্যেই চীনে স্বল্প পরিসরে ব্যবহারের অনুমোদন মিলেছে। সিনোভেকের প্রধান নির্বাহী এর মধ্যেই ঘোষণা দিয়েছেন, চলতি বছরের শেষ নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রসহ সারা বিশ্বে তাঁদের ভ্যাকসিন পৌঁছে যাবে।

তৃতীয় পর্যায়ে ট্রায়ালের আরেক ভ্যাকসিন হচ্ছে ভারত বায়োটেকের। গত ২৩ অক্টোবর থেকে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে এই ভ্যাকসিনের তৃতীয় ধাপের ট্রায়াল শুরু হয়েছে। বাংলাদেশেও এই ভ্যাকসিনের ট্রায়ালের প্রক্রিয়া চলছে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা