kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ১ ডিসেম্বর ২০২০। ১৫ রবিউস সানি ১৪৪২

মিয়ানমারকে স্ট্র্যাটেজিক উপহার

চীননির্ভরতা কমাতে ভারতের সাবমেরিন!

কূটনৈতিক প্রতিবেদক   

২৭ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



চীননির্ভরতা কমাতে ভারতের সাবমেরিন!

মিয়ানমারকে গত ১৯ বছর ধরে অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামের ৪২ শতাংশের জোগান দিয়েছে চীন। রাশিয়া দিয়েছে ৪৩ শতাংশ। রাশিয়া নিয়ে এই অঞ্চলে আপাতত দুশ্চিন্তা নেই—এমন প্রেক্ষাপটে চীনের দিকে দৃষ্টি রেখে মিয়ানমারকে সাবমেরিন দিয়েছে ভারত। নয়াদিল্লির এই নৌ কূটনীতি তার বড় পরিসরে ইন্দো-প্যাসিফিক লক্ষ্য পূরণে সহযোগিতা করবে বলে বিশ্লেষকরা আশা করছেন। এশিয়াভিত্তিক বিশ্বের সর্ববৃহৎ অথর্নীতিবিষয়ক ম্যাগাজিন নিক্কেই এশিয়ায় এক বিশ্লেষণে এমনটা বলা হয়েছে।

এদিকে মিয়ানমার ভারতের সাবমেরিন পেলে স্ট্র্যাটেজিকভাবে বাংলাদেশের ওপর কী প্রভাব পড়তে পারে, তা নিয়েও বিভিন্ন মহলে আলোচনা ও বিশ্লেষণ চলছে। ভারতের প্রতিরক্ষা ও স্ট্র্যাটেজিক বিশ্লেষক এন সি বিপিন্দ্রর বরাত দিয়ে নিক্কেইয়ের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ‘লক্ষণীয় বিষয় হলো, প্রতিবেশী বাংলাদেশ ২০১৬ সালে চীনের কাছ থেকে দুটি মিং-ক্লাস ডিজেল-ইলেকট্রিক সাবমেরিন কেনার পর মিয়ানমার ওই সাবমেরিনগুলো (ভারতের কাছ থেকে) কেনার পরিকল্পনা নেয়। ঘটনাচক্রে, চীনের সহযোগিতায় একটি সাবমেরিন ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে বাংলাদেশের।’

চীনের কাছ থেকে বাংলাদেশের সাবমেরিন কেনা নিয়ে ভারতের গণমাধ্যমের বিশ্লেষণে উদ্বেগের ছাপ ছিল। গত বছর বাংলাদেশ উপকূলে রাডার ব্যবস্থা স্থাপনের বিষয়ে বাংলাদেশ-ভারত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়।

মিয়ানমারকে ভারত তার যে ডিজেল-ইলেকট্রিক সাবমেরিন দিয়েছে, তার নাম ছিল আইএনএস সিন্ধুবীর। এটি ভারতের প্রথম সাবমেরিন, যা ১৯৮৮ সালে ভারতের নৌবাহিনীতে কমিশন লাভ করে। রাষ্ট্র পরিচালিত প্রতিরক্ষা জাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হিন্দুস্তান শিপইয়ার্ডে এটি নতুন করে সাজানো হয়েছে। সর্বোচ্চ ১৮ নটিক্যাল মাইল গতিতে এটি ৩০০ মিটার গভীরেও চলাচল করতে পারে। মিয়ানমারের নৌবাহিনীতে ওই সাবমেরিনের নাম দেওয়া হয়েছে ‘ইউএমএস মিন এ থেইন খা থু’।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র অনুরাগ শ্রীবাস্তব সম্প্রতি এক ব্রিফিংয়ে বলেন, সমুদ্র খাতে সহযোগিতা মিয়ানমারের সঙ্গে ভারতের বৈচিত্র্যময় ও বর্ধিত সম্পৃক্ততার অংশ। ভারত এরই প্রেক্ষাপটে মিয়ানমার নৌবাহিনীকে কিলো-ক্লাস সাবমেরিন আইএনএস সিন্ধুবীর দিয়েছে।

ভারতের সেনাপ্রধান জেনারেল মনোজ মুকুন্দ নারাভানে ও পররাষ্ট্রসচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা গত ৪ ও ৫ অক্টোবর মিয়ানমার সফর করেন। এই সফর ঘিরে মিয়ানমারের সঙ্গে ভারতের প্রতিরক্ষাসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। গত ১৫ অক্টোবর মিয়ানমারের প্রতিরক্ষা বাহিনী ও ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সাবমেরিন উপহারের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়।

নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বিষয়ক যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান জেনস ইনফরমেশন গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ অক্টোবর থেকে মিয়ানমার নৌবাহিনী যে অনুশীলন করেছে, তাতে বিশেষ আকর্ষণ ছিল ভারতের দেওয়া সাবমেরিন। সম্ভবত গত ফেব্রুয়ারি মাসে তা ভারতকে হস্তান্তর করা হয়েছে।

জেনসের তথ্য অনুযায়ী, ভারত তার প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর চীনের প্রভাব কমাতে আগ্রহী। নিরাপত্তা দৃষ্টিকোণ থেকে ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলো, বিশেষ করে মিয়ারমার এখন চীন ও ভারত—দুই দেশের কাছ থেকেই সহজ শর্তে ও ঋণে সামরিক সরঞ্জাম পাচ্ছে।

নিক্কেই এশিয়ার প্রতিবেদনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মিয়ানমারে ভারতের স্বার্থ রয়েছে। নয়াদিল্লিভিত্তিক ইনস্টিটিউট অব চায়নিজ স্টাডিজের ভিজিটিং অ্যাসোসিয়েট ফেলো শামসাদ আহমাদ খানের মতে, মিয়ানমারকে ভারতের সাবমেরিন প্রদান চীনের আগ্রাসন মোকাবেলায় একটি সুপরিকল্পিত কৌশল বলে মনে হচ্ছে। এর মাধ্যমে ভারত স্পষ্টতই তার পূর্বাঞ্চলীয় প্রতিবেশী রাষ্ট্রে চীনের সঙ্গে শক্তির ভারসাম্য বাড়ানোর চেষ্টা করছে। চীনের সঙ্গে ভারতের সীমান্তে কয়েক মাস ধরে বিরোধ ও উত্তেজনার মধ্যে চীনের নৌবাহিনীর বিরুদ্ধে নয়াদিল্লি তার নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা অংশীদারদের সক্ষমতা বাড়ানোর দিকেই দৃষ্টি দিচ্ছে।

ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির ডিফেন্স ও স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের অধ্যাপক পঙ্কজ ঝার মতে, মিয়ানমার এখন সব সামরিক সরঞ্জাম চীনের কাছ থেকে কিনতে চায় না। এটি বেইজিংয়ে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ চীনের কাছ সাবমেরিন পাচ্ছে। এখন মিয়ানমারকে বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে হলে অবশ্যই তার অন্য ধরনের সাবমেরিন প্রয়োজন।

অধ্যাপক পঙ্কজ ঝা বৃহৎ পরিসরে বঙ্গোপসাগরে চীনকে ঠেকাতে ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজির অংশ হিসেবে এই অঞ্চলের সব দেশের নৌবাহিনীর শক্তি বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, ভারত এই অঞ্চলে শুধু মিয়ানমার নয়, অন্য দেশগুলোর সঙ্গেও সহযোগিতা জোরদার করছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা