kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ১ ডিসেম্বর ২০২০। ১৫ রবিউস সানি ১৪৪২

উন্নয়নশীল দেশ ২০২৪ থেকেই

আরিফুর রহমান   

২২ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



উন্নয়নশীল দেশ ২০২৪ থেকেই

করোনাভাইরাসের সংক্রমণে টালমাটাল বিশ্ব অর্থনীতি। করোনার প্রভাবে আঘাত এসেছে দেশের রপ্তানি খাতে। রাজস্ব আদায়ের হার আশঙ্কাজনকহারে কমেছে। মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমেছে। চাকরি হারিয়েছে লাখো মানুষ। অনেকে শহর ছেড়ে গ্রামে চলে গেছে। দারিদ্র্যের হার বেড়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছিল, করোনার কারণে বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে যাওয়ার অপেক্ষার প্রহর বাড়বে। তবে সুখবর মিলেছে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) এবং সরকারের পক্ষ থেকে। সিডিপি ও সরকারের যৌথ পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে যেতে যে স্বপ্ন রয়েছে, তাতে করোনা কোনো প্রভাব ফেলবে না। মাথাপিছু জাতীয় আয়, মানবসম্পদ ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা—এই তিন সূচকেই লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও এগিয়ে আছে বাংলাদেশ।

এই তিন সূচক অর্জন করতে পারলে এলডিসি থেকে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা দেওয়া হয়। সিডিপি ও সরকারের যৌথ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, আগামী বছর ফেব্রুয়ারিতে জাতিসংঘে যে পর্যালোচনা হওয়ার কথা রয়েছে, সেখানে বাংলাদেশ তিনটি সূচকেই লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে এগিয়ে থাকবে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) থেকে তৈরি করা প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।

এদিকে আগামী ২৫ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এলডিসি বিষয়ক জাতীয় টাস্কফোর্সের সভা ডাকা হয়েছে। করোনার এই সময় তিনটি সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান বিষয়ে আলোচনা হবে সভায়। করোনার মধ্যেও বাংলাদেশের উন্নয়নশীল দেশে যেতে চাওয়ার বিষয়টিও স্পষ্ট করা হবে। ওই সভায় আগামী ২০২৪ সালের মধ্যেই বাংলাদেশের উন্নয়নশীল দেশে যাওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হতে পারে বলে জানিয়েছেন একাধিক কর্মকর্তা। সরকারের একাধিক নীতিনির্ধারক জানান, করোনার প্রভাব শুধু বাংলাদেশের ওপর নয়, সারা বিশ্বের ওপর পড়েছে। তবে বাংলাদেশের যতটা ক্ষতির আশঙ্কা করা হয়েছিল, ততটা হয়নি। বাংলাদেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের পথে। তাই উন্নয়নশীল দেশে যেতে কোনো বাধা নেই।

টাস্কফোর্সের সদস্য ও সাবেক অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব মনোয়ার আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, টাস্কফোর্সের বৈঠকে করোনার মধ্যেও মাথাপিছু জাতীয় আয়, মানবসম্পদ ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা—এই তিন সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান কোথায় এসব বিষয় তুলে ধরা হবে। এ ছাড়া বাংলাদেশের কোথায় কোথায় নজর দেওয়া দরকার সেসব বিষয়ও তুলে ধরা হবে।

ইআরডি থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার সুপারিশ করতে পাঁচটি দেশকে বাছাই করেছে জাতিসংঘের সিডিপি। এগুলো হলো—বাংলাদেশ, নেপাল, মিয়ানমার, লাওস ও তিমুর লেসতে (পূর্ব তিমুর)। নেপাল ও তিমুর লেসতে দুই বছর আগেই উন্নয়নশীল দেশে যাওয়ার সুপারিশ পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দেশ দুটির অর্থনৈতিক উন্নয়ন টেকসই না হওয়ায় সুপারিশ করেনি সিডিপি। নেপাল তখনো ভূমিকম্পের ধকল কাটিয়ে উঠতে পারেনি।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস বিশ্ব অর্থনীতি এলোমেলো করে দিলেও ২০২৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উন্নীত হওয়ার পথে কোনো সমস্যা হবে না। তাঁর মতে, করোনার প্রভাবে উৎপাদন ও বহির্বাণিজ্য কমে আসার পাশাপাশি আয়বৈষম্য ও দারিদ্র্যের হার বেড়ে যাওয়া, পুষ্টি, স্বাস্থ্য, শিক্ষার মতো মানবসম্পদ উন্নয়নের সূচকগুলোতে নেতিবাচক প্রভাব পড়লেও স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশে যেতে প্রয়োজনীয় তিন সূচকে করোনার প্রভাব খুব বেশি পড়বে না। আগামী বছর জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) মূল্যায়নে বাংলাদেশ এলডিসি উত্তরণের তিন সূচকেই এগিয়ে থাকবে। সরকারের পক্ষ থেকেও এলডিসি উত্তরণের বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত রয়েছে বলে জানান তিনি।

ইআরডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৮ সালে জাতিসংঘের বেঁধে দেওয়া তিনটি সূচকেই নির্ধারিত মান অর্জন করতে সক্ষম হয় বাংলাদেশ। আগামী বছর ২২ থেকে ২৬ ফেব্রুয়ারি নতুন করে যে পর্যালোচনা হওয়ার কথা রয়েছে, সেখানেও বাংলাদেশ তিনটি সূচকে এগিয়ে থাকবে। কভিড-১৯-এর কারণে অর্থনীতিতে কিছু সময়ের জন্য নেতিবাচক প্রভাব পড়লেও সরকার খুব দ্রুত এক লাখ কোটি টাকার বেশি প্রণোদনা ঘোষণা করায় অর্থনীতি ধীরে ধীরে আগের অবস্থানে ফিরে যাচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সে বাংলাদেশ শক্ত অবস্থানে রয়েছে।

এলডিসি থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হলে কিছু সুযোগ-সুবিধা হারানো প্রসঙ্গে ইআরডি থেকে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণ করলেও আরো তিন বছর অর্থাৎ ২০২৭ সাল পর্যন্ত শুল্কমুক্ত সুবিধা, সহজ শর্তে ঋণসহ অন্য সুযোগ-সুবিধা অব্যাহত থাকবে। ইআরডির কর্মকর্তারা বলছেন, স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশে যাওয়ার পথে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতকেও এগিয়ে আসতে হবে। এরই অংশ হিসেবে জাতীয় টাস্কফোর্সে বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদেরও সম্পৃক্ত করা হচ্ছে। তথ্য বলছে, সব কিছু ঠিক থাকলে বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে চূড়ান্ত স্বীকৃতি দেওয়া হবে জাতিসংঘের ২০২৪ সালের সাধারণ অধিবেশনে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা