kalerkantho

শনিবার । ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৮ নভেম্বর ২০২০। ১২ রবিউস সানি ১৪৪২

মোবাইল নেটওয়ার্ক

সম্প্রসারণের কাজ দুই বছর ধরে বন্ধ

কাজী হাফিজ   

২৪ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সম্প্রসারণের কাজ দুই বছর ধরে বন্ধ

দুই বছর আগে মোবাইল ফোন অপারেটরদের টাওয়ার ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নিতে লাইসেন্স গ্রহণের পর এখনো টাওয়ার কম্পানিগুলোর সবাই কাজ শুরু করতে পারেনি। সম্প্রতি একটি কম্পানি কাজ শুরু করেছে দাবি করলেও কবে নাগাদ সারা দেশে তাদের সেবা সম্প্রসারিত করতে পারবে, তা স্পষ্ট নয়। এ ছাড়া কাজ শুরু করতে না পারার দায় মোবাইল ফোন অপারেটর ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার ওপর চাপিয়ে এরই মধ্যে এক বছরের লাইসেন্স ফি মওকুফেরও দাবি জানিয়েছে কম্পানিগুলো। কয়েক দিনের মধ্যে আরো এক বছরের লাইসেন্স ফি মওকুফের আবেদন করার প্রস্তুতি চলছে। তাদের আবেদন মঞ্জুর করা হলে সরকার ৪০ কোটি টাকার মতো রাজস্ব হারাতে পারে। কম্পানিগুলো কাজ শুরু ও শেষ করার নির্ধারিত সময়ও এক বছর পিছিয়ে দিতে আবেদন করেছে।

২০১৮ সালের ১ নভেম্বরে টাওয়ার শেয়ারিং লাইসেন্স দেওয়া হয় ইডটকো বাংলাদেশ লিমিডেট, সামিট টাওয়ারস লিমিটেড, কীর্তনখোলা টাওয়ার বাংলাদেশ লিমিটেড ও এবি হাইটেক কনসোর্টিয়াম লিমিটেডকে। মোবাইল নেটওয়ার্ক টাওয়ার স্থাপন, রক্ষণাবেক্ষণের অবকাঠামো উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনায় সহজ করার পাশাপাশি টাওয়ারের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ এবং ভূমি ও বিদ্যুতের সংকট ছাড়াও পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাবের বিভিন্ন দিক বিবেচনায় মানসম্মত টেলিযোগাযোগ সেবা দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এ লাইসেন্স দেওয়া হয়।

লাইসেন্স দেওয়ার পর থেকে মোবাইল ফোন অপারেটরগুলোর নতুন টাওয়ার স্থাপন বন্ধ হয়ে গেছে। বন্ধ হয়েছে এক অপারেটরের আরেক অপারেটরের কাছ থেকে টাওয়ার ভাড়া নেওয়ার সুযোগ। মোবাইল অপারেটররা এখন ইচ্ছা করলে টাওয়ার কম্পানির কাছে তাদের টাওয়ার বিক্রি করতে পারবে। এই বাস্তবতায় দুই বছর ধরে বন্ধ হয়ে আছে মোবাইল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের কাজ। মোবাইল অপারেটররা তাদের সেবার মানের অবনতির জন্য টাওয়ার কম্পানিগুলোর নিষ্ক্রিয়তাকেই দায়ী করে আসছে।

এ বিষয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জাব্বার গতকাল শুক্রবার কালের কণ্ঠকে বলেন, টাওয়ার শেয়ারিংয়ের বিষয়ে এখনো কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই। টাওয়ার কম্পানিগুলো লাইসেন্স নিয়ে বসে আছে, কিন্তু কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না। মোবাইল ফোনের নেকওয়ার্ক সম্প্রসারণের কাজ স্থবির হয়ে আছে।

টাওয়ার কম্পানিগুলোর বার্ষিক লাইসেন্স ফি মওকুফ ও কাজ শুরু করার সময় এক বছর বাড়ানোর আবেদন সম্পর্কে মন্ত্রী বলেন, ‘দেশকে কিছু দিয়ে তারপর এ ধরনের মওকুফ চাওয়ার প্রসঙ্গটি আসতে পারে। কিন্তু ওরা তো কিছুই করেনি। দেড় বছর আগে তাদের কাজ শুরু করার কথা ছিল। এখন আবার কেন এ বিষয়ে তাদের বাড়তি সময় দিতে হবে। আমি বিটিআরসির এসব টাওয়ার কম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছি।’

মোবাইল ফোন অপারেটরদের সংগঠন এমটবের  মহাসচিব ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এস এম ফরহাদ (অব.)  বলেন, ‘গত প্রায় দুই বছর দেশে নতুন করে  কোনো  মোবাইল টাওয়ার বসেনি। ফলে স্বভাবতই নেটওয়ার্ক উন্নয়নের কাজ ব্যাহত হচ্ছে। মোবাইল সেবাদাতাদের মানসম্মত সেবা দিতে প্রচণ্ড বেগ পেতে হচ্ছে। আমরা আশা করি টাওয়ার কম্পানিগুলো খুব দ্রুত তাদের কাজ শুরু করে গ্রাহকসেবায় ভূমিকা রাখবে।’

জানা যায়, গত বছর ৩০ অক্টোবর লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান সামিট টাওয়ার, কীর্তনখোলা টাওয়ার ও এবি হাইটেক কনসোর্টিয়াম বিটিআরসির কাছে তাদের বার্ষিক লাইসেন্স ফি, রাজস্ব ভাগ এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিলের চার্জ এক বছরের জন্য মওকুফ এবং একই সঙ্গে রোল-আউট অবলিগেশন বা কাজ শুরুর নির্ধারিত সময়সীমাও এক বছরের জন্য বাড়িয়ে দেওয়ার আবেদন করে। আবেদনপত্রে কম্পানিগুলো এই যুক্তি দেখায় যে টাওয়ার শেয়ারিং নীতিমালায় বর্ণিত মোবাইল অপারেটরদের সঙ্গে সার্ভিস লেভেল অ্যাগ্রিমেন্ট বা এসএলও যথাসময়ে প্রস্তুত না হওয়ার কারণে তারা নির্ধারিত সময়ে কাজ শুরু করতে পারেনি।

টাওয়ার শেয়ারিং লাইসেন্সের নীতিমালা অনুসারে লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে বার্ষিক লাইসেন্স ফি হিসাবে বিটিআরসিকে পাঁচ কোটি টাকা করে দিতে হবে। এটা দিতে হবে লাইসেন্সপ্রাপ্তির বর্ষপূর্তির তারিখে। আর কাজ শুরু করতে হবে লাইসেন্স পাওয়ার ছয় মাসের মধ্যে। প্রথম বছর দেশের সব বিভাগীয় শহরে তাদের সেবা সম্প্রসারণ করতে হবে। দ্বিতীয় বছর জেলা শহরগুলোতে, তৃতীয় বছর ৩০ শতাংশ উপজেলায়, চতুর্থ বছর ৬০ শতাংশ উপজেলায় এবং পঞ্চম বছর দেশের সব উপজেলায় টাওয়ার ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নিতে হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত এ কাজে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই।

বিটিআরসি বলছে, টাওয়ার কম্পানিগুলোর আবেদন মঞ্জুর করে এক বছরের লাইসেন্স ফি কমালে সরকার ২০ কোটি টাকা রাজস্ব হারাবে। এ ছাড়া লাইসেন্স ফি মওকুফের এবং রোল-আউট অবলিগেশনের সময় বাড়ানোর এখতিয়ার বিটিআরসির নেই। বিষয়টি নিয়ে প্রায় এক বছর ধরে বিটিআরসি এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের মধ্যে চিঠি চালাচালি হচ্ছে। গত ২৯ সেপ্টেম্বর বিটিআরসির ২৪৩তম সভায় বিষয়টি সম্পর্কে নিজেদের এই অবস্থান স্পষ্ট করে এবং টাওয়ার কম্পানিগুলোর ওই আবেদন বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিতে  ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে চিঠি পাঠায়।

এদিকে জানা যায়, বিটিআরসি সম্প্রতি মোবাইল ফোন অপারেটর এবং টাওয়ার কম্পানিগুলোর মধ্যে ‘সার্ভিস লেভেল অ্যাগ্রিমেন্ট বা এসএলএ’ চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে। ফলে টাওয়ার কম্পানিগুলো তাদের কাজ শুরুর পথে যে বাধার কথা বলে আসছিল, তা অপসারিত হয়েছে। তবে কবে নাগাদ টাওয়ার কম্পানিগুলোর কাজ শুরু হবে, কবে নাগাদ দেশের সব এলাকায় তারা টাওয়ার ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নেবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

সামিট টাওয়ার্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আরিফ আল ইসলাম গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা আমাদের কাজ এরই মধ্যে শুরু করে দিয়েছি। বাংলালিংকের সঙ্গে আমাদের চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। গত মাস থেকে দেড় শ টাওয়ার ব্যবস্থাপনার কাজ শুরু হয়েছে।’

কীর্তনখোলা টাওয়ারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সালমান করিম বলেন, ‘মোবাইল ফোন অপারেটরদের অসহযোগিতা ও এসএলএ চূড়ান্ত না হওয়ায় আমরা এত দিন কাজ শুরু করতে পারিনি। তবে সম্প্রতি এসএলএ চূড়ান্ত হওয়ার কারণে আমরা মোবাইল অপারেটরদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা ও সমঝোতার কাজ শুরু করেছি।’

বার্ষিক লাইসেন্স ফি মওকুফের যুক্তি তুলে ধরে তিনি আরো বলেন, ‘আমরা আগে এক বছরের লাইসেন্স ফি মওকুফের কথা বলেছি। এখন আরো এক বছরের মওকুফের জন্য আবেদন করতে যাচ্ছি।’

এবি হাইটেক কনসোর্টিয়ামের একজন কর্মকর্তা জানান, তাঁদের কম্পানির শেয়ার হস্তান্তর নিয়ে আইনি জটিলতা দেখা দিয়েছে। তাদের বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও আগ্রহ হারাতে চলেছে।

ইডটকো বাংলাদেশ সম্পর্কে জানা যায়, লাইসেন্স নেওয়ার আগে তারা টাওয়ার ব্যবস্থাপনার কিছু কাজ করেছে। কিন্তু লাইসেন্স নেওয়ার পর এখনো কাজ শুরু হয়নি। তবে দ্রুত কাজ শুরু করার প্রস্তুতি চলছে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা