kalerkantho

সোমবার । ৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৩ নভেম্বর ২০২০। ৭ রবিউস সানি ১৪৪২

ফ্লোরিডা অভিজ্ঞতা

ব্যালট গুনতে ভুল হলে চড়া মাসুল

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

২৮ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ব্যালট গুনতে ভুল হলে চড়া মাসুল

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আগে বেশ সহজ ছিল। বেশির ভাগ মানুষ ভোটকেন্দ্রে গিয়ে মেশিনের বোতাম চেপে নিজের পছন্দের প্রার্থীর কথা জানিয়ে আসত। নির্ধারিত সময়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মেশিন ফলাফল জানিয়ে দিত। কভিড-১৯ মহামারির কারণে এবার নির্বাচনী ব্যবস্থা আগের মতো সহজ নেই। ডাকযোগে ভোট বাড়ছে। বাড়ছে জনশক্তির প্রয়োজন। প্রযুক্তি ও আইনগত ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও ঝুঁকি বেড়েছে। রাজ্য আলাদা, তাদের ব্যবস্থা আলাদা, আইন ও নিয়মও আলাদা। বহু আইন বিশেষজ্ঞের আশঙ্কা, ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠেয় নির্বাচন ২০০০ সালের ফ্লোরিডার ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটাতে  পারে। ভোট গড়াতে পারে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত।

সমীক্ষায় দেখা গেছে, ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির তুলনায় অনেক বেশি ডেমোক্রেটিক পার্টির সমর্থক এবার ডাকযোগে ভোট দিচ্ছেন পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে এরই মধ্যে বিভিন্ন রাজ্যে আইনি লড়াই শুরু করেছেন রিপাবলিকানরা। সাম্প্রতিক অতীতের নির্বাচনগুলোতে দেখা যায়, ডাকযোগে ব্যালটে ভুল করার হার প্রায় ১ শতাংশ। কোনো না কোনো ভুলের কারণে এই ব্যালটগুলো প্রত্যাখ্যাত হয়। এবার যেহেতু ডাকযোগে ব্যালটের সংখ্যা বেড়েছে, কাজেই ভুলের হারও হয়তো বাড়বে। যার অর্থ হবে হাজার হাজার বিতর্কিত ভোট। এমন ৫৩৭টি বিতর্কিত ভোটই ২০০০ সালের নির্বাচনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের নিয়ামক হয়ে ওঠে।

২০১৬ সালে মোট ১৩ কোটি ৯০ লাখ আমেরিকান ভোট দেন। এর মধ্যে তিন কোটি ৩০ লাখ ভোট আসে ডাকযোগে। গবেষকদের ধারণা, এ বছর ১৫ কোটি ভোটার আগাম ভোট দেবেন। এর অন্তত অর্ধেক ভোট পড়বে ডাকযোগে।

যুক্তরাষ্ট্রের ৯টি রাজ্য ও ওয়াশিংটন ডিসি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সব ভোটারের কাছেই ডাকযোগে ব্যালট পাঠায়। অন্য রাজ্যগুলোতে ভোটারদের এ জন্য অনুরোধ করতে হয়। অতীতে বিষয়টি শুধু ‘অনুপস্থিত’ ভোটারদের জন্য প্রযোজ্য ছিল। তবে এবার সব রাজ্যে না হলেও বহু রাজ্যেই সব ভোটারের জন্য এই ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

প্রতিটি রাজ্যেই নিয়ম আলাদা। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ব্যবস্থাটি হচ্ছে, ভোটার ব্যালট পেপার পূরণ করে ফিরতি খামে স্বাক্ষর করে ব্যালট ভরে পাঠিয়ে দেবেন বা নির্ধারিত চিঠির বাক্সে তা ফেলে আসবেন। কয়েকটি রাজ্যে বাড়তি একটি প্যাকেটে ভরার পর ব্যালটটি খামে ঢোকানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ওই বাড়তি প্যাকেটটিকে বলা হয় ‘সিক্রেট স্লিভস’। গোপনীয়তা রক্ষাই এর মূল উদ্দেশ্য। ফ্লোরিডায় এ বিধান রয়েছে। অন্যথায় ব্যালট প্রত্যাখ্যাত হবে।

কয়েকটি রাজ্যে ভোটারকে একজন সাক্ষীর স্বাক্ষরও জোগাড় করতে হয়। খামে ভোটার ও সাক্ষীর স্বাক্ষর থাকার বিধান রয়েছে ওই রাজ্যগুলোতে। একই সঙ্গে সাক্ষীর সঙ্গে যোগাযোগের ঠিকানাও দিতে হবে। এদিক থেকে সবচেয়ে কঠোর ব্যবস্থা আলাবামায়। সেখানে দুজন সাক্ষীর স্বাক্ষরের প্রয়োজন হয়।

কেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে যাঁরা ভোট দেন তাঁদের ভোট গণনা করে মেশিন, স্বয়ংক্রিয়ভাবে। সে ক্ষেত্রে ভোট শেষ হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই ফলাফল জানিয়ে দেওয়া সম্ভব। তবে ডাকযোগে ভোটের প্রক্রিয়া বেশ শ্রমসাধ্য। ভোট গণনার ক্ষেত্রেও রাজ্যভেদে ব্যবস্থা ভিন্ন। কয়েকটি রাজ্যে নির্বাচনের দিন পর্যন্ত যত ব্যালট ডাকযোগে আসে শুধু সেগুলোই গ্রহণ করা হয়। অন্য রাজ্যগুলোতে  ভোটের ১০ দিন পরও ব্যালট গ্রহণ করা হয়। তবে সে ক্ষেত্রে ডাকে ভোটের দিন পর্যন্ত তারিখ গ্রহণযোগ্য হয়।

ভোটারের স্বাক্ষরের সত্যতা যাচাই, খাম খোলা এবং ব্যালট বের করে গণনার প্রক্রিয়া একেক রাজ্যে একেক রকম। যেমন—কলোরাডোতে ব্যালট পাওয়ামাত্র খোলা হয়। গণনার কাজটি করে মেশিন। নির্বাচনের ১৫ দিন আগে এই প্রক্রিয়া শুরু করা হয়। তবে নির্বাচনের দিন সন্ধ্যা ৭টার আগে ফলাফল জানানো হয় না।

ডাকযোগে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে এবার সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায় খোদ ডাক বিভাগ। ভোটের বেশ আগেই তাদের জনবল কাটছাঁট করা হয়। অনেকেই মনে করেন, রিপাবলিকানরা ইচ্ছা করেই প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে এই ব্যবস্থা নিয়েছিলেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে মেইলে আসা ভোট গুনতে কয়েক দিন লেগে যাবে।

পরের প্রতিবন্ধকটি হচ্ছে ভোটারের স্বাক্ষরের সত্যতা যাচাই। কয়েকটি রাজ্যের সংকট নিরসনের জন্য স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা রয়েছে। তবে বাকি রাজ্যগুলোতে কাজটি মানুষ সম্পন্ন করে। নির্বাচনী কর্মীরা তাঁদের কাছে সংরক্ষিত ফাইল থেকে চোখে দেখে স্বাক্ষর মেলান। সমস্যা হচ্ছে, সময়ের সঙ্গে বহু মানুষের স্বাক্ষরে পরিবর্তন আসে। বিশেষ করে যাঁরা প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন তাঁদের নিজস্ব স্বাক্ষর না-ও থাকতে পারে। আর থাকলেও তা হয়তো ভোটার হওয়ার সময় নথিবদ্ধ করা হয়নি—এমনও হতে পারে। এসব ব্যালট প্রত্যাখ্যাত হয়। কয়েকটি রাজ্য এ ক্ষেত্রে ভোটারকে ডেকে এনে স্বাক্ষর মেলানোর চেষ্টা করে। এভাবে ব্যালটের শুদ্ধতা নিশ্চিত হওয়া গেলেও বিষয়টি সময়সাপেক্ষ।

এসব নিয়ে কয়েক মাসের আইনি লড়াইয়ের পর নর্থ ক্যারোলাইনার আদালত সিদ্ধান্ত নেন, ভোটারদের ব্যালট শোধরানোর সুযোগ দেওয়া হবে।

আবার সিক্রেট স্লিভস না থাকলে ভোট বাতিল হবে কি না তা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। পেনসিলভানিয়ায় রিপাবলিকানদের দায়ের করা এক মামলার রায়ে বলা হয়, সিক্রেট স্লিভস ছাড়া খালি ব্যালট গণনা করা হবে না। তবে অন্য রাজ্যে এমন ব্যালটও গ্রহণযোগ্য।

দোদুল্যমান রাজ্যগুলোতে দুই দলই তাদের আইনি কমিটিকে শক্তিশালী করার কাজ শুরু করেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অবশ্য অনেক আগে থেকেই ডাকযোগে ব্যালটের ব্যাপারে তাঁর আপত্তির কথা জানিয়েছেন। এরই মধ্যে ৪৪টি রাজ্যে এ নিয়ে তিন শতাধিক মামলা করা হয়েছে।

২০০০ সালে রিপাবলিকান প্রার্থী জর্জ ডাব্লিউ বুশ ও ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আল গোরের মধ্যে নির্বাচনের ফল ফ্লোরিডার ৫৩৭টি ব্যালটে গিয়ে আটকে যায়। কয়েকবার করে গণনা করা হয় ব্যালটগুলো। প্রতিটি ব্যালটের যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে—ডাকঘরের সিল যথার্থ কি না, স্বাক্ষর জালিয়াতি হয়েছে কি না, ঠিকানা ঠিক আছে তো? এমন বহু প্রশ্ন ওঠে। যার মীমাংসার জন্য শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টের দারস্থ হতে হয়। সর্বোচ্চ আদালত বুশের পক্ষে মত দেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পও এবার সুপ্রিম কোর্টকে আঁকড়ে ধরেই আশাবাদী হতে চান। অন্তত তাড়াহুড়ো করে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগের বিষয়টি সে কথাই প্রমাণ করে। সূত্র : এএফপি।

 

মন্তব্য