kalerkantho

শনিবার । ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৮ নভেম্বর ২০২০। ১২ রবিউস সানি ১৪৪২

কয়েন নিতে সব পক্ষের অনীহা

জিয়াদুল ইসলাম   

২৪ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



কয়েন নিতে সব পক্ষের অনীহা

যেকোনো লেনদেনে ধাতব মুদ্রা বা কয়েনের ব্যবহার হলেও পরিমাণে একটু বেশি দিলে তা নিতে অনীহা দেখান অনেকে। রিকশা বা বাসভাড়া, মুদি দোকানের কেনাকাটায় কয়েন নিতে অনীহা। আবার বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোও কয়েন নিয়ে অনীহা দেখায়। এতে ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে বিপাকে পড়তে হচ্ছে। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের কাছে থাকা কয়েনের কী হবে।

দেশে বর্তমানে ১ পয়সা থেকে ৫ টাকা পর্যন্ত ধাতব মুদ্রা বা কয়েন চালু রয়েছে। এর মধ্যে মূল্যস্ফীতির পেটে আগেই চলে গেছে ১, ৫, ১০, ২৫ ও ৫০ পয়সার কয়েন। তবে লেনদেনে ১, ২ ও ৫ টাকার কয়েনের ব্যবহার ব্যাপক। তার পরও কয়েন লেনদেনে বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। যেমন— কোনো পণ্য কিনলে এক টাকার বদলে ধরিয়ে দেওয়া হয় একটি চকোলেট। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভাংতি না থাকার অজুহাতে নেই হয়ে যায় এক টাকা। অনেকে বলছেন, পকেটে বা টাকা রাখার ব্যাগে কয়েন রাখতে সমস্যা হয় বলে মানুষের মধ্যে কয়েন ব্যবহারের আগ্রহ কমেছে। কেউ আবার দায়ী করছেন ব্যাংকগুলোকে। ব্যাংকগুলো কোনো কারণ ছাড়াই সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কয়েন নিতে চায় না। কয়েনের বদলে কাগজের নোট ব্যবহারেই সাধারণ মানুষের আগ্রহ বেশি। যদিও কয়েক বছর ধরে ১ ও ২ টাকার নোট ছাপানো বন্ধ রয়েছে। যদিও লেনদেনে ১ ও ২ টাকার কয়েনের গুরুত্ব কোনো অংশেই কম নয়। তার পরও কয়েন নিতে আগ্রহ দেখায় না কেউ।

১০ বছরে জমা ৬০ হাজার টাকার কয়েন নিয়ে বিপাকে পড়েছেন মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলা সদরের খাইরুল ইসলাম খবির নামে এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। তাঁর কাছে জমা এসব ধাতব মুদ্রার ওজন প্রায় ছয় মণ। খবির কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ব্যবসায়িক কারণে প্রায় ১০ বছর ধরে ২৫ পয়সা, ৫০ পয়সা, ১ টাকা, ২ টাকার এসব কয়েন জমে গেছে। সরকারিভাবে এসব কয়েন বাতিল কিংবা ব্যাংকে ফেরত দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়নি। কিন্তু বহন করা সমস্যার কারণে কেউ এগুলো নিতে চায় না। ভিক্ষুকরা পর্যন্ত কয়েন নিতে চায় না। আর বর্তমানে ৫০ ও ২৫ পয়সার প্রচলন নেই বললেই চলে।’

তিনি আরো জানান, ছোট্ট বসত ঘরে প্লাস্টিকের বড় চারটি বালতি আর দুটি বস্তায় এসব কয়েন রেখে বিনিময়ে কাগজের মুদ্রা পেতে দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন তিনি। কিন্তু ব্যাংকগুলোও এসব কয়েন নিতে চাচ্ছে না। শেষে মিডিয়ায় খবর প্রকাশ হলে মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার সোনালি ব্যাংক তাঁর কয়েন নিতে শুরু করেছে বলে জানান তিনি।

মহম্মদপুর উপজেলা সোনালী ব্যাংক শাখার ব্যবস্থাপক আব্দুল্লাহ আল মতিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘খবিরের নামে একটি ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে। এখানে প্রতিদিন তিনি এক হাজার টাকার কয়েন জমা দিতে পারবেন। পর্যায়ক্রমে তাঁর সব কয়েন জমা নেওয়া হবে।’

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের কারেন্সি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক আবু ফরাহ মো. নাছের কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আইন অনুযায়ী বিনিময়ের সময় কাগজি নোটের পাশাপাশি বাজারে প্রচলিত সব মূল্যমানের কয়েন নিতে সবাই বাধ্য। কিন্তু বাস্তবে লেনদেনের সময় কয়েন নিতে সবাই অনীহা দেখায়। আবার ব্যাংকগুলোও কয়েন নিতে চায় না। সমপ্রতি এমন একটি অভিযোগ আমাদের কাছেও এসেছে। অভিযোগের সারমর্ম হলো—ব্যবসায়ীসহ সাধারণ মানুষ ব্যাংকে শুধু কয়েন জমা দিতে আসে, পরে আর কেউ নিতে চায় না। এতে ব্যাংকের ভল্টে কয়েনের স্তূপ জমে। বাস্তবে কয়েন না নেওয়ার কোনো কারণ নেই। তবে কেউ যদি একসঙ্গে অনেক টাকার কয়েন নিয়ে আসে সেটা গ্রহণে অনীহা দেখাতেই পারে। এর বাইরে ভল্টে জায়গা না থাকার কারণেও কিছু ব্যাংক গ্রাহকের কাছ থেকে কয়েন নিতে অনীহা দেখায়। তার পরও কোনো ব্যাংকের বিরুদ্ধে কয়েন না নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেলে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ 

এদিকে ১, ২ ও ৫ টাকার কয়েন নিয়ে বিপাকে পড়েছেন ময়মনসিংহের ত্রিশালের ব্যবসায়ীরাও। এসব ব্যবসায়ীর কাছে লাখ লাখ টাকার কয়েন ও খুচরা নোট পড়ে আছে। সরকারি ও বেসরকারি কোনো ব্যাংকই এসব কয়েন গ্রহণ করছে না বলে তাঁদের অভিযোগ।

ত্রিশাল বাজারের খুচরা ব্যবসায়ী মোহাম্মদ মিলন কালের কণ্ঠকে জানান, দুই বছর আগেও বাজারের সব দোকানদার সব ধরনের কয়েন নিতেন। এখন পাইকারি ব্যবসায়ীরা কয়েন না নেওয়ায় তাঁরাও নিতে চান না। তবে দোকানে ১, ২ ও ৫ টাকার পণ্য থাকায় তাঁরা বাধ্য হয়েই কয়েন নেন। ফলে বিপুল টাকার কয়েন জমে যায়। এসব কয়েন ব্যাংকে বদলাতে গেলে তারা বদলিয়ে দেয় না। আর মহাজনরা কয়েন দেখলেই খেপে যান।

একই বাজারের পোল্ট্রি খাদ্য ও ওষুধ ব্যবসায়ী আবু বক্কর সিদ্দিক সুমন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ক্রেতাদের কাছ থেকে বাধ্য হয়ে কয়েন ও খুচরা টাকা নিতে হয় আমাদের। আর কয়েন তো দূরের কথা, ৫, ১০, ২০, এমনকি ৫০ টাকার নোটের বান্ডিল ব্যাংকে জমা দিতে গেলে ব্যাংক কর্মকর্তারা বিরক্ত হন।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যেকোনো মূল্যমানের ধাতব মুদ্রা বা নোট না নেওয়ার সুযোগ কোনো ব্যাংকের নেই। জনসাধারণও এ ধরনের মুদ্রা নিতে বাধ্য। তার পরও কিছু ব্যাংকের বিরুদ্ধে কয়েন না নেওয়ার অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের ডেকে সতর্ক করা হচ্ছে।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা