kalerkantho

সোমবার । ৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৩ নভেম্বর ২০২০। ৭ রবিউস সানি ১৪৪২

মাস্ক ব্যবহারে উন্নতি, গাফিলতি অন্য উদ্যোগে

বাহরাম খান   

২৮ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মাস্ক ব্যবহারে উন্নতি, গাফিলতি অন্য উদ্যোগে

মাস্কের ব্যবহার বাড়লেও হাত ধোয়া, তাপমাত্রা মাপার প্রবণতা একেবারেই কম। গতকাল সচিবালয়ের গেটে স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে এমন ঢিলেঢালা ভাবই লক্ষ করা গেছে। ছবি : কালের কণ্ঠ

সচিবালয়ে মাস্ক ব্যবহার আগের তুলনায় বেড়েছে। তবে করোনাভাইরাস সংক্রমণ মোকাবেলায় মন্ত্রণালয়ভিত্তিক আরো যেসব কার্যক্রম ছিল সেসব উদ্যোগ কমেছে। অর্থাৎ করোনা প্রতিরোধে সচিবালয়ে দৃশ্যমান সচেতনতা বাড়লেও অন্য বিষয়গুলোতে ভাটা পড়েছে।

করোনার কারণে সাধারণ ছুটি শেষে সচিবালয় খোলার পর হেঁটে প্রবেশ করার পথে থার্মোমিটার দিয়ে শরীরের তাপমাত্রা মাপা ও হাত স্যানিটাইজ করার ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু এখন সেটা নেই। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কমন বাথরুমগুলোতে সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা ছিল। এখন বেশির ভাগ মন্ত্রণালয়ের বাথরুমে সাবান বা অন্য কোনো হ্যান্ড ওয়াশের দেখা মিলছে না।

গতকাল মঙ্গলবার সকাল পৌনে ১১টার দিকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোহসিনের কক্ষে ঢুকে দেখা গেল তিনি জুম মিটিংয়ে ব্যস্ত। প্রতিবেদকের উপস্থিতির সঙ্গে সঙ্গে মুখে মাস্ক পরে নেন। মাস্ক সচেতনতার কথা জানতে চাইলে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রুমের মধ্যে একা থাকলে মাস্ক খুলে রাখি। কেউ ঢুকলে সঙ্গে সঙ্গে মাস্ক পরে নিই।’ নিজের সচেতনতার গুরুত্বের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে ত্রাণসচিব বলেন, ‘আমার দায়িত্ব মন্ত্রণালয়ের সবাইকে এ বিষয়ে সচেতন করা। সচেতন শুধু মুখে করলেই হবে না। আমি নিজে কী করছি, আমার অধস্তনরা সেটাও খেয়াল করেন। তাই আমি নিজে নিয়মটা মানার চেষ্টা করি বেশি।’

গতকাল সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়সহ বেশ কয়েকটি মন্ত্রণালয় ঘুরে দেখা গেছে, বেশির ভাগ কর্মকর্তা-কর্মচারী মাস্ক পরেছেন। যাঁরা সচিবালয়ে দর্শনার্থী হিসেবে ঢুকছেন তাঁদের মধ্যে মাস্ক পরার প্রবণতা বেড়েছে।

উল্লেখ্য, করোনাকালে সচিবালয় খোলার পর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে দর্শনার্থী ঢোকার ব্যবস্থা বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে এই সময়ে অনানুষ্ঠানিকভাবে অনেক দর্শনার্থী সচিবালয়ে ঢুকছেন। মন্ত্রী ও সচিব দপ্তর থেকে সুপারিশের মাধ্যমে অনেক দর্শনার্থী সচিবালয়ে ঢুকছেন।

ভূমি মন্ত্রণালয়ে কথা হলো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘সাউথ বাংলা ফার্ম’-এর একজন পরিচালক আশরাফ হোসেনের সঙ্গে। একজন কর্মকর্তার কক্ষে আলাপকালে সচিবালয়ে কিভাবে ঢুকলেন জানতে চাইলে তিনি মুচকি হেসে বলেন, ‘পরিচিত একজনের মাধ্যমে ঢুকেছি, এর বেশি কিছু জানতে চাইয়েন না প্লিজ।’

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যেসব মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রীরা নিয়মিত অফিস করেন সেসব মন্ত্রণালয়ে স্বাস্থ্যবিধি মানার প্রবণতা বেশি। প্রায় সব মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী নিয়মিত অফিস করলেও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী নিয়মিত অফিস এখনো শুরু করেননি। হোম অফিস থেকেই সক্রিয় আছেন তিনি। কিন্তু মন্ত্রীর অফিসে না আসার কারণে খাদ্য মন্ত্রণালয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দিক থেকে কিছুটা শিথিলতা চোখে পড়েছে। সচিবালয়ের ৪ নম্বর ভবনের দ্বিতীয় তলায় ওই মন্ত্রণালয়ের একটি কমন বাথরুমে গিয়ে সাবানের দেখা মেলেনি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মন্ত্রণালয়টির প্রশাসন অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মজিবর রহমান গতকাল সন্ধ্যায় কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘স্বাস্থ্যবিধি মানার বিষয়ে নিয়মিত নজরদারি রাখা হচ্ছে। কোনো কারণে হয়তো ঘাটতি থাকতে পারে। আগামীকালই (আজ) আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।’

সচিবালয়ের ৩ নম্বর ভবনের সিঁড়ির গোড়ায় থাকা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বাথরুমের বেসিনের সামনে সাবান বা লিকুইড কোনো পরিষ্কারক দ্রব্যের দেখা মেলেনি।

মন্ত্রিপরিষদসচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম বিগত একাধিক মন্ত্রিসভা বৈঠক শেষে করা সংবাদ সম্মেলনে মাস্ক ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন। গত রবিবার মন্ত্রিসভার সর্বশেষ বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, সরকারি-বেসরকারি দপ্তরে মাস্ক না পরে গেলে কোনো সেবা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এই ঘোষণার পর সচিবালয়ে মাস্ক ব্যবহারে উন্নতি হলেও মাঠে তেমন প্রভাব পড়েনি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, সচিবালয়ে তুলনামূলক সচেতন লোকজন আসেন। এখানে এসব নিয়ম মানানো সহজ। কিন্তু শপিং মল, কাঁচাবাজার, গণপরিবহন, সাধারণ চলাফেরায় মাস্ক বাধ্যতামূলক বলা হলেও মানুষকে মানানো কঠিন। পাশে থাকা অন্য এক কর্মকর্তা যুক্তি দিয়ে বলেন, করোনার শুরুর দিকে ঢাকা ও বড় শহরগুলোতে মাস্ক পরার প্রবণতা ভালো ছিল। কিন্তু মফস্বলে সেটা একেবারেই ছিল না, এখনো নেই। বরং এখন ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতেও সব কিছু স্বাভাবিক সময়ের মতো চলছে, বিপরীতে সাধারণ পরিসরে মাস্ক পরা কমেছে।

মাঠ প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, মাস্ক পরিধানসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি মানতে মন্ত্রিপরিষদ থেকে দফায় দফায় বিভিন্ন নির্দেশনা মাঠ প্রশাসনে দেওয়া হচ্ছে। এমনও বলা হয়েছে, মাস্ক না পরলে আইনি ব্যবস্থা নিতে। কিন্তু বাস্তবতা উল্টো। জেলা-উপজেলাগুলোতে বেশির ভাগ মানুষই মাস্ক পরে না। সেখানে আইন প্রয়োগ করতে গেলে হিতে বিপরীত হতে পারে।

জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জেলা ও মাঠ প্রশাসন অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব শেখ রফিকুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, গত রবিবারও স্বাস্থ্যবিধি মানার বিষয়ে নতুন নির্দেশনা মাঠ প্রশাসনে পাঠানো হয়েছে। বিশেষ করে সরকারি দপ্তরে মাস্ক ছাড়া সেবা না দিতে কঠোরভাবে বলা হয়েছে। যাঁরা মানছেন না তাঁদের প্রথমে সচেতন করতে বলা হচ্ছে। যদি তাতেও কাজ না হয় তাহলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে আইনি পদক্ষেপ নিতে নির্দেশনা দেওয়া আছে।

 

মন্তব্য