kalerkantho

রবিবার । ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৯ নভেম্বর ২০২০। ১৩ রবিউস সানি ১৪৪২

এ সপ্তাহের সাক্ষাৎকার

নারী নিপীড়ন ঠেকাতে সামাজিক প্রতিরোধ জরুরি

আসাদুজ্জামান খান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী   

২৩ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



নারী নিপীড়ন ঠেকাতে সামাজিক প্রতিরোধ জরুরি

চলতি বছরের মার্চে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরু হলে দেশের মানুষের জীবন রক্ষায় ক্রমে সব কিছু বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয় সরকার। সরকার ঘোষিত দীর্ঘ সাধারণ ছুটির সময় বিপুল শ্রমজীবী মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ায় ওই সময়ে দেশে অপরাধ কর্ম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হয়েছিল। আবার বর্তমানে সরকার সাধারণ ছুটি প্রত্যাহার করে স্বাস্থ্যবিধি মেনে দেশজুড়ে সব কিছু খুলে দেওয়ার পর ফের নতুন করে করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ শুরুর আশঙ্কা করা হচ্ছে। অন্যদিকে করোনাকালে দেশে বেড়ে গেছে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন। সমস্যাগুলো কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে কিংবা এসব নিয়ে সরকারের ভাবনাই বা কী, বিষয়গুলো নিয়ে সম্প্রতি কালের কণ্ঠ’র পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সঙ্গে কথা বলেছেন সিনিয়র রিপোর্টার ওমর ফারুক।   

 

কালের কণ্ঠ : করোনা শুরুর সময়টায় ধারণা করা হয়েছিল, দেশে চুরি-ডাকাতিসহ অন্য অপরাধ বেড়ে যেতে পারে। আশার বিষয় হলো, করোনা শুরুর সাত মাস পর এসে দেখা যাচ্ছে, তেমন কোনো বড় ঘটনা ঘটেনি। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আপনাদের কৌশল কী ছিল?

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী : যথার্থই বলেছেন আপনি। করোনা শুরুর সময়টায় আমরা ধারণা করেছিলাম, মানুষ যখন বেকার হয়ে পড়বে কিংবা কর্মহীন হয়ে পড়বে, তখন একটি কঠিন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। মানুষ কখন অপরাধে জড়ায়? কঠিন পরিস্থিতিতে না পড়লে, পেটে খাবার না থাকলে, পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেলে মানুষ অপরাধে জড়ায়। করোনা পরিস্থিতিতে আমাদের প্রধানমন্ত্রী এসব গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় প্রথমেই নজর দিয়েছেন। করোনায় দেশের দরিদ্র ও কর্মহীন মানুষের ঘরে ঘরে বিনা মূল্যে খাদ্যদ্রব্য পৌঁছে দিয়েছেন। আর্থিক সহযোগিতা দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর এই দূরদর্শিতা দেশে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি অটুট রাখতে যথেষ্ট পরিমাণে সহযোগিতা করেছে।

আরেকটি কথা, আমাদের দেশ কিন্তু এখন আর সেই হতদরিদ্র দেশ নয়। দেশে এখন কেউ না খেয়ে থাকেন—এমন উদাহরণ আর নেই। এটা ঠিক, সবার একটু কষ্ট হয়েছে, কিছু সময়ের জন্য একটু থমকে দাঁড়াতে হয়েছে, কিন্তু না খেয়ে রয়েছেন—এমন উদাহরণ তৈরি হয়নি।

 

কালের কণ্ঠ : দেশে ফের করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ আসছে—এমন কথা শোনা যাচ্ছে। এ নিয়ে আপনাদের প্রস্তুতি কী?

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী : করোনা সংক্রমণের শুরুতে আমাদের নিরাপত্তা বাহিনী যথেষ্ট ভূমিকা রেখেছিল। দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি অটুট রাখতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সার্বক্ষণিক প্রস্তুত ছিল। পাশাপাশি করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে দেশের মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাচল করতে সহযোগিতা দিয়েছে। এসব করতে গিয়ে আমাদের নিরাপত্তা বাহিনীর অনেকে করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। কোনো ব্যারাকে ৫০-৬০ জন একসঙ্গে আক্রান্ত হয়েছিলেন। কিন্তু আমাদের পুলিশ বাহিনী মনোবল হারায়নি। আমাদের ইমপালস হসপিটালকে পুলিশকে দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আর পুলিশ হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়িয়ে করোনাসংক্রান্ত যত সীমাবদ্ধতা ছিল সেগুলো দূর করা হয়েছে। ফলে আমাদের বাহিনী মনোবল যেমন হারায়নি, একই সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলারও অবনতি হয়নি। প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শিতা এবং তাত্ক্ষণিক সিদ্ধান্ত—এসব কাজে আমাদের মূলমন্ত্র হিসেবে কাজ করেছে।

আর করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের কথা বলছেন। আমাদের প্রধানমন্ত্রীও এরই মধ্যে বিষয়টি নিয়ে আমাদের সতর্ক করেছেন। এটুকু বলতে পারি, প্রথম অবস্থায় আমাদের চিকিৎসকরাও করোনার চিকিৎসা দিতে গিয়ে অনেক সমস্যায় পড়েছেন। কিন্তু এখন তাঁরা অনেক অভিজ্ঞ। কিভাবে বিষয়টি ম্যানেজ করতে হয়, চিকিৎসাসেবা দিতে হয়—এসব তাঁদের আয়ত্তে এসে গেছে। লক্ষ করলে দেখবেন, বর্তমানে আমাদের হাসপাতালগুলোয় অর্ধেক সিট খালি রয়েছে। এর কারণ তাঁরা দক্ষতার সঙ্গে চিকিৎসাসেবাটা দিতে পারছেন। মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে পারছেন। সে জন্যই বিশ্বজুড়ে করোনা যে মহামারি আকার ধারণ করছিল, আমাদের দেশে সেই ক্ষতিটা হতে পারেনি। আমাদের দেশে মৃত্যু হার অনেক কম। দ্বিতীয় ঢেউ আসছে, মানুষ আরো বেশি সতর্ক হবে। অবশ্যই মাস্ক পরা ছাড়া কেউ বাইরে যাবেন না। বাধ্যতামূলকভাবে মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। এর বিকল্প কিছু নেই। আর নিরাপত্তা বাহিনী সব সময় জনগণের পাশে রয়েছে। করোনায় যারা মারা গেছে, শুরুতে তাদের দাফন-কাফন করতে লোক পাওয়া যেত না। আমাদের পুলিশ বাহিনী এগিয়ে গিয়ে এই অত্যন্ত মানবিক কাজটি, অর্থাৎ মৃত ব্যক্তিদের লাশ দাফন-কাফনের কাজটি সুসম্পন্ন করেছে। এখনো আমাদের নিরাপত্তা বাহিনী তৈরি আছে। করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ এলেও আমরা মোকাবেলা করতে সক্ষম।

 

কালের কণ্ঠ : মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করতে আইনের প্রয়োগ করবেন কি না?

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী : মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করতে এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন। প্রয়োজনে আইন প্রয়োগের নির্দেশও দিয়েছেন। দ্বিতীয় ঢেউ আসার আগেই এটি বাস্তবায়ন করা হবে। এর জন্য আমরা দেশের জনগণকে উদ্বুদ্ধ করব। নিরাপত্তা বাহিনী যেটুকু প্রয়োজন, তা করবে।

 

কালের কণ্ঠ : করোনাকালে অন্যান্য অপরাধ কমলেও নারী নির্যাতন কিংবা ধর্ষণ কমেনি। বরং সম্প্রতি অনেক বেড়ে গেছে। করণীয় সম্পর্কে এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য জানতে চাই।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী : আমি বলব, এটি সামাজিক অপরাধ। একটা মানুষ যখন এ ধরনের অপরাধ করছে তখন সে জানে অপরাধটি সে করছে। সে জানে এর জন্য তার শাস্তিও অবধারিত। তার পরও তারা এ ধরনের অপরাধ করছে। দেশে যেখানেই এ ধরনের অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানা মাত্র সেখানে ছুটে যাচ্ছে, অপরাধীকে গ্রেপ্তার করছে। তদন্ত করে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। সব কটি ঘটনাই চিহ্নিত করা হয়েছে। 

 

কালের কণ্ঠ : ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন প্রতিরোধে নিরাপত্তা বাহিনী কাজ করছে। এ নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি আর কোনো মন্ত্রণালয় কাজ করছে কি?

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী : অন্যান্য বিভাগ, প্রতিষ্ঠান, মন্ত্রণালয়কেও ধর্ষণ এবং নারী নির্যাতন প্রতিরোধে এগিয়ে আসতে হবে। সমাজকে উদ্বুদ্ধ করাও একটা কাজ। প্রত্যেকেরই সামাজিক দায়িত্ব রয়েছে। সমাজের নেতৃত্বে যাঁরা আছেন, তাঁদেরও এ কাজে এগিয়ে আসতে হবে। আমি মনে করি, এটি একটি মানসিক রোগ। এটি একটি সামাজিক সমস্যা। এই রোগ প্রতিরোধে সমাজপতিদেরও এগিয়ে আসতে হবে।

 

কালের কণ্ঠ : ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীরা যে আন্দোলন করছে, বিষয়টিকে আপনি কিভাবে দেখছেন?

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী : আন্দোলন যৌক্তিক কি অযৌক্তিক তা আমি বলতে চাই না। আমি বলতে চাই, আমাদের নিরাপত্তা বাহিনী যথেষ্ট তৎপর রয়েছে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী এর জন্য আরো কঠোর আইন প্রণয়ন করেছেন। এরই মধ্যে এ আইনের প্রয়োগও শুরু হয়েছে। তার পরও যদি কেউ আন্দোলন করে, তবে তার পেছনে অন্য কোনো কারণ থাকতে পারে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা