kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ১ ডিসেম্বর ২০২০। ১৫ রবিউস সানি ১৪৪২

বন্ড দুর্নীতিতে অস্তিত্ব সংকটে কাগজশিল্প

► ২৩৪৫টি প্রতিষ্ঠানের রাজস্ব ফাঁকি ৯৪৪ কোটি টাকা
► বন্ড সুবিধায় কাগজ ও কাগজজাতীয় পণ্য বেশি আমদানি হচ্ছে

ফারজানা লাবনী   

২৫ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বন্ড দুর্নীতিতে অস্তিত্ব সংকটে কাগজশিল্প

বন্ড সুবিধার অপব্যবহার ও দুর্নীতি করে দুই হাজার ৩৪৫টি প্রতিষ্ঠান এক থেকে দেড় বছরে ৯৪৪ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান বন্ড সুবিধার আওতায় বিনা শুল্কে কাগজ ও কাগজজাতীয় পণ্য আমদানি করে উৎপাদনে না লাগিয়ে খোলাবাজারে বিক্রি করে দিয়েছে। অবৈধ এই কারবারের কারণে দেশি কাগজ মিলগুলো বড় ধরনের লোকসানে পড়েছে। অসম প্রতিযোগিতার মুখে অস্তিত্ব সংকট তৈরি হয়েছে দেশীয় এই শিল্প খাতে।

বন্ড দুর্নীতিতে জড়িত দুই হাজার ৩৪৫টি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় পাঁচ বছর ধরেই নিয়মিত তাগাদা দেওয়া হলেও তারা সরকারের পাওনা রাজস্ব পরিশোধ করেনি। এ অবস্থায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট পাওনা আদায়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। কিন্তু সমস্যা হলো, পাওনা আদায়ে তাগাদা দিতে গিয়ে বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানের সন্ধান পাওয়া যায়নি।

ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের কমিশনার শওকত হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বন্ড দুর্নীতিবাজরা সংঘবদ্ধ চক্র। এদের দুর্নীতির কারণে দেশের কাগজশিল্প ধ্বংস হতে চলেছে। এমন দুর্নীতিবাজ দুই হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠান আমরা খুঁজে বের করেছি। ঢাকা কাস্টমস কমিশনারেটে এসব প্রতিষ্ঠানের যে ঠিকানা দেওয়া আছে সেখানে গিয়ে বেশির ভাগেরই খোঁজ পাওয়া যায়নি। অনেক প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো পড়ে থাকলেও কারখানা বছরের পর বছর বন্ধ আছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগ মালিকের খোঁজ পাওয়া যায়নি। তাদের অনেকে ভিন্ন ঠিকানায় নতুন প্রতিষ্ঠান করে ফের একই অপকর্ম করছে কিনা তা তদন্ত করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ পেপার মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সচিব নওশেরুল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, এ দেশে বন্ড সুবিধায় সবচেয়ে বেশি আমদানি হচ্ছে কাগজ ও কাগজজাতীয় পণ্য। অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে দেশি প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু উৎপাদন ব্যয়ে পণ্য বিক্রি করছে। অন্যদিকে বিনা শুল্কে আমদানি করা একই ধরনের কাগজ চোরাইপথে আরো কম দামে বিক্রি হচ্ছে। এভাবে লোকসান গুনে দেশীয় কাগজশিল্প টিকে থাকা সম্ভব নয়।

জানা গেছে, বন্ড দুর্নীতিতে জড়িত দুই হাজার ৩৪৫টি প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগই তৈরি পোশাক খাতসংশ্লিষ্ট। এসব প্রতিষ্ঠানের রপ্তানি বাড়াতে সরকার বন্ড সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্তভাবে কাঁচামাল হিসেবে ডুপ্লেক্স বোর্ড, আর্ট কার্ড, আর্ট পেপারসহ কাগজ ও কাগজজাতীয় পণ্য আমদানির সুবিধা দিয়েছে। শর্ত দেওয়া আছে, বন্ড সুবিধায় আমদানি করা কাঁচামালের সবটাই নিজস্ব উৎপাদনে ব্যবহার করতে হবে। খোলাবাজারে বিক্রি করা যাবে না। কিন্তু উল্লিখিত প্রতিষ্ঠানগুলো সেই শর্ত ভঙ্গ করে আমদানি করা কাঁচামাল গোপনে খোলাবাজারে বিক্রি করে দিচ্ছে।

সূত্র জানায়, বন্ড দুর্নীতিতে জড়িত জয়দেবপুরের ভোগড়ার টেক্সিমকো সোয়েটার লিমিটেড, টঙ্গীর আউচপাড়ার দ্য কন্টিনেন্টাল গার্মেন্ট লিমিটেড, কোনাবাড়ীর ইউনাইটেড প্যাকেজিং অ্যান্ড প্রিন্টিং লিমিটেড, টঙ্গীর ওয়াইল্ড ড্রেস লিমিটেড, টঙ্গীর উইনস গার্মেন্ট লিমিটেড, সাভারের ১০৭ নয়াবাড়ির রিজকুই ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডসহ এক হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

আশির দশকে তৈরি পোশাক খাতের ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ কাঁচামাল আমদানির প্রয়োজন থাকলেও সেই বিদেশনির্ভরতা কমেছে। বর্তমানে দেশে আর্ট কার্ড, ডুপ্লেক্স বোর্ড, হার্ড টিস্যুসহ বিভিন্ন কাগজ ও কাগজজাতীয় পণ্যের বার্ষিক চাহিদা ১০ লাখ টন। আর দেশি ৮৫টি কাগজ কারখানায় এসব পণ্য উৎপাদন হচ্ছে ১২ লাখ টন। দেশীয় কাগজশিল্পে ১৫ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ রয়েছে। কিন্তু বন্ড দুর্নীতির কারণে দেশি কাগজশিল্প অসম প্রতিযোগিতায় রুগ্ণ শিল্পে পরিণত হচ্ছে। এতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দেশি কাগজশিল্পের সঙ্গে জড়িত প্রায় ৬০ লাখ মানুষ পথে বসতে চলেছে।

এনবিআরের সর্বশেষ হিসাবে দেশে বন্ড সুবিধাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তৈরি পোশাক খাতসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানই বেশি। সংখ্যাটি সারা দেশে ছাড়িয়ে থাকা সাড়ে ৯ হাজার বন্ড সুবিধাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের অর্ধেকেরও বেশি। আর ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের আওতায় থাকা ছয় হাজার প্রতিষ্ঠানের মধ্যে চার হাজারই পোশাক খাতসংশ্লিষ্ট। বন্ড সুবিধায় আমদানি করা পণ্যের ৯০ শতাংশই কাগজ ও কাগজজাতীয় পণ্য। সে কারণে দুর্নীতিটাও এই খাতে সবচেয়ে বেশি হচ্ছে।

জানা গেছে, শুধু বন্ড অনিয়মে সরকার বছরে এক লাখ কোটি টাকার রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে। রাজধানীর নয়াবাজার, বংশাল, ইসলামপুর, হাতেম টাওয়ার, উর্দু রোড, গাউছিয়া, নিউ মার্কেট, ধোলাইখাল, টঙ্গী, যাত্রাবাড়ী, গুলিস্তান এবং চট্টগ্রামের বকশীবাজারে বন্ড সুবিধায় আনা পণ্যের অবৈধ বেচাকেনা বেশি হয়।

সম্প্রতি সরেজমিনে পুরান ঢাকার নয়াবাজার, হাতেম টাওয়ারসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বেশির ভাগ দোকানে তাইওয়ান, চীন, ভারত, ভিয়েতনামসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা ডুপ্লেক্স বোর্ড, আর্ট কার্ড, আর্ট পেপারসহ বিভিন্ন কাগজ ও কাগজজাতীয় পণ্য প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে।

দেশীয় শিল্পে উৎপাদিত প্রতি টন ২০০ থেকে ৩৫০ জিএমএমের আর্ট বোর্ড এক লাখ দুই হাজার থেকে এক লাখ পাঁচ হাজার, ১৬ জিএমএমের হার্ড টিস্যু এক লাখ থেকে এক লাখ ২০ হাজার, ডুপ্লেক্স বোর্ড ৬২ থেকে ৬৫ হাজার, জিএমএমের সাদা প্রিন্টিং পেপার ৭৫ থেকে ৮৫ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ বন্ড অপব্যবহারে বিক্রি হওয়া একই জাতীয় আর্ট বোর্ড ৭০ থেকে ৮০ হাজার, হার্ড টিস্যু ৭০ থেকে ৮০ হাজার,  ডুপ্লেক্স বোর্ড ৫২ থেকে ৫৮ হাজার ও সাদা প্রিন্টিং পেপার ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

নয়াবাজারের মেসার্স সজল স্টোরের বিক্রয়কর্মী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কে কোথা থেকে আনছে এটা আমাদের কাছে বড় নয়। কত কমে পাওয়া যাচ্ছে এবং তা বিক্রি করে কেমন লাভ থাকছে সেটাই আমরা দেখি। কম দামে পণ্য পাওয়া গেলে লাভ বেশি থাকে।’

একই এলাকার রাহা এন্টারপ্রাইজের বিক্রয়কর্মী মোক্কাদেস বলেন, ‘আমদানি করা কাগজ ও কাগজজাতীয় পণ্য গার্মেন্ট থেকে গোপনে আমাদের দিয়ে যায়। দেশি কারখানা থেকে একই জাতীয় পণ্য নিতে গেলে দাম বেশি পড়ে। বিক্রিও বেশি দামে করতে হয়। তাই আমাদের জন্য আমদানি করা পণ্য সংগ্রহ করা বেশি লাভের। মাঝে মাঝে কাস্টমসের লোক আসে। তখন আমরা এসব মাল গোপন করে রাখি।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা